রাঙামাটি শহর থেকে পানিপথে ৫৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থান জুরাছড়ি উপজেলার। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর শুস্ক মৌসুমে তীব্র খরায় পানি সংকটে বোরো চাষিরা হতাশ হয়ে পড়তেন, ৬০-৭০ হেক্টর জমি পড়ে থাকত অনাবাদি। এখন আর সেই দিন নেই, উপজেলার চাষযোগ্য সব জমিতেই চাষ হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যেও নেই কোনো হতাশা। সৌরবিদ্যুতের সংযোগ এলাকায় বসেছে সোলার পাম্প। পাম্পের পানিতে চলছে সেচকাজ। সৌরবিদ্যুৎ বদলে দিয়েছে জুরাছড়ির চাষের চিত্র।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ডেনমার্কভিত্তিক সহায়তা প্রতিষ্ঠিান ডেনিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিসের (ডানিডা) অর্থায়নে এসআইডি-সিএইচটি, ইউএনডিপির সহায়তায় পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রকল্প রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পটি পার্বত্য অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প (সিসিআরপি)। এ প্রকল্পের আওতায় জুরাছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের তোন্যাবীছড়া জলবায়ু সহনশীল কমিটির মাধ্যমে কৃষি সেচব্যবস্থায় সৌর প্যানেল ও পাম্প এবং বীজ সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সীতারাম পাড়া, সাপছড়ি পাড়া, পূর্ব সাপছড়ি, লুলাংছড়ি প্রতিটি পাড়ায় একটি করে নয়টি সোলার বিশিষ্ট ৩ হাজার ওয়ার্ড শক্তিসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্যানেলে রয়েছে একটি করে সোলার পাম্প। সকালে রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় জমিতে পানি তোলা। এটি বিকেল ৫টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এছাড়া পাহাড়ে এখন সন্ধ্যা নেমে এলেই সৌরবিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হচ্ছে পাহাড়ের প্রতিটি ঘর। শিশুরা পড়াশোনা করছে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত। আবার কেউ সারাদিন কৃষিকাজের ব্যস্ততা শেষে রাতে টেলিভিশন দেখছেন। অনেক নারী রাতে সৌর আলো ব্যবহার করে নিজেদের ও বিক্রয়ের জন্য কোমর তাঁত বুনছেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তর্পন চাকমা বলেন, '২০১৬-১৭ অর্থবছরে টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের ১৭১টি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৭টি, স্টিক লাইট ১৯৯টি দেওয়া হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ৫১৬টি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৬৬টি সোলার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ হাজার পরিবারকে সৌরবিদ্যুৎতায়নের আওতায় আনা হয়েছে।

চালকাপাড়ার লক্ষ্মী দেবী (৪০) বলেন, 'সারাদিন জুমে কাজ করি, রাতে অবসর সময়ে সৌরবিদ্যুতের আলো ব্যববহার করে কোমর তাঁতে কাপড় বুনন করি। ১০-১৫ দিনে একটি কাপড় তৈরি করি। প্রতিটি কাপড় বাজারে বিক্রি হয় ৩-৪ হাজার টাকা দামে। এ টাকায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই।'

বনযোগীছড়া ইউনিয়নে বরইতলীর চম্পা, কনক চাকমাসহ অনেকে রাতে অবসর সময়ে কোমর তাঁতে কাপড় বুনে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা লাভ করছেন।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সিসিআরপির জেলা কর্মকর্তা পলাশ খীসা বলেন, 'জলবায়ুর পরিবর্তনে দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে খরার প্রভাবে জুরাছড়ি তোন্যাবীছড়া সিআরসি এলাকায় (পাঁচটি পাড়া) অধিকাংশ জমি অনাবাদি থাকত। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীতা থেকে এসব অনাবাদি জমি চাষাবাদের উপযোগী করতে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে সৌর প্যানেল ও পাম্প এবং বীজ সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুষ্ফ্মিতা চাকমা জানান, সোলার প্যানেল ও পাম্প স্থাপনে ৪৫ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কৌশিক চাকমা বলেন, 'প্রান্তিক এলাকায় প্রতিটি ঘরে ঘরে সৌর প্যানেল স্থাপনে পড়ালেখার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা এলাকার স্কুলগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে কম্পিউটার ব্যবহার করা যাচ্ছে, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।'

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিতেন্দ্র কুমার নাথ বলেন, 'সরকারের বিনামূল্যে সোলার প্যানেল বিতরণ কর্মসূচি পাহাড়ের মানুষের জন্য খুবই যুগোপযোগী প্রকল্প। ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুতের আলো ব্যবহার করে নারীদের আত্মকর্মসংস্থান ও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুযোগ হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা বলেন, 'সৌর পাম্পের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে পাহাড়িদের জীবন।'

মন্তব্য করুন