আঞ্চলিক নাটকে নবযুগ এনেছেন তরুণ নাট্যজন উত্তম কুমার। তিনি একাধারে নাট্য রচয়িতা, পরিচালক ও অভিনেতা। গত তিন বছরে উত্তম কুমার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় দেড় হাজার নাটক বানিয়েছেন, যা প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৮০-১০০টি আঞ্চলিক নাটক ও নাটিকা বানান তিনি।\হশাহ আমানত মিউজিক, লাভ মিউজিক সিটিজি, মিউজিক প্লাস, সিটিজি ভিশন, সিডি মিউজিক স্টেশন, ওএসজি, সিটিজি কমেডি ২৪সহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত হয় এসব নাটক। একেকটি নাটকের ভিউ হয় সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত। বিশেষ করে লাভ মিউজিক সিটিজিতে আধুনিক ও উন্নত মানের নাটক প্রচারিত হয়। উত্তম কুমারের তৈরি নাটক প্রচার করে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল মাসে ৩০০ থেকে দুই হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করে।\হচট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাটকের স্বর্ণযুগ ছিল সত্তর ও আশির দশক। আঞ্চলিক নাটককে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে অভিনয় ও সংগীত শিল্পীদের একটি বড় দল তৈরি হয়েছিল, যাদের মধ্যে নাট্য রচয়িতা হিসাবে ছিলেন আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতারের মতো কালজয়ী সংগীতজ্ঞ। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক নাটক রচনা ও সেই নাটকে গান গেয়ে দেশ মাতিয়েছেন শিল্পী সঞ্জিত আচার্য্য। তারা ছিলেন মূলত গীতিকার-সুরকার ও শিল্পী। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তারা আবির্ভূত হয়েছিলেন নাট্যকার হিসেবে। আঞ্চলিক নাটককেন্দ্রিক সেই শিল্পী-দলে ছিলেন আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, কালজয়ী শেফালী ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, আবদুর রহিম, শিল্পী রানী ও কান্তা নন্দীর মতো তুমুল জনিপ্রয় শিল্পীরা। আর অভিনয়ে ছিলেন পরবর্তী সময়ে 'বেদের মেয়ে জোছনা' খ্যাত অঞ্জু ঘোষ, চিরসবুজ নায়ক পংকজ বৈদ্য সুজন, আইয়ুব রানা, মাধুরী ধরসহ অনেকে। নাটকের ফাঁকে কিংবদন্তি দীলিপ হোড়ের কৌতুক দর্শকদের উন্মাতাল করে দিত।

১৯৭৬ সালের ২৬-২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম মুসলিম হলে মঞ্চস্থ হয়েছিল আবদুল গফুর হালী রচিত নাটক 'গুলবাহার'। ৭৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুসলিম হলে মঞ্চস্থ হয় এম এন আখতার রচিত নাটক 'চুড়িওয়ালা'। এই দুই সংগীত-গুণী আঞ্চলিক নাটক দিয়ে মাতিয়ে দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম, মাতিয়ে দিয়েছিলেন দেশ। এরপর সঞ্জিত আচার্য্যের 'সাম্পানওয়ালা' নাটককে তো চলচ্চিত্রে রূপদান করেন বরেণ্য সংগীতজ্ঞ সত্য সাহা।\হগফুর হালীর চিরসবুজ গান 'মনের বাগানে, সোনাবন্ধু ও শাম রেঙ্গুম ন যাইও রে', এম এন আখতারের 'কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে' কিংবা সঞ্জিত আচার্য্যের 'বাঁশখালী-মইষখালী' গানগুলো কিন্তু আঞ্চলিক নাটকেরই গান।\হউত্তম কুমার যেসব আঞ্চলিক নাটক সেসব নাটক মূলত সংলাপ-নির্ভর। চট্টগ্রামের প্রান্তিক মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, এক কথায় বাংলার চিরায়ত লোকজীবন এসব নাটকের উপজীব্য। এসব নাটকের বিশেষত্ব হলো, বিচিত্র ধরনের সংলাপের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ভাষাকে নুতন প্রাণ দিয়েছে এসব আঞ্চলিক নাটক। গ্রাম-শহরের যেসব আঞ্চলিক শব্দ হারিয়ে গেছে, সে সব শব্দ শোনা যায় উত্তম কুমারের নাটকে।\হউত্তম কুমার এক দিনে ২০-২৫ মিনিটের পাঁচ থেকে ছয়টি নাটক নির্মাণ করেন। কোনো লিখিত চিত্রনাট্য নেই, থিমের ওপর ভিত্তি করে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে একেকটি নাটক বানান তিনি। তার নাটকে অভিনয় করেন এককালের 'মিডা চুইনচুইন্যা' ও পরে 'মেরা মিয়া' খ্যাত দীলিপ হোড়। রয়েছেন প্রবীণ অভিনয়শিল্পী দোয়াইন সেনও। আবার এসব আঞ্চলিক নাটক ঘিরে তৈরি হয়েছে গুণী একদল অভিনেতা-অভিনেত্রী। যেমন রুজি-ইদ্রিসের অভিনয় দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। আবার ফাহিম-রাফি-কল্পনারা যেভাবে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ বলেন, সেটা শুনলে মনে হবে আরে এ তো আমার মায়ের মুখের বুলি!

