শামসুন্নাহার (৪৮)। দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ থাকেন চট্টগ্রাম নগরের হামজারবাগ এলাকায়। ১০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। এরপর থেকে গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। করোনা মহামারির কারণে সরকারের দেওয়া 'কঠোর বিধিনিষেধ' ভেঙে কাজ করে বেড়াচ্ছেন অন্তত দুই-তিনটা বাসায়। বের হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, 'দুই-তিন বাড়িতে কাজ করে মাসে সাত-আট হাজার টাকা পাই। এই দিয়ে সংসার চালাই। কাজের টাকা পেলে তা দিয়ে সারা মাসের চাল-ডাল কিনি। ঘরে বসে থাকলে খাব কি? সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। গতবারের লকডাউনে মাসখানেক বসে ছিলাম, তখন সামান্য কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম। এবার তেমন কিছুই পাইনি।'

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যানবাহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সড়কে চলাচলেও রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাবে। তবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই বিধিনিষেধ মানছেন না। চাকরিজীবী বা মাস শেষে নির্দিষ্ট অর্থ পান- এমন মানুষ মনে করছেন মহামারি রোধে লকডাউন ছাড়া উপায় কি! আবার শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে যারা দিন এনে দিন খান, তাদের কাছে লকডাউন মানে দুঃখ-দুর্দশা ও চরম খাবারের সংকট।

সরকারি বিধিনিষেধে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া সব বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তবে নগরের মুরাদপুর এলাকায় একটি গলির মুখে পান-সিগারেটের দোকান খোলা দেখে জানতে চাইলে দোকানদার মো. জয়নাল সমকালকে বলেন, 'লকডাউন' গরিবদের জন্য নয়। আমিসহ আমার পরিবারে চারজন সদস্য। দুইটা বাচ্চা ছোট ছোট। দিনে এনে দিনে খাওয়া সংসার। আমাদের বসে থাকলে চলবে কী করে? বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যে দাম এই অবস্থায় ঘরে বসে থেকে পেট চালানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সোজা কথা সরকার লকডাউন দিলে আগে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করুক। তারপর আমরা সব নিয়ম মেনে ঠিকঠাক মতো ঘরে থাকব।'

নগরের দেবপাহাড় এলাকার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার বলেন, 'গতবার লকডাউনে যে কয়টা বাসায় কাজ করতাম সবগুলো বাসায় কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। মানুষের সহায়তা না পেলে না খেয়ে মরতাম। এখন আবার লকডাউনের খবর শুনে ভয়ে আছি। সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব।'

প্রবর্তক মোড় এলাকায় চারজন কর্মচারী নিয়ে ছোট একটি হোটেল চালান মো. সেলিম। তিনি বলেন, 'গতবার লকডাউনে যে ধারদেনা করেছি, তা এখনও শোধ করতে পারিনি। আমার এখানে খরিদদার বলতে খেটে খাওয়া মানুষরাই। লকডাউনের ফলে তারা আসতে পারছেন না। বেচাকেনা নেই বললেই চলে। এখন কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া, বাড়ি ভাড়া কীভাবে দেব বুঝতে পারছি না। সামনে আবার ঈদ কীভাবে চলবে কিছুই মাথায় ধরছে না।'

এদিকে চাকরিজীবী অনেকেই বলছেন লকডাউনে সাধারণ মানুষের জীবিকাও নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো লকডাউনে একশ্র্রেণির মানুষের জন্য জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। র‌্যাংস এফসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর শাহরিয়ার রিমন বলেন, 'যে দেশে ধনী গরিবের বৈষম্য আকাশছোঁয়া, সে দেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি? জীবন নাকি জীবিকা- এ এক কঠিন প্রশ্ন। দিনমজুরদের জন্য সরকারের পরিকল্পনা থাকলে ভালো হতো।'

চট্টগ্রাম নগরের বাদুরতলা আরাকান সোসাইটির বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'সরকারকে জীবনের পাশাপাশি মানুষের জীবিকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো লকডাউন ফলপ্রসূ হবে না।'

লকডাউন ঘেষণার দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সিএনজিচালক মো. কামাল হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তার প্রস্তুতি সম্পর্কে। তিনি সমকালকে বলেছিলেন, '২৭ বছর ধরে এই শহরে আছি। বর্তমানে ৫ জনের সংসার আমার। গতবারের লকডাউনে যে কষ্ট পেয়েছি তা কখনও ভুলব না। পরিবার নিয়ে সারাদিনে একবার খেয়েছি এমন দিনও গেছে। আবার লকডাউনের খবর শুনে ঝিম মেরে বসে আছি। কী করব, কোথায় যাব কিছুই বুঝতেছি না।' অন্যসব খাবার সন্ধানী মানুষদের মতো কামাল হোসেনও কি বিধিনিষেধ ভেঙে বেরিয়ে পড়েছেন উপার্জনের জন্য? নাকি আবারও খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন? এ উত্তর জানার কোনো সুযোগ নেই।

মন্তব্য করুন