চলরে মন ত্বরাই যাই, বিলম্বের আর সময় নাই

গাউচুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুলেছে।

বাংলা লোকগানের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের সংক্ষিপ্ত তালিকায় অনায়াসে স্থাপন পাবে উপরিউক্ত গানটি। গত অর্ধশত বছর ধরে গানটি শেফালী ঘোষ, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর ও জানে আলমসহ বাংলা গানের অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। এই গান চট্টগ্রামেরই সংগীতরত্ন, বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল রমেশ শীলের অনবদ্য সৃষ্টি। রমেশ শীল শুধু বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল নন, তিনি মরমি গানের ধারায় মাইজভাণ্ডারী গানের সংযোজক এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের নব-জীবনদাতা।

শুধু 'স্কুল খুলেছে' নয়, গত প্রায় সোয়া শতাব্দী ধরে কবিয়াল রমেশ শীলের অসংখ্য গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে দুই বাংলার সংগীত ভুবনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কবিয়াল রমেশ শীলের তিরোধানের ৫৪ বছরেও কোনো সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বা শিল্পী রমেশ শীলের গান রেকর্ড বা বাণিজ্যিক বিপণনের ক্ষেত্রে তার উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে কখনও অনুমতি নেয়নি। ৫৪ বছর পর এই প্রথম 'আইপিডিসি আমাদের গান' কর্তৃপক্ষ কবিয়াল রমেশ শীলের 'স্কুল খুলেছে রে মওলা' গানটি নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের জন্য রমেশ শীলের পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে অনুমতি নিল এবং সম্মানী দিল।

মাসখানেক আগের কথা, খ্যাতিমান সংগীত ব্যক্তিত্ব আবিদুর রেজা জুয়েল ফোন করে বলেন, 'আইপিডিসি আমাদের গান'-এর নতুন সিজনে কবিয়াল রমেশ শীলের 'স্কুল খুলেছে রে মওলা' গানটি করতে চান তারা। কবি জসিমউদ্‌দীন ও শাহ আবদুল করিমের গানও তারা করছেন। কবিয়াল রমেশ শীলের উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার ব্যাপারে তিনি আমার সহযোগিতা চান। আমি তৎক্ষণাৎ রমেশ শীলের চতুর্থ প্রজন্ম রানার সাথে যোগাযোগ করলাম। তারা 'আইপিডিসি আমাদের গান'-এর প্রস্তাব শুনে আনন্দিত, কিছুটা হতবিহ্বলও। কারণ এতদিন পর কেউ প্রথম জাতীয় পর্যায় থেকে রমেশ শীলের গানের অনুমতি চাইছে- এটা তাদের কাছে অকল্পনীয় ও অপ্রত্যাশিত। কারণ এই দেশে তো কিংবদন্তি শিল্পীদের গান বিনা অনুমতিতে গাওয়াটাই যেন রীতি।

ঢাকা থেকে 'আইপিডিস আমাদের গান'-এর পক্ষে অনুমতি নেওয়ার জন্য এলেন ক্রিয়েটোর কর্মকর্তা ফুয়াদ আদনান। গত ৪ এপ্রিল স্থানীয় সাংবাদিক তাজুল ইসলাম রাজুসহ আমরা গেলাম বোয়ালখালীতে, কবিয়াল রমেশ শীলের গোমদণ্ডীর বাড়িতে। সেখানে রমেশ পরিবার আমাদের দারুণ আতিথিয়েতা করলেন। আমরা রমেশ শীলের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানালাম।

প্রসঙ্গত, পিএইচপি ফ্যামিলি ও সুফি মিজান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং পিএইচপির পরিচালক আনোয়ারুল হক চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নান্দনিক সৌকর্যে নির্মিত হয়েছে কবিয়াল রমেশ শীলের সমাধি।

রমেশ শীলের সমাধি প্রাঙ্গণেই জড়ো হলেন তার উত্তরাধিকাররা। রমেশের বড় সন্তান বিশ্বেশ্বর শীলের সন্তান চিত্তরঞ্জন সরকার আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, 'আমার দাদার গান দেশের সম্পদ। আজ দাদার গান প্রচারের জন্য অনুমতির আশায় আপনারা আমাদের বাড়ি পর্যন্ত এলেন, আমরা ধন্য। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও যারা রমেশ শীলের গান করবেন তারা রমেশের উত্তরাধিকারদের যোগ্য সম্মান ও সম্মানি দেবেন।'