চট্টগ্রামে উত্তম ছাড়াও আঞ্চলিক নাটক বানিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন মঞ্জুর মোরশেদ। তার কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেলের নাটক তিনি নিজেই রচনা ও পরিচালনা করেন।

উত্তম কুমারের প্রথম আঞ্চলিক নাটক 'আজব কবিরাজ' বাজারে আসে ২০১০ সালে ঈদে। এক দিনে ইউটিউবের জন্য তিন থেকে ছয়টি নাটিকা তৈরির ফলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাটকের মান কমে যাচ্ছে বলে অকপটে স্বীকার করেন এই নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা। তবুও প্রযোজকের কথা মাথায় রেখে কাজ করতে হয় বলে জানান তিনি।\হএসব নাটকের দর্শক কারা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ ও রোহিঙ্গারা এই নাটকের মূল দশক।' উত্তম বলেন, 'এসব নাটক ইউটিউবে প্রচার হওয়ার কারণে প্রতি মাসে প্রচুর রেমিট্যান্স আসে বাংলাদেশে। একটি নাটক বানাতে গড়ে ৫-৭ পৃষ্ঠা ২ :কলাম ৪

হাজার টাকা খরচ হয়। মাসে গড়ে ১০০টি নাটক বানাই, যাতে ইউটিউব চ্যানেলের মালিকরা প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। তাদের বিনিয়োগ উঠে আসে বলে আমি প্রতিনিয়ত নাটক বানাতে পারি।'

নাম উত্তম কুমার হলেও তাকে চট্টগ্রামের অধিকাংশ মানুষ লেডামিয়া নামে চেনে। জন্ম ১৯৮৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার ডুলাহাজারা গ্রামে। পিতার নাম বিজয় কৃষ্ণ ধর মায়ের নাম মায়া রানী ধর। ডুলাহাজারা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডুলাহাজারা উচ্চ বিদ্যালয় ও চকরিয়া ডিাগ্র কলেজে পড়াশোনা করেছেন উত্তম।\হচকরিয়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যায়নকালে বাংলার অধ্যাপক রাহাগীর মাহমুদের উৎসাহে কবিতা লেখা শুরু করেন উত্তম কুমার। স্থানীয় পত্রিকায় কবিতা লেখার সুবাদে কন্ঠশিল্পী ও সুরকার আজম চৌধুরীর হাত ধরে মিডিয়াতে পথচলা শুরু হয়। জনপ্রিয় গীতিকার সৈয়দ মহিউদ্দিনের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশ বেতারে গীতিকার হিসাবে তালিকাভুক্ত হন।\হপ্রয়াত অভিনেতা ইব্রাহিম টায়গারের প্রযোজনায় শেখ শওকত ইকবাল চৌধরীর পরিচালনায় 'জীবনের রঙ' নামের একটি নাটকের চিত্রনাট্য রচনা করে হাত পাকান উত্তম কুমার। বলতে গেলে নাট্যপরিচালক শেখ শওকত ইকবাল চৌধুরীর কাছেই তার নাটকের হাতেখড়ি। উত্তম কুমার গুরু মানেন শেখ শওকত ইকবাল চৌধুরীকে। শাহাব উদ্দীন সাবুর উৎসাহে নাটক পরিচালনায় মন দেন। প্রযোজক নুরুল হক ও মনজুর মোরশেদের অনুপ্রেরণায় অভিনয়ে নাম লেখান তিনি, উত্তম কুমার হয়ে উঠেন আজকের লেডামিয়া। প্রযোজক সামসুল হকের অনুপ্রেরণায় ঢাকার নাট্যজগতেও একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন উত্তম কুমার।\হখ্যাতিমান অভিনেতা দীলিপ হোড় বলেন, 'সত্তরের দশকে আঞ্চলিক নাটকের যে স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল সেটা আমাদের হাত ধরে আশি ও নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এগিয়ে চলেছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আঞ্চলিক নাটকে খরা চলতে থাকে। ২০১৮ সাল থেকে ইউটিউবের কল্যাণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাটকে নতুন ধারা তৈরি হয়, এই নাটকে নতুন জোয়ার আসে, আর তা উত্তম কুমারের হাত ধরেই।'

আঞ্চলিক নাটকের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হলেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। তিনি বলেন, 'বর্তমানে আঞ্চলিক নাটকের দারুণ জনপ্রিয়তা চলছে। আমি মূলত নাটক এডিট করতাম। কিন্তু প্রযোজক নুরুল হকসহ কয়েকজনের উৎসাহে নাটকে অভিনয় শুরু করি। উত্তম কুমার নির্মিত প্রায় প্রতিটি নাটকই দর্শকপ্রিয় হয়েছে।'

মন্তব্য করুন