অনাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ছড়া-ঝরনা শুকিয়ে যাওয়ায় তীব্র পানি সংকটে পড়েছে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ। প্রতি বছর এ সময়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পানি সংকট হলেও, নেই স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ। উপজেলার ৬টি পাহাড়ি গ্রামে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহ করা হলেও, অধিকাংশ দুর্গম পাহাড়ি গ্রামের মানুষের মধ্যে চলছে হাহাকার। অনেকে নিরূপায় হয়ে ছড়া-ডোবার ময়লা পানি পান করে নানা রোগে আক্তান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পাথর কেটে গভীর নলকূল স্থাপন কিংবা দুই পাহাড়ের মাঝে বাঁধ নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে এই পানি সংকট দূর করা সম্ভব হলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

জানা যায়, উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দীঘিনালা ও বাবুছড়া ইউনিয়নের আওতাধীন অধিকাংশ দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। কবাখালী ও মেরুং ইউনিয়নের ৬টি পাহাড়ি গ্রামে খাবার পানি সরবরাহ করছে সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন। জোড়াব্রিজ, রিজার্ভছড়া, নয় মাইল ও সীমানাপাড়া এলাকায় ৪টি পানির ট্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিদিন খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া কবাখালী ইউনিয়নের হেডম্যানপাড়া, রিজার্ভছড়া ও বিতর তারাবনিয়া গ্রামের লোকজনের খাবার পানির সংকট দূর করতে পরীক্ষামূলকভাবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানি সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কবাখালী মৌজার হেডম্যান পার্পল দেওয়ান বলেন, 'প্রতি বছর এ সময়ে দুর্গম প্রতিটি পাহাড়ি গ্রামেই খাবার ও ব্যবহারের পানির সংকট তৈরি হয়। অনাবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় পানি সংকট হয়। বর্তমানে সীমাহীন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে কবাখালী ও হাজাছড়া মৌজার দুর্গম অসংখ্য পাহাড়ি গ্রামের মানুষ। দীঘিনালা জোনের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কবাখালী মৌজার রিজার্ভছড়া ও জোড়াব্রিজ এলাকায় দুটি পানির ট্যাংক স্থাপন করে প্রতিদিন খাবার পানি সরবরাহ হচ্ছে। এই সংকটময় মুহূর্তে সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে পানি সংকট দূর করতে স্থায়ীভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।'

মেরুং ইউনিয়নের সীমানাপাড়ার কারবারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, 'স্থায়ীভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করায় প্রতি বছরই আমাদের পানি সংকটে পড়তে হয়। এ বছর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহ করা হলেও, ব্যবহারের পানির সংকট রয়ে গেছে। দুই পাহাড়ের মাঝে বাঁধ নির্মাণ কিংবা পাথর কেটে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে স্থায়ীভাবে এই পানি সংকট দূর করা সম্ভব।'

পানি সংকটের সত্যতা স্বীকার করে কবাখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, পানি সংকট দূর করার লক্ষ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পানি সংকট দূর করার জন্য কর্মপরিকল্পনা চলমান থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো প্রকল্প নেই। এ বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, 'দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পানি সংকট দূর করার জন্য আমাদের কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে মেরুং ইউনিয়নের লম্বাছড়ায় পাথর কেটে গভীর নলকূপ স্থাপনে আমরা সফল হয়েছি। তবে অনেক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পাথর কেটে গভীর নলকূপ স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও পানির উৎস্য পাওয়া যায়নি।'

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী মো. কাশেম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, পানি সংকট দূর করার লক্ষ্যে কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দুর্গম প্রতিটি পাহাড়ি গ্রামেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পাথর কেটে গভীর নলকূল স্থাপন কিংবা দুই পাহাড়ের মাঝে বাঁধ নির্মাণ করে পানি সংকট দূর করা সম্ভব হলে এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

দীঘিনালা সেনাজোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. তৌহিদুল ইসলাম পিএসসি বলেন, 'কবাখালী ও মেরুং ইউনিয়নের ৪টি স্থানে পানির ট্যাংক স্থাপন করে ৬টি দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন খাবার পানি সরবরাহ করা হবে।'

মন্তব্য করুন