করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা যখন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন তখন স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা। করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাপে এসব সংস্থার উদ্যোগে চট্টগ্রাম নগরে এ পর্যন্ত চারটি আইসোলেশন সেন্টার ও ফিল্ড হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়েছে। এগুলো হলো সিএমপি-বিদ্যানন্দ ফিল্ড হাসপাতাল, বন্দর ইপিজেড পতেঙ্গা করোনা হাসপাতাল, আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতাল ও চসিক আইসোলেশন সেন্টার। এ চারটি হাসপাতাল মিলে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছে ২১৮টি শয্যা।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও সিএমপির ৭০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল : গত মঙ্গলবার নগরের পাহাড়তলী থানার বিটাক মোড়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) যৌথ উদ্যোগে ৭০ শয্যাবিশিষ্ট ফিল্ড হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়েছে। সিএমপি-বিদ্যানন্দ হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ্‌ মোহাম্মদ তানভীর।

গত বছরের জুলাই মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় পতেঙ্গায় ১০০ শয্যার সিএমপি-বিদ্যানন্দ ফিল্ড হাসপাতাল যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু অর্থসংকট ও স্থানাভাবে গত বছরের অক্টোবরে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন নতুন হাসপাতাল চালুর জন্য ভবন দিতে সম্মত হয় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর গত বছরের ২০ নভেম্বর ওই ভবনে ৫০ শয্যার 'বিদ্যানন্দ মা ও শিশু হাসপাতাল' যাত্রা শুরু করে। এখন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সেই হাসপাতালটিই আবার করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ফিল্ড হাসপাতালে রূপান্তর করা হলো।

হাসপাতালটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, 'বিদ্যানন্দ মানবতার সেবায় অনুকরণীয় দায়িত্ব পালন করছে এবং করোনার সংকট মোকাবিলায় স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতাল একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। দরিদ্র মানুষ যেন এই হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবা পায় সে জন্য প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনটি বিদ্যানন্দকে দেওয়া হয়েছে। এমন উত্তম কাজে চট্টগ্রামবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে, যেন দুস্থ করোনা রোগী সহজে চিকিৎসা সেবা পায়।'

সিএমপি ও বিদ্যানন্দ সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ৭০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ হাসপাতালটি দ্রুত ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি অন্য উপসর্গের রোগীদেরও সেবা দেওয়া হবে। হাসপাতালটিতে পোর্টেবল অক্সিজেনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। ১০ জন চিকিৎসক, ১৮ জন নার্স ও ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবক সেখানে নিয়মিত সেবা দেবেন। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা সুবিধা রয়েছে এ হাসপাতালটিতে।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সদর) মঈনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যেসব মানুষ হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের টার্গেট করেই এ হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে প্রধানত কভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।' বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশ বলেন, 'যতদিন করোনার আক্রমণ থাকবে ততদিন এই হাসপাতাল চলবে। সবাইকে এই হাসপাতালে রোগী পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানাই।' বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শিপ্রা দাশ বলেন, 'একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা হাসপাতালটি সাজিয়েছি। চিকিৎসা নিতে রোগীদের এক টাকাও গুনতে হবে না।'

আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতাল : নগরের হালিশহর ফুল চৌধুরীপাড়ায় আল মানাহিল ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছে আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতাল। এখানে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য রয়েছে ৪৩টি শয্যা। বৃহত্তর হালিশহর এলাকায় কোনো সরকারি হাসপাতাল না থাকায় এ এলাকার মানুষের জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে হাসপাতালটি।

আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতালের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'গত বছর জুলাই মাসে আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে আমরা কভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া বন্ধ করিনি। আমাদের হাসপাতাল থেকে ইনডোর এবং আউটডোর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন অসংখ্য করোনা রোগী। এখনও আমাদের হাসপাতালের প্রায় ৪০ জন করোনা পজিটিভ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতালে মেটারনিটি ও ডেন্টাল ইউনিট চালু করলেও কভিড রোগীদের আমরা সেবা দিয়ে যাব মহামারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কেউ করোনা আক্রান্ত হলে নির্দি্বধায় আমাদের হাসপাতালে চলে আসতে পারেন।'

বন্দর-ইপিজেড-পতেঙ্গা করোনা হাসপাতাল : এছাড়া পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে বন্দর-ইপিজেড-পতেঙ্গা করোনা হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন ডা. হোসেন আহমেদ। করোনার প্রথম পর্যায়ে এ হাসপাতালে অনেক করোনা রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। এ ফিল্ড হাসপাতালটিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, আইসোলেশন সেবা ও অক্সিজেন সেবা দেওয়া হয় বলে জানান হাসপাতালটির সুপারভাইজার শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, 'করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল হাসপাতালটি আবার চালু করা হয়েছে। আমাদের কাছে ৫০ শয্যার সরঞ্জাম রয়েছে। এখানে ২৪ ঘণ্টা আউটডোর-ইনডোর চিকিৎসা সেবা চালু থাকবে।'

সিটি করপোরেশনের ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার :গত ৬ এপ্রিল নগরের লালদীঘি পাড়ের সিটি করপোরেশন লাইব্রেরি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার চালু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ভবনটির দ্বিতীয় তলায় পুরুষদের জন্য ৩৫টি ও তৃতীয় তলায় নারীদের জন্য ১৫টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। আইসোলেশন সেন্টারটিতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতে নিয়োজিত রয়েছেন ১১ জন চিকিৎসক।

সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'আইসোলেশন সেন্টারটিতে চিকিৎসাধীন রোগীরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, ওষুধ, খাবার ও অক্সিজেন সাপোর্ট পাচ্ছেন। রোগী পরিবহন ও স্থানান্তরের জন্য সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থাকছে। এখানে ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবেন নগরবাসী। প্রয়োজনে এই আইসোলেশন সেন্টার আরও সম্প্রসারণ করা হবে।'

মন্তব্য করুন