আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে ভোটের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১১ হাজার ৫৭২টি ইলেক্ট্রনিক ভোটার মেশিন (ইভিএম)। শেষ করা হয়েছে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে মাঠে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ২০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে কাল সোমবার মধ্যরাত থেকে ২৯ জানুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান দুই দলের দুই প্রার্থীসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত প্রার্থী। এ ছাড়াও ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৭২ জন ও ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৫৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এবার নগরীর ৭৩৫টি ভোটকেন্দ্রের ৪ হাজার ৮৮৬টি বুথে ইভিএমের মাধ্যমে আগামী ২৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে। এবার ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নগরপিতাসহ সংশ্নিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৯২ হাজার ৩৩ জন এবং মহিলা ভোটার ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৩ জন।

গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী ২৯ মার্চ ভোট গ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু এর মধ্যে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ২১ মার্চ নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় কমিশন। গত ৫ আগস্ট মেয়াদ শেষে বিদায় নেন চসিকের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং ৪১ জন সাধারণ ওয়ার্ডের ও ১৪ জন সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা।

চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করতে পারেন, তার সব ব্যবস্থা করেছে কমিশন। সোমবার মধ্যরাত থেকে ২৯ জানুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকার সিটি নির্বাচন বিধিমালা ২০১০-এর ৭৪ বিধান অনুসারে ভোট গ্রহণ শুরুর আগের ৩২ ঘণ্টা, ভোট গ্রহণের দিন এবং ভোট গ্রহণের পরের ৮৪ ঘণ্টা নির্বাচনী এলাকায় কোনো সভা আহ্বান, মিছিল বা শোভাযাত্রাসহ সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ থাকবে। ভোট গ্রহণের জন্য ১১ হাজার ৫৭২টি ইভিএম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে শেষ করা হয়েছে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও।'

তিনি আরও বলেন, 'সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে চাই। এই নির্বাচনে সবার সমান অংশগ্রহণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই। ভোট প্রদান সহজ ও নির্ভরযোগ্য করতে আমরা লিফলেট বিতরণ করেছি। নির্বাচনের আগে ভোটারদের ভোট প্রদান সহজ করতে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষামূলক (মক) ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২৭ জানুয়ারি ইভিএমের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটির ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নতুন তফসিল অনুযায়ী গত ৮ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়।'

নির্বাচনে মেয়র পদের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ও ডা. শাহাদাত হোসেন। বড় দলের এই প্রার্থীর মতো নিজেদের এলাকায় প্রচারণা ও গণসংযোগ চালাচ্ছেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য পাঁচ দলের পাঁচ মেয়র প্রার্থীও। এরা হলেন- বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের এমএ মতিন (মোমবাতি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আবুল মনজুর (আম), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ওয়াহেদ মুরাদ (চেয়ার), ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের জান্নাতুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং খোকন চৌধুরী (হাতি)।

দায়িত্ব পালন করবেন ২০ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট :সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নিয়োগপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচন শুরুর দুই দিন আগে থেকে মাঠে থাকবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেটরা হলেন- ১, ২ নম্বর ওয়ার্ডে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন মোহাম্মদ রেজা, ৩, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার জাহান, ৫, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শহিদুলল্গাহ কায়সার, ৭, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আঞ্জুমান আরা, ৯, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কৌশিক আহম্মদ খন্দকার, ১১, ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারাফ উদ্দিন আহমদ, ১৩, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ফেনী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুলল্গাহ খান, ১৫, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রায়হান চৌধুরী, ১৭, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে লক্ষ্মীপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেব, ১৯, ২০ নম্বর ওয়ার্ডে বান্দরবানের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ এস এম এমরান, ২১, ২২ নম্বর ওয়ার্ডে খাগড়াছড়ি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সামিউল আলম, ২৩, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে খাগড়াছড়ি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হাসান, ২৫, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে নোয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দীন খান, ২৭, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে নোয়াখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাঈদীন নাঁহী, ২৯, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে কুমিলল্গা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইরফানুল হক চৌধুরী, ৩১, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে কুমিলল্গা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শামছুর রহমান, ৩৩, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে রাঙামাটি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট প্রবাল চক্রবর্তী, ৩৫, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে রাঙামাটি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সবুজ পাল, ৩৭, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে চাঁদপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামাল হোসাইন, ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে চাঁদপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কার্তিক চন্দ্র ঘোষ।