আবিদুর রেজা জুয়েল বলেন, 'আমরা বাংলার লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মেও কাছে ছড়িয়ে দিতে চাই, সেই কারণে আইপিডিসি আমাদের গান' এর এই উদ্যোগ। কবিয়াল রমেশ শীল কালজয়ী সংগীতজ্ঞ। উনার বিখ্যাত গান 'স্কুল খুলেছে' আমরা নতুন সংগীতায়োজনে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের দিয়ে রেকর্ড করছি। আমাদের মনে হয়েছে, কবি জসিম উদ্দিন, আবক্ষাস উদ্দিন বা কবিয়াল রমেশ শীলদের গান গাইবার আগে অবশ্যই উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া উচিত।'

চমেশ শীলের চুতর্থ প্রজন্ম ইঞ্জিনিয়ার রানা বলেন, 'রমেশ শীলের গান সারা দেশে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। যে যেভাবে পারছে গাইছেন, কেউ ভাবেন না অনুমতি ও সম্মানি দেওয়ার কথা। 'আইপিডিসি আমাদের গান' কর্তৃপক্ষ কবিয়াল রমেশ শীলকে সম্মান দিয়ে নিজেরাই সম্মানিত হলো। আমি মনে করি 'আইপিডিসি আমাদের গান' একটা উদাহারণ তৈরি করেছে। আশা করি ভবিষ্যতে সবাই 'আইপিডিসি আমাদের গান' এর এই শুভ উদ্যোগকে অনুসরণ করবে।''

প্রসঙ্গত, এর আগেও চট্টগ্রামের কালজয়ী সংগীতজ্ঞ আবদুল গফুর হালীর 'মনের বাগানে', সোনাবন্ধু, পাঞ্জাবিওয়ালা' বা এম এন আখতারের 'কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে'সহ চট্টগ্রামের অনেক গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের দিয়ে গাওয়ানো হয়েছে, দারুণ জনপ্রিয়ও হয়েছে। কিন্তু রচয়িতা বা মূল শিল্পীর অনুমতি প্রসঙ্গে কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। তবে বছর কয়েক ধরে সেই ধারায় পরিবর্তন আসছে। ইতিমধ্যে গানবাংলা আবদুল গফুর হালীর মাইজভা-ারী গান 'দুই কুলে সোলতান ভাণ্ডারী' যথাযথ অনুমতি নিয়ে শিল্পী ঐশীকে দিয়ে গাইয়েছে। 'আইপিডিসি আমাদের গান' আবদুল গফুর হালী রচিত এবং শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গাওয়া 'নাইয়র নিবা নিবা গরি' গানটিও নতুনভাবে তৈরি করছে এবং আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টার থেকে যথাযথ পদ্ধতিতে অনুমতি নিয়েছে। এটা চট্টগ্রামের গান, গানের রচয়িতা ও শিল্পীর প্রতি জাতীয় পর্যায়ের সংগীতজ্ঞদের সম্মান জাগানো একটি উদ্যোগ।

উলেস্নখ্য, প্রায় ছয় দশক বাংলার হাটে মাঠে ঘাটে কবিগান করেছেন রমেশ শীল। এই সময়ে জীবনবিচ্ছিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে ভরপুর কবিগানকে জীবনঘনিষ্ঠ গানে পরিণত করেন তিনি, কবিগানকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার করে তুলেন। বাঙালী জাতি তাই রমেশ শীলকে 'বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল' উপাধি দিয়েছে।

গান, কবিতা, যাই লিখতেন সেগুলো কাপড়ের পুঁটলি বেঁধে সংরক্ষণ করতেন রমেশ শীল। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেরাও বাবার গানগুলো একইভাবে সংরক্ষণ করেন। এরকম পুঁটলি ছিল ১৮টি। ব্যয়ভারের অভাবে পাণ্ডলিপিগুলো মুদ্রণ সম্ভব হয়নি।

১৯৭১ সালে পাকিস্টত্মানি হানাদার বাহিনী রমেশ শীলের বাড়িতে আগুন দেয়। পাক আর্মির ভয়ে পালানোর আগে রমেশ শীলের ছেলে পুলিন শীল দুই একটি পুঁটলি সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন। বাকি পুঁটলিগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রাজাকাররা রমেশ শীলের হারমোনিয়ামটাও লুট করে।

আশির দশকে ড. আনিসুজ্জামানের সহায়তায় সংরক্ষিত গান ও কবিতাগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রকাশ কওে 'রমেশ শীল রচনাবলী'।

বোয়ালখালীর গোমদণ্ডীতে নিজ বাড়ির আঙিনায় বৃক্ষরাজির ছায়ায় ঘুমিয়ে আছেন বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিয়াল রমেশ শীল। রমেশ শীলের জন্ম বাংলা ১২৮৪ সনের ২৬ বৈশাখ, ইংরেজি ১৮৭৭ সালে। তাঁর পিতার নাম চণ্ডীচরণ শীল, মা-রাজকুমারী দেবী। ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল তিনি পরলোকগমন করেন।

মন্তব্য করুন