মৌসুমী বাতাসে সাগর উত্তাল। তবুও মাছ ধরতে গভীর সাগরে যেতে হবে মঙ্গল জলদাসকে। প্রতিনিয়ত সাগরকে জয় করেই জীবন চলে পয়ত্রিশ বছর বয়সী মঙ্গলের। ৩১ মার্চ তাই একটু আগেভাগেই ঘর থেকে বের হয়েছিলেন মঙ্গল জলদাস। তিনি শুনেছেন গভীর সাগরে একটা টাগ বোট (বিশেষ ধরনের জাহাজ) ডুবেছে। জাহাজ ডুবলে সাগরে তেলের ব্যারেলসহ নানা জিনিস পাওয়া যায়, সেসব বেচে দু পয়সা কামানো সহজ। মঙ্গলের সঙ্গী আরও তিনজন। রতপ জলদাস (২১), লরকা জলদাস (২১), বিজয় জলদাস (১৫)। ছোট নৌকা করে কূল থেকে মাইল তিনকে যাওয়ার পর দেখা মেলে দুটি তেলের ব্যারেলের।

ব্যারেল দুটি ধরাধরি করে নৌকায় উঠান তারা। একটু দূরে তাকিয়ে মঙ্গল দেখেন, সামনে চকচক করছে হলুদ রঙের কিছু একটা। দ্রুত নৌকা চালিয়ে মঙ্গল ও তার সঙ্গীরা সেখানে উপসিত হন। তারা দেখেন সাগরে ভাসছে জলজ্যান্ত নয়জন মানুষ। প্রত্যেকের গায়ে লাইফ জ্যাকেট।

প্রত্যেকে একে অন্যের সঙ্গে বাঁধা। এক মুহূর্ত দেরি না করে ধরাধরি করে সবাইকে ছোট নৌকায় তুলে নেন মঙ্গল ও তার সঙ্গীরা। উদ্ধারকৃতরা সবাই ওই টাগ বোটের নাবিক।

বলতে বলতে চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে মঙ্গল জলদাসের। কেঁদে কেঁদে মঙ্গল বলেন, 'আমার মা এতদিন রাগ করে আমার সঙ্গে কথা বলত না। আজ মানুষগুলোকে বাঁচানোর পর মা আমার সঙ্গে কথা বলেছে। মনে হয়েছে আমি যেন স্বর্গ ফিরে পেয়েছি।'

সন্দ্বীপ উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জেলেপাড়ায় মা, বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে মঙ্গলের সংসার।

মঙ্গল জলদাসের নৌকায় কাজ করেন তার চাচাতো ভাই লরকা জলদাস (২১)। তিনি বলেন, নয়জন লোককে ওঠানোর মতো জায়গা আমাদের ছোট বোটে ছিলো না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, জায়গা না হলে আমরা একজন সাগরে লাফ দিয়ে লোকগুলোকে নৌকার সঙ্গে বেঁধে কূলে নিয়ে আসব। ভগবানের কৃপায় নৌকায় সবার জায়গা হয়েছে।'

মঙ্গলের নৌকায় ছিলো রতপ জলদাস (২১)। তিনি মঙ্গলের স্ত্রীর ছোট ভাই। বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে নৌকায় করে সাগরে ঘুরতে গিয়েছিলেন তিনি।। রতপ জানান, 'লোকগুলোকে নৌকায় তোলার সঙ্গে সঙ্গে সাগর যেন হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। সাগর আগের মত উত্তাল থাকলে হয়তো লোকগুলোকে উঠিয়ে আনা যেতো না। ভাটা পড়লে সবাই গভীর সাগরের দিকে ভেসে যেতেন।'

নৌকায় বাবার নিয়মিত সঙ্গী মঙ্গলের ছেলে বিজয় জলদাস (১৫)। তার চোখেমুখে তখনও বিস্ময়। বিজয় জানায়, উদ্ধার হওয়া লোকগুলো তার বাবাকে দুই হাজার টাকা বকশিস দিয়েছেন। কুড়িয়ে পাওয়া তেলের ব্যারেল দুটিও তাদের ঘরে আছে। মানুষগুলোকে বাঁচাতে পেরে অন্যরকম আনন্দ লাগছে তাদের।

কূলে পৌঁছে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে চলে গেছেন নতুন জীবন পাওয়া নয়জন। তারা প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন। নয়জন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে মঙ্গল জলদাস ও তার সঙ্গীরা এখন সন্দ্বীপের নায়ক। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন তারা। যদিও এসবের কিছুই জানেন না মঙ্গলরা। কারণ ফেসবুক বা ইন্টারনেট কি তা মঙ্গল ও তার সঙ্গীরা জানেনই না।

মন্তব্য করুন