চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন (ট্র্যাক) স্থাপনের কাজ এখন দৃশ্যমান। আগামী বছর থেকে নতুন এই রেল রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার কথা। রেললাইনের কাজ শেষ হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি ট্রেনে যাওয়া যাবে কক্সবাজার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হবে। তবে বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি দুই লেনের হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। আবার মহাসড়কটির কিছুদূর পরপর থাকা বিপজ্জনক বাঁকগুলো দুর্ঘটনার ফাঁদ হয়ে উঠেছে। সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে চলাচলের সড়ক ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই লেগে যায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। অবশ্য এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। মহাসড়কে নির্মিত হচ্ছে ৮টি ছয় লেনের সেতু। নির্মিত হচ্ছে একাধিক বাইপাস ও ওভারপাস। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিনের সূচনা হয়েছে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে যানজটহীন, নির্বিঘ্ন ও বাধাহীন যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে সড়কের চারটি স্থানে বাইপাস, একটি স্থানে ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সওজ। এজন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন করতে মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা চলছে। সড়কের চারটি স্থানে ছয় লেনের সেতু নির্মাণকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

সওজ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পটিয়া, দোহাজারী, আমিরাবাদ ও চকরিয়ায় ছয় লেনের সেতু নিমাণ করা হচ্ছে। সড়কের কেরানীহাট এলাকায় বাইপাস সড়ক করার কথা থাকলেও তাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ওই অংশেও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সড়কে বাইপাস ও ফ্লাইওভার নির্মাণে এখন জরিপ কাজ চলছে।

সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক জুলফিকার আহমেদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের চারটি স্থানে ছয় লেনের সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া বরুমতি খালের ওপর একটি, পটিয়ার ইন্দ্রপুল খালের ওপর তিন লেনের দুটি, দোহাজারী শঙ্খ নদীর ওপর তিন লেনের দুটি ও চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর ওপর তিন লেনের দুটি সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধে শঙ্খ নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতুর ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একইভাবে ইন্দ্রপুল সেতুর ৫০ শতাংশ, মাতামুহুরী সেতুর ৯০ শতাংশ ও বরুমতি খালের ওপর নির্মাণাধীন সেতুটির ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

সওজ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে বাইপাস রোড ও ফ্লাইওভার নির্মাণসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে এখন একটি প্রকল্পের আওতায় সমীক্ষার কাজ চলছে। বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল এই সমীক্ষা চালাচ্ছেন। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ সমীক্ষার কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে ক্রস বর্ডার নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের সেতুগুলো নির্মাণের কাজ চলছে।

এদিকে ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমিয়ে আনার পাশাপাশি যানজট নিরসনে পটিয়ায় একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পটিয়ার ইন্দ্রপোল থেকে কমলমুন্সির হাট পর্যন্তত এই বাইপাসটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ছয় কিলোমটার বাইপাস ইতোমধ্যে ৩৮ দশমিক ২২ একর জমি নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ১৭ অক্টোবর পটিয়া বাইপাস উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন করে আরও জমি অধিগ্রহণ করে বাইপাসটি ৩০০ ফুট প্রশস্ত করা হবে। বাইপাস সড়কটি হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম শহর থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম শহরমুখী গাড়িগুলো এই বাইপাস দিয়ে চলাচল করছে। এতে যান চলাচলে কমে যাচ্ছে সময়ও। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটি নানা কারণে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক ও সহজ করতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে বদলে দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের পাঁচটি যানজট এলাকা চিহ্নিত করে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এসব বাইপাস নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা। নির্মাণকাজ শেষ হলে সড়কে যান চলাচল সহজ ও নির্বিঘ্ন হবে।