চসিক নির্বাচন

মেয়র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বাড়ছে উত্তেজনা

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে ভোটের মাঠ। এতদিন কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা সংঘর্ষে জড়ালেও এখন তার রেশ পড়ছে মেয়র পদেও। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। আর মেয়র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তেজনা বাড়ছে অনুসারীদের মধ্যেও। বিএনপি দলীয় প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, তাদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে আওয়ামী লীগ। ভেঙে দিয়েছে মাইকও।

রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এমন 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের' বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। তবে বিএনপির এমন দাবি 'পুরোনো রোগ' বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী।

নির্বাচনে ভরাডুবি নিশ্চিত জেনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী এমন অভিযোগ করছেন বলে দাবি করছে আওয়ামী লীগ। ডা. শাহাদাতের অনুসারীরা নৌকা প্রতীকের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছেন বলে নির্বাচন কমিশনে পাল্টা লিখিত অভিযোগ দিয়েছে তারা। এমন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে দুই প্রার্থীর অনুসারীরা লিপ্ত হচ্ছেন হাতাহাতিতে। হচ্ছে রক্তপাতও।

এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠে নেমেছেন ১৪ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। প্রার্থীদের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন তারা। কেউ যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন না করেন সে বিষয়টিও নজরে রাখতে বলা হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকা নগরীর ১৫ থানার ওসিদেরও আগের চেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে বলেছে নির্বাচন কমিশন।

জানতে চাইলে চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, 'নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে অভিযোগের মাত্রা। বিএনপি দলীয় প্রার্থী এরই মধ্যে মৌখিক ও লিখিত কিছু অভিযোগ দিয়ে গেছেন কমিশন কার্যালয়ে এসে। আবার আওয়ামী লীগও পাল্টা লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বিএনপির বিরুদ্ধে। কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সংশ্নিষ্ট থানাকে নির্দেশ দিয়েছি। আর আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ করতে ১৪ জন ম্যাজিস্ট্র্রেটকে আরও তৎপর হতে বলেছি। প্রত্যেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে একটি সংরক্ষিত ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের অধীন তিনটি সাধারণ ওয়াডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোন কর্মকর্তা কোন এলাকায় কাজ করবেন, সেই দায়িত্বও বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি প্রার্থীরা নির্বাচনী পরিবেশ সুন্দর রাখবেন। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে প্রার্থীদের সহযোগিতা চাই আমরা।'

অভিযোগ নিয়ে সবার আগে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গেছেন বিএনপি দলীয় প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। ১০ জানুয়ারি চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামানের কার্যালয়ে যান তিনি। প্রায় ২০ মিনিট ধরে সেখানে অবস্থান করে তিনি প্রতিপক্ষ প্রার্থী আওয়ামী লীগের কর্মীদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ করেন।

ধানের শীষের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, 'নির্বাচনে একটি লেভেল প্লেয়িং মাঠ দরকার। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী প্রতিদিন তার বহরে ৩০-৪০টি গাড়ি ব্যবহার করছেন। অথচ আমরা দুটি গাড়িও ব্যবহার করতে পারছি না। প্রচারণার কাজে ব্যবহূত মাইক ভেঙে দিচ্ছে তারা। ছিঁড়ে ফেলছে পোস্টারও। বিষয়গুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছি। তা যদি না হয় তবে অন্য নির্বাচনের মতো এখানেও ভোট ডাকাতির প্রহর গুনতে হবে।' ভোটেকেন্দ্রে যাতে নির্ভয়ে ভোটার আসতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে কমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগে দ্বিমত প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, 'জনকল্যাণে কাজ করতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। অজুহাত, নালিশ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাজনীতি করে জনকল্যাণ হয় না। হত্যা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে যে দলের জন্ম তাদের জন্য অভিযোগই সম্বল। নির্বাচনে ভরাডুবি হবে জেনেই একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন বিএনপি দলীয় প্রার্থী। এখন পর্যন্ত তাদের প্রচারণায় কোথাও কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। অথচ তারা পোস্টার ছেঁড়ার, মাইক ভেঙে ফেলার অভিযোগও তুলছেন। এমন অভিযোগ করে জনগণ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তারা।' নির্বাচনী পরিবেশ উৎসবমুখর আছে বলেও দাবি করেন নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। বিএনপি সমর্থকরা কাজীর দেউড়ী এলাকায় তার পোস্টার ছিঁড়েছেন বলে উল্টো অভিযোগ আনেন নৌকার এই প্রার্থী।

প্রচারণায় বাধা পাওয়ার অভিযোগ আনছে বিএনপি : বিএনপির অভিযোগ, শনিবার পূর্ব বাকলিয়ায় প্রচারণার কাজে ব্যবহূত মাইক ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা। একই দিন বাগমনিরামে বিএনপি প্রার্থীর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে সরকার দলীয় লোকজন। আবার বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া এলাকায় গত সোমবার বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী হাসান লিটনের গণসংযোগকালে আওয়ামী লীগ হামলা চালায় বলে জানান বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইদ্রিস আলী। এ হামলায় যুবদল নেতা নুরুল আমিন, তৌহিদুল আলম ও মোহাম্মদ রেজু মাথায় আঘাত পান। এদিকে নগরীর গুরল্ফম্নত্বপূর্ণ কোনো মোড়ে পোস্টার লাগাতে দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি দলীয় প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থীরা সকাল বেলা কোথাও পোস্টার লাগিয়ে আসলে তা আর বিকেল বেলা দেখছেন না। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন পোস্টার ছিড়ে ফেলছে। আবার প্রচারণার কাজে প্রতিদিন অর্ধশত গাড়ির বহর নিয়ে ঘুরছেন আওয়ামী দলীয় প্রার্থী। কিন্তু বিএনপির বহরে দু-তিনটি গাড়ি থাকলেও ঝামেলা করে পুলিশ। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। এখন পর্যন্ত্ম এসব অনিয়মের বিরল্ফম্নদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানান নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান।

অভিযোগ বিএনপির 'পুরোনো রোগ' বলছে আওয়ামী লীগ

নির্বাচনে লেভেল পেস্নয়িং ফিল্ড বা নিরপেক্ষ মাঠ নেই বলে বিএনপি যে অভিযোগ করছে তা উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে মন্ত্মব্য করছে আওয়ামী লীগ। তারা বলছেন প্রতিদিন গাড়ি বহর নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপিও। তারপরও মিথ্যা অভিযোগ করছে তারা। মাইক ভাঙা বা পোষ্টার ছেড়ার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই তাদের কাছে। এ ব্যাপারে কারা জড়িত তাদের নাম ঠিকানাও কমিশনে দিতে পারেনি তারা। কিন্তু ঢালাওভাবে তারা আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে। এদিকে বিএনপির বিরল্ফম্নদ্ধে কাজির দেউড়ি এলাকায় পোষ্টার ছেড়ার উল্টো লিখিত অভিযোগ এনেছে আওয়ামী লীগ। বাকলিয়া বাস্তুহারা কলোনি এলাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ চালানোর সময় বিএনপির লোকজন হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করে নৌকার প্রার্থী। এতে দুজন আহত হয়। এদিকে নির্বাচনে ভরাডুবি নিশ্চিত জেনে বিএনপি আগে থেকেই সরে যাওয়ার পথ খুঁজছে বলে মন্ত্মব্য করছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন।