পারিজাত চাকমা (৮০)। খাগড়াছড়ি এলাকার মারিশ্চা এলাকার বাসিন্দা। ২০০০ সালে তার কুষ্ঠ রোগ হয়। এরপর তার পরিবার তাকে চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালে রেখে চলে যান। অনেক বছর ধরে এখানেই আছেন। চিকিৎসার কারণে তার রোগ অনেকটাই ভালো হয়েছে। কিন্তু পরিবারের কেউ তার খোঁজ নেয় না। একটা ছেলে আছে। কিন্তু কোনো যোগাযোগ নেই। কারণ সমাজে একটা ধারণা রয়েছে, কুষ্ঠ ছোঁয়াচে রোগ। এ কারণে হয়তো সন্তানও মায়ের খবর নেয় না। এখন কুষ্ঠ হাসপাতালই যেন তার পরিবার। এতদিন থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পারিজাতের মনে ভর করেছে ভয়। কারণ তিনি শুনেছেন টাকার অভাবে চিকিৎসাসেবা চালাতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল ছাড়তে হলে কুষ্ঠ রোগ নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন- সেই চিন্তায় আতঙ্কিত।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের (৫৫) দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছে কুষ্ঠ রোগের কারণে। তিনিও ভয়ে আছেন এই হাসপাতালে আর ক'দিন চিকিৎসা পাবেন, সেটা নিয়ে। তার কথা- 'আমাদের আর কোনোদিন সমাজ ফিরিয়ে নেবে না, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দেবে না। এ কুষ্ঠ হাসপাতাল চালু না থাকলে আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।'

চরম অর্থ সংকটে চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের অধীনে পরিচালিত ৬০ শয্যা বিশিষ্ট শতবর্ষী কুষ্ঠ হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। গত এক বছরে কুষ্ঠ রোগীদের জন্য ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছে চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখন আর অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারও কোনো ধরনের অর্থ বরাদ্দ দেয় না। এতে যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বৃহত্তর চট্টগ্রামের একমাত্র কুষ্ঠ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতাল। এতে করে আতঙ্কে আছেন হাসপাতালের ২৮ রোগী। পাশের ঝুমপাড়া কুষ্ঠ পল্লিতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩০০ রোগী।

চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রাজেন্দ্র নাথ পান্ডে বলেন, ২০১৯ সালে রোগী ভর্তি ছিল ৩৫৫ জন। এ বছর মাত্র ২৮ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জানা যায়, আগে লেপ্রসি মিশন নামে একটি এনজিও কুষ্ঠ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিত। এখন সারা বছরের জন্য দেয় মাত্র ৫ লাখ টাকা। এতে করে চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের ওপর বাড়ছে চাপ।

কুষ্ঠ হাসপাতালের কর্মচারী আফজাল শরীফ জানান, এখন হাসপাতালে কুষ্ঠ রোগী আছেন ২৮ জন। এর মধ্যে ১৬ জন পুরুষ ও ১২ জন নারী। কুষ্ঠ রোগীদের অনেকে বিকলাঙ্গতার শিকার, তাদের জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের জন্য ডাক্তার আছেন, কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে অস্ত্রোপচার বন্ধ। অস্ত্রোপচার করতে পারলে অনেক কুষ্ঠ রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন।

'কুষ্ঠ রোগীরা সমাজের বাইরের কেউ নয়, সঠিক চিকিৎসায় কুষ্ঠ রোগ দ্রুত ভালো হয়'- এ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিয়ে দুরারোগ্য ব্যাধি কুষ্ঠে আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হতো চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালে। তবে অর্থ সংকটের কারণে এই হাসপাতালে এখন চিকিৎসাসেবা বন্ধ হওয়ার পথে।

চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ ও খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার প্রবীর থিয়াং বলেন, কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে হলে অবশ্যই সরকার, মানবিক প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবান ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, 'দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য এখানে রোগীরা আসেন। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি কুষ্ঠ রোগ সারিয়ে তোলার জন্য। হাসপাতাল আর্থিক সংকটে পড়ায় চিকিৎসাসেবা আগের মতো দেওয়া যাচ্ছে না। তারপরও হাসপাতালে যারা ভর্তি আছেন, তাদের আমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠা গেলে হাসপাতাল আগের রূপে ফিরে যাবে।'

চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান কুষ্ঠ হাসপাতাল ১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত কুষ্ঠ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন পরিবারে। এখন যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তারা অনেকটাই সমাজচ্যুত ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কহীন। তাই তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের অভ্যন্তরে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে কুষ্ঠ রোগীরা একটা পরিবারের মতো বসবাস করে আসছেন। চিকিৎসার সব উপকরণ, নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা, ওষুধ ও খাবার দিয়ে কুষ্ঠ রোগীদের আপন আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপতাল। হাসপাতালের বাইরে ঝুমপাড়া কুষ্ঠ পল্লি থেকে আউটডোরে চিকিৎসা নেন অনেক কুষ্ঠ রোগী।

গত বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালের ৬টি ওয়ার্ডে পুরুষ ও নারী কুষ্ঠ রোগীরা খোশগল্পে মেতে রয়েছেন। কারও পায়ে ও হাতে আঙুল নেই, কারও হাতে লালচে ক্ষত, কারও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন। শরীরে ভয়ঙ্কর ক্ষত নিয়েও তারা হাসিখুশি থেকে ভুলতে চান জীবনের সব কষ্ট।

হাসপাতালের ৪নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন হাটহাজারি ফতেয়াপুর গ্রাম থেকে আসা জোসনা বেগম (৪০) জানান, প্রথমে পায়ের তলায় ঘা দেখা দিয়েছিল। এরপর পায়ের ৩টি আঙুল ক্ষত-বিক্ষত হয়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিবার ও সমাজ মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমি নাকি অভিশপ্ত। এরপর এ হাসপাতালে চলে আসা। হাসপাতালের ডাক্তারদের সেবায় আগের তুলনায় অনেকটা সুস্থবোধ করছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, নার্স, ডাক্তার এখানে পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে বেশি আদর-যত্ন করে। ভালো মানের খাবার, চশমা, জুতা, সম্পূর্ণ বিনামূলে কুষ্ঠ রোগের সব উপকরণ দিয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ সৃষ্টি করেছেন।

কুমিল্লা জেলার মোহাম্মদ মনির (৩০) বলেন, 'জীবনে কখনও ভাবিনি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হব। ২০০০ সালে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। সমাজ ও পরিবার আমাকে এড়িয়ে চলায় নিজেকে খুব অসহায় মনে করতাম। পায়ে ঘা হয় প্রথমে। এরপর পায়ের ৪টি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে এই হাসপাতালে চলে আসি। এখানকার সেবায় বেঁচে আছি, এখন নিজেকে আর অসহায় মনে হয় না।'

চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালের প্রোগাম অফিসার বিজয় মার্মা জানান, ১৯২০ সালের দিকে তিন পাবর্ত্য জেলার উপজাতীয়দের মধ্যে কুষ্ঠ রোগ ব্যাপকভাবে দেখা দেয়। তখন নেদারল্যান্ডসের আর্থিক সহযোগিতায় বর্তমান হাসপাতালটি ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে। সে সময় কুষ্ঠ রোগীদের জন্য আলাদা ঘরে রেখে চিকৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হতো। ধীরে ধীরে সমাজে কুষ্ঠ রোগীদের জায়গা না হওয়ায় সব কুষ্ঠ রোগী যাতে একত্রে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা কদমতলী ইউনিয়নের সীমান্তে জনবিচ্ছিন্ন সাড়ে ৪ একর পাহাড়ি জায়গায় ঝুমপাড়া কুষ্ঠ পল্লি তৈরি করা হয়। সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় ৩০০ কুষ্ঠ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।

চন্দ্রঘোনা কুষ্ঠ হাসপাতালের চিকিৎসক বিলিয়ন জানান, হাসপাতালে আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের জন্য বিনোদনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ৪ জন ডাক্তারসহ কয়েকজন সেবিকা চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির জাহান বলেন, কুষ্ঠ রোগীদের এই হাসপাতাল যাতে বন্ধ না হয় সেদিক বিবেচনা করে প্রযোজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসদুর রহমান বলেন, 'দেশের বিভিন্ন স্থানে কুষ্ঠ রোগী রয়েছে। এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সেরে উঠেছেন শত শত মানুষ। হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম চালু রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।'

মন্তব্য করুন