সম্পন্ন হয়েছে ১৬ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ :সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ গত ১৮ জানুয়ারি থেকে শুরু করে কমিশন। ২২ জানুয়ারি শেষ হয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এবারের সিটি নির্বাচনে ১৬ হাজার ১৬৩ জন কর্মকর্তা ভোট গ্রহণের দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ইভিএম সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দিতে চট্টগ্রাম নগরের ৯টি ভেন্যুতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। মোট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ১৬ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৫ হাজার ৯০২ জন এবং পোলিং অফিসার ১০ হাজার ২৬৮ জন।

ভোটের জন্য প্রস্তুত ১১ হাজার ৫৭২ ইভিএম :এবারের নির্বাচনে ৭৩৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের জন্য ১১ হাজার ৫৭২টি ইভিএম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আগে আনা এসব মেশিনের কার্যকারিতা ইতোমধ্যে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ইভিএম মেশিন তদারকিতে কাজও করেছে ইসির বিশেষ টিম। চার হাজার ৮৮৯টি কক্ষে থাকবে একটি করে ইভিএম মেশিন। এছাড়াও দুইটি কক্ষের জন্য একটি করে ইভিএম মেশিন 'ব্যাকআপ' হিসেবে অতিরিক্ত রাখা হবে। কোথাও কোনো মেশিন সমস্যা করলে তাৎক্ষণিক ব্যাকআপ থাকা মেশিন দিয়ে ভোটগ্রহণ করা হবে। ইভিএমে আঙ্‌গুলের ছাপের মাধ্যমে ভোটার শনাক্ত করা হয়। ভোটার তালিকা হতে প্রাপ্ত ভোটার নম্বর অথবা লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হলে ভোট প্রদান সহজ হবে। ইভিএমে ভোটার শনাক্তকরণ, ইভিএমের ভোটদান পদ্ধতি ও ইভিএম ভোট প্রদানের সুবিধাসমূহ তুলে ধরে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে ইভিএম ভীতি কমানোর চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন।

ইভিএমে ভোটার শনাক্তকরণ : ভোটার প্রথমে আঙ্গুল, ভোটার নাম্বার, এনআইডি নম্বর, স্মার্ট কার্ড এর মাধ্যমে নিজেকে শনাক্ত করবেন। শনাক্ত হলে তার নিজের ছবিসহ পরিচয় পর্দায় ভেসে উঠবে। প্রার্থীর পোলিং এজেন্টও তাঁর কাছে থাকা ছবি ছাড়া ভোটার তালিকায় ভোটারকে শনাক্ত করবেন। পোলিং অফিসার ভোটারের আঙ্গুলে অমোচনীয় কালি লাগাবেন।

ইভিএমে ভোটদান পদ্ধতি : সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে ভোটারকে ইলেক্ট্রনিক ব্যালট ইস্যু করবেন। একজন ভোটার মেয়র, সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলরসহ মোট তিনটি পদে ভোট প্রদান করতে পারবেন। ব্যালট ইউনিটে প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের ডান পার্শ্বে সাদা বোতামে চাপ দিয়ে ভোট প্রদান করবেন। পরে সবুজ বোতাম চেপে ভোটটি নিশ্চিত করবেন। ভোটার যে প্রতীকে ভোট দিবেন তা ব্যালট ইউনিটের স্ট্ক্রিনে ভেসে উঠবে।

ইভিএমে ভোট প্রদানের সুবিধা : ইন্টারনেট সংযোগ নেই বিধায় হ্যাকিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। জালভোট দেয়া যায় না। কেন্দ্র দখল করে ভোট দেয়া যায় না। নির্ধারিত সময় ভোটের দিন সকাল ৯টার আগে মেশিন চালু হবে না। একজনের ভোট অন্যজন দিতে পারবে না। একবার ভোট দিয়ে থাকলে দ্বিতীয়বার ভোট প্রদান করা যায় না। ভোটগ্রহণ শুরুর পূর্বে অবৈধভাবে ভোট গ্রহণ বা প্রদানের সুযোগ নেই। ইভিএম মেশিনের পাসওয়ার্ড থাকে সুরক্ষিত। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার আঙ্গুলের ছাপ ব্যতীত অন্য কেউ মেশিন চালু করতে পারবে না। ইভিএম ছিনতাই করে নিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। ভোট শেষে অল্প সময়ে ফলাফল ঘোষণা, প্রিন্ট ও বিতরণ করা যায়।

মন্তব্য করুন