সীতাকুণ্ডে গত এক বছরে করোনা মহামারির ছোবলে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অভিমত, যারা মারা গেছেন তাদের প্রায় সবাই সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে গাফিলতি করেছিলেন। আক্রান্ত হওয়ার পরও তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা বা পরামর্শ নিতে আসেননি। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতির পরই তারা চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন আর কিছু করার ছিল না।

এদিকে, সীতাকুণ্ডেও লকডাউন মেনে বাজারে বেশিরভাগ দোকানপাটই বন্ধ আছে। খোলা আছে নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি, ওষুধের দোকান। তবে প্রথম দু'দিনের তুলনায় শুক্রবার সাধারণ মানুষের আনাগোনা ছিল কিছুটা বেশি। লকডাউন বাস্তবায়নে একযোগে মাঠে তৎপর ছিল সীতাকুণ্ড মডেল থানা আর মহাসড়কে তৎপর ছিলেন বার আউলিয়া হাইওয়ে থানা, কুমিরা হাইওয়ে থানার সদস্যরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছিল পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাপ। তবে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকার কারণে যাত্রীবাহী কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। সরেজমিন পৌরসদর এলাকায় দেখা গেছে, লকডাউনের প্রথম তিনদিন (বুধ থেকে শুক্রবার) নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি দোকান, ওষুধের দোকান ও মাছ-সবজির দোকান ছাড়া অন্য দোকানগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ ছিল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, দেশে করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত করোনার উপসর্গ নিয়ে সীতাকুণ্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কিংবা মোবাইলে এই হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রতিটি রোগীই সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেওয়ার পরও যেসব রোগী অবহেলা করে বাড়িতে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চিকিৎসা না নিয়ে হাতুড়ে ডাক্তার কিংবা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়েছেন কেবল তাদের অবস্থায়ই ক্রমশ গুরুতর হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েও তারা বাঁচতে পারেননি। এভাবে গত এক বছরে উপজেলায় মোট ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার রাতে ভাটিয়ারীর বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বিএম গেট এলাকায় নাসির মোহাম্মদ চৌধুরী বাড়ির মৃত ইসমাইল হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন জানান, করোনা মহামারির শুরু থেকে এ পর্যন্ত তারা নমুনা সংগ্রহ করেছেন ২ হাজার ১৬৫ জনের। নমুনা পরীক্ষার পর মোট ৬১০ জন করোনা পজিটিভ হয়। এদের মধ্যে ৫৫৯ জন হাসপাতালের সংস্পর্শে থেকে কিংবা মোবাইলে পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, 'করোনার প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরপরই যারা আমাদের ফ্লু কর্নারে যোগাযোগ করে নমুনা পরীক্ষাসহ চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের রোগ গুরুতর হয়ে উঠতে পারেনি।

চিকিৎসায় তারা সবাই আরোগ্য লাভ করেছেন। কিন্তু আমরা শুনেছি অনেকেই জ্বর, সর্দি-কাশিসহ করোনার নানা উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও গাফিলতি করে হাসপাতালে আসেননি কিংবা কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো কিংবা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাদের পরামর্শে ওষুধ খেয়েছেন তাদের অবস্থা পরে গুরুতর হয়ে যায়। শেষে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের নামিদামি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও আর শেষ রক্ষা হয়নি।' যখনই করোনার উপসর্গ দেখা দেবে তখনই হাসপাতালে দ্রুত যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায়। তিনি বলেন, 'আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিনের পরামর্শে দ্রুত করোনা পরীক্ষা করি। পজিটিভ আসার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালাতে থাকি। এতেই উপকৃত হই, দ্রুত আরোগ্য লাভ করি আমি।' তবে চিকিৎসাই একমাত্র পথ নয় মন্তব্য করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, 'চিকিৎসায় আমার মতো অনেকে যেমন সুস্থ হচ্ছে, তেমনি মৃত্যুর হারও সারাদেশে ভয়াবহ। তাই করোনার বিষয়ে কোনো উদাসীনতা নয়। সবাইকে মাস্ক বাধ্যতামূলক করাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।'

মন্তব্য করুন