তিন কালের সাক্ষী হয়ে গহিন বনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ডাকবাংলো। ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৩ সালে নির্মিত এই ডাকবাংলোতে রাত কাটিয়েছেন অনেক রথী-মহারথী। এই বাংলো পরিদর্শন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তিনি সেখানে রাতযাপন করেননি।\হকক্সবাজার বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ডাকবাংলোর বয়স এখন হয়েছে ৮৮ বছর। পরিদর্শন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী এখানে মেহমানদের রাতযাপন শুরু হয়েছে ১৯৩৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। আগে সড়ক যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে এক দিনে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সে কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাঝামাঝি জনপদ ডুলাহাজারার অরণ্যে এই ডাকবাংলো স্থাপন করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে।

চকরিয়ার ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক ফটকের পশ্চিম পাশে একটি টিলায় দৃষ্টিনন্দন এই বাংলোটির অবস্থান। এলাকাটি ডাকবাংলো পাহাড় হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ প্রায় ৮৮ বছর ধরে টিকে রয়েছে গাছ, ইট-কাঠ ও টিনের তৈরি এই ডাকবাংলো।

সংশ্নিষ্টরা জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বাংলোতে রাত কাটিয়েছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানসহ অনেক ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি এই বাংলোতে এসেছেন। ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশের ৫০ বছরেও বাংলোটি নান্দনিক সৌন্দর্য কমেনি।

প্রবীণদের মতে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণে পলাতক থাকাকালে বঙ্গবন্ধু এই বাংলোতে বিশ্রাম ও আতিথেয়তা গ্রহণ করলেও রাতযাপন করেনি। বাংলোর পরিদর্শন বইয়ের তথ্যমতে, এখানে একাধিকবার রাতযাপন করেছেন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান, একাত্তরের কসাইখ্যাত ইয়াহিয়া খান, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ও পাকিস্তান সংসদের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি ওসমানী এখানে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন।\হডাকবাংলোর সাবেক কেয়ারটেকার আবদুর রহিম জানান, তার বাবাও ছিলেন এই বাংলোর কেয়ারটেকার। তিনি জীবদ্দশায় আবদুর রহিমকে জানিয়েছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পলাতক থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলোতে এসেছেন, খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম নিয়েছেন। তবে পরিদর্শন বইতে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। সম্ভবত মামলার কারণে তিনি তার অবস্থান জানাতে চাননি। জানা যায়, 'আইয়ুব খান ডাকবাংলোতে ব্রিটিশের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে রাত কাটিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তা হিসেবেও রাত কাটিয়েছেন। ডুলাহাজারা ডাকবাংলোর পরিদর্শন বইয়ের তথ্য অনুসারে আইয়ুব খান সেখানে পাঁচবার রাতযাপন করেছেন। প্রথমবার রাতযাপন করেছেন ব্রিটিশের সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট। সর্বশেষ রাতযাপন করেছেন ১৯৬৫ সালের ১৫ মার্চ। ১৯৬৪ সালের ৬ জানুয়ারি আইয়ুব খানের রোপিত একটি রাবার গাছ এখনও রয়েছে ডুলাহাজারা ডাকবাংলোতে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কর্নেল হিসেবে এম এ জি ওসমানী ১৯৬২ সালের ১৩ জানুয়ারি রাতযাপন করেছেন।\হফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম ও সহকারী বনসংরক্ষক (শিক্ষানবিশ) আশিকুর রহমান জানান, কক্সবাজার বনবিভাগের ডুলাহাজারা ডাকবাংলোর বিশ্রামাগারটি অনেক ঐতিহ্যবাহী। এটি যত্নের মাধ্যমে বনবিভাগ টিকিয়ে রেখেছে।'

আশিকুর রহমান আরও বলেন, 'এখন উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে আগের মতো আর রাষ্ট্রীয় অতিথিরা এখানে রাতযাপন করেন না। তবে অনেকে এখনও ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিতে আসেন।' ডুলাহাজারা ডাকবাংলোর বর্তমান কেয়ারটেকার ওবাইদুর রহমান। তিনি বলেন, 'পুরোনো ঐতিহ্য হিসেবে অনেকে ডুলাহাজারার এই বন-বাংলোটি দেখতে আসেন। রাষ্ট্রীয় অতিথিরাও আসা-যাওয়ার পথে নান্দনিক এই পার্কে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান আনন্দে ফিরে যান।'

মন্তব্য করুন