এদেশেই বিশ্বমানের তরুণ গবেষকরা আছেন

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৪      

মো. মাইনউদ্দিন সোহাগ

বায়োটেকনোলজি বিষয়ে নতুন নতুন গবেষণা আর উদ্ভাবনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে ক'জন আন্তর্জাতিকমানের বিশিষ্ট গবেষক রয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রফেসর ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে তোফাজ্জল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। তিনি বলেছেন, উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ পেলে তরুণরা বিশ্ববাসীকে চমকে দেওয়ার মতো একটি জ্ঞাননির্ভর সমৃদ্ধ দেশ গড়তে পারবে


প্রফেসর ড. তোফাজ্জল ইসলাম ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে উদ্ভিদের শিকড়াঞ্চল থেকে আহরিত উপকারী লাইসোব্যাকটার ব্যবহার করেন, মাটিবাহিত অত্যন্ত ক্ষতিকর উদ্ভিদ রোগ-জীবাণুর কার্যকরী জৈব দমনের কার্যকর ব্যবস্থা নেন, ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক রোগ-জীবাণু দমনের নতুন মলিকুলার কৌশল উদ্ভাবন করেন। ফলে কৃষি উৎপাদনে শস্যের ফলন বৃদ্ধিতে রোগ প্রতিরোধক হিসেবে সহায়তা করবে। তার গবেষণার ফলাফল পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও স্বল্প খরচে অত্যন্ত ক্ষতিকর ওওমাইসিটি দ্বারা সংঘটিত উদ্ভিদ রোগ দমনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উপকারে আসবে। শুধু তাই নয়, ড. তোফাজ্জল উদ্ভিদের অত্যন্ত ক্ষতিকর রোগ-জীবাণু পেরোনোস্পোরোমাইসিটির বায়োলজি, পোষক ও অপোষক উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের আণবিক পর্যায়ে মিথস্ক্রিয়া এবং এসব জীবাণু দমনে বয়োকন্ট্রোল এজেন্টগুলোর কার্যকারিতার কৌশল উদ্ঘাটন করেছেন। মৌলিক গবেষণায় তার অবদান বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এ ছাড়া ড. ইসলাম উদ্ভিদ ও পরিবেশে বিদ্যমান উপকারী ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক নিঃসৃত ৩০টির অধিক নতুন প্রাকৃতিক যৌগ উদ্ভাবন, যা পোষক-জুওস্পোরের রাসায়নিক যোগাযোগের কৌশলকে বিচ্ছিন্ন, বা নষ্ট করে উদ্ভিদকে রোগাক্রমণ থেকে রক্ষায় সক্ষম। তার গবেষণালব্ধ নতুন জ্ঞান শতাধিক প্রবন্ধ উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর সংবলিত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি বিশ্বখ্যাত ঊষংবারবৎ, ঝঢ়ৎরহমবৎ, ঈঅইও, ইষধপশবিষষ, ডরষবু, ঈজঈ প্রকাশনা কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তকে ১৫টি অধ্যায় লিখেছেন। গবেষণালব্ধ এসব নতুন জ্ঞান সুলভ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্ভিদ রোগ দমনের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়ক। প্রফেসর ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম টঝওউ-এর অর্থায়নে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে 'টেকসই স্ট্রবেরি উৎপাদন' শীর্ষক একটি প্রকল্প মাঠপর্যায়ে কৃষকের খামারে দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকায় স্ট্রবেরি উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ দেশে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ফল সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে। ইতিমধ্যে বিশ্বমানের গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসর ইসলাম আলেকজান্ডার হুমবোল্ট, কমনওয়েলথ এবং জেএসপিএস ফেলো নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তার গবেষণালব্ধ ফল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, হংকং, নরওয়ে, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জ্যামাইকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে উপস্থাপন করেন।
প্র্রফেসর ইসলাম সরকারি ও বেসরকারিভাবে বহু পুরস্কার অর্জনকারী এ দেশের একজন অন্যতম গবেষক। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে দেশে-বিদেশে যেমন জাপান, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাদান ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে বেশ সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজি শিক্ষায় একটি পরিবর্তন ও তরুণ গবেষকদের জন্য একটি সুদৃঢ় প্লাটফর্ম তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বর্তমানে ১৪ জন মাস্টার্স এবং ১ জন পিইচডি শিক্ষার্থীর গবেষণা তত্ত্বাবধান করছেন। উল্লেখ্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে বিএসসি. এজি (অনার্স) এবং এমএসসি. এজি পর্যায়ে দুটিতেই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জনের মাইলফলক রচনা করে উত্তীর্ণ হয়েছেন এ বায়োটেক বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। এরপর তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য বিশ্ববিখ্যাত স্কলারশিপে প্রযুক্তিখ্যাত দেশ জাপান সরকার প্রদত্ত মনবুশো স্কলারশিপ পেয়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি সমাপ্ত করেন। তিনি এ যাবত ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অ্যাওয়ার্ড-২০১১, গবেষণার জন্য বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড যথাক্রমে ২০০৪ ও ২০০৮ পান, জাপান সোসাইটি কর্তৃক বেস্ট সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০০৩, চ্যান্সেলর স্বর্ণ পদক-১৯৯৫, বাকৃবি স্বর্ণপদক- ২০০৩, ইউজিসি মেরিট অ্যাওয়ার্ড-১৯৯০ ও প্রফেসর এ করিম মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড-১৯৯২ পান। ইতিমধ্যে ড. তোফাজ্জল ১৫টির মতো প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। যেগুলো বিশ্বব্যাংক, ব্রিটিশ কাউন্সিল, যুক্তরাষ্ট্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, জাপানসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অর্থায়ন করেছে। তিনি বাংলাদেশের পরিবেশ থেকে আহরিত ৩৫টি নতুন ব্যাকটেরিয়ার জিন সিকুয়েন্সিং শনাক্তকরণে কাজ করেছেন যা ঘঈইও-এর গেনিব্যাংক কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের সহযোগিতায় তার ৪টি ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ জীবন নকশা উন্মোচনের কাজ এগিয়ে চলছে। কমনওয়েলথ একাডেমিক স্টাফ ফেলো হিসেবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামে ম্যাটারোজিনমিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুন্দরবনের অণুজীব বৈচিত্র্য উদ্ভাবন তার একটি অনন্য কর্ম।
দেশের তরুণ গবেষকদের উদ্দেশে ড. ইসলাম বলেন, 'বুদ্ধিমত্তা ও অনুসন্ধিৎসার মাপকাঠিতে আমাদের তরুণসমাজ বিশ্বমানের। উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ পেলে তারা বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে একটি জ্ঞাননির্ভর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে পারবে।