একলা হাঁটি গৌহাটি

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০১৭

গৌহাটি একটি শিল্প শহর ও নদীবন্দর। আসামের বাণিজ্যিক কেন্দ্রও বটে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরুর দিকে এটি ছিল কামরূপ রাজ্যের রাজধানী। প্রাচীন অনেক মন্দিরসহ নানা ঐতিহ্যে ভরপুর এ অঞ্চল। ঘুরে এসে লিখেছেন গাজী মুনছুর আজিজ
পল্টনবাজার নেমে চারপাশে চোখ বুলিয়ে ভাবি, ঢাকার পুরানা পল্টন বা নয়াপল্টনের সঙ্গে আসামের রাজধানী গৌহাটির এ পল্টনবাজারের কোনো সম্পর্ক আছে কী, নয়তো নাম কেন এক হবে? অবশ্য সে ভাবনা বেশিক্ষণ জিইয়ে রাখিনি। কারণ সম্পর্ক খুঁজতে এখানে আসিনি। আসার উদ্দেশ্য তো আসাম দর্শন। তবে একটা মিল আছে, সেটি হলো পুরানা পল্টন বা নয়াপল্টনের মতো পল্টনবাজারও ব্যস্ততম জনপদ।
আসামের বর্ণনা ঘেঁটে জানা গেল, গৌহাটি একটি শিল্প শহর ও নদীবন্দর। এটি আসামের বাণিজ্যিক কেন্দ্রও বটে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরুর দিকে এটি ছিল কামরূপ রাজ্যের রাজধানী। হিন্দুদের তীর্থস্থান হিসেবে এখানে প্রাচীন অনেক মন্দির আছে। চা, রেশম, পেট্রোলিয়াম এবং জীববৈচিত্র্যের জন্যও আসাম রাজ্যটি প্রসিদ্ধ। এশীয় হাতির অন্যতম আবাসস্থল এ রাজ্য। এ ছাড়া এ রাজ্যের বিভিন্ন বনে বাঘ, হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি সংরক্ষিত আছে। তবে আসাম রাজ্যটি একশিংয়ের গণ্ডারের জন্য বন্যপ্রাণী বা প্রকৃতিপ্রেমীর কাছে বেশি পরিচিত। ফলে এ রাজ্যটি বন্যপ্রাণী পর্যটনের ক্ষেত্রে ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠছে। এক সময় আসামের নাম কামরূপ ছিল। আরও প্রাচীনকালে কামরূপ ছিল প্রাগজ্যোতিষ নামে। সব মিলিয়ে আসাম দর্শনের বাসনা নিয়ে খুব সকালে শিলংয়ের পুলিশ বাজার থেকে সুমো গাড়িতে রওনা হই গৌহাটির উদ্দেশে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার মাথায় পেঁৗছি পল্টনবাজার।
গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে বাসস্ট্যান্ডের পাশের টি-স্টল থেকে চা খেয়ে উঠি লোকাল বাসে। ফ্লাইওভারে প্রায় ১০ মিনিট যানজটে থাকার পর ১৫ মিনিটের মাথায় নামি কামাখ্যা মন্দিরে যাওয়ার বাসস্যান্ডে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বাস এলে তাতে উঠে আসি কামাখ্যা মন্দির। বেশ কিছু সময় প্রাচীন এ মন্দির ঘুরে বের হয়ে আবার লোকাল বাসে উঠি। নামি আসাম স্টেট মিউজিয়ামের গেটে।
গৌহাটি শহরের পানবাজারের কাছেই এ জাদুঘর। আসাম রিসার্স সোসাইটি ১৯৪০ সালে এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন কনকলাল বড়ূয়া। ১৯৫৩ সালে জাদুঘরটি আসাম রাজ্য সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। আসাম রাজ্যে হলেও এ জাদুঘর ভারতের অন্যতম বৃহৎ সংগ্রহশালা। এখানে আছে প্রচীনকালের পাথরের মূর্তি, কাঠ, ধাতু এবং টেরাকোটার নানা নিদর্শন, লিপি, কারুশিল্প, লোকশিল্প, নানা ধরনের অস্ত্রসহ আসামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির নানা নিদর্শন।
জাদুঘরে ১৯৮৫ সালে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ লাইব্রেরিতেও প্রাচীন অনেক শর্টহ্যান্ডের নমুনা সংগ্রহ আছে। এ ছাড়াও এখানে সংগ্রহ আছে বিভিন্ন সাময়িকী, পত্রিকাসহ নানা ধরনের বই। জাদুঘরটি খোলা থাকে গ্রীষ্মকালে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ৪টা এবং শীতকাল অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে পৌনে ৪টা পর্যন্ত। ১টা থেকে দেড়টায় দুপুরের বিরতি। সোমবার বন্ধ থাকে।
জাদুঘর দেখে আসি যুদ্ধস্মারক উদ্যানে। জাদুঘরের পাশেই বিশাল একটি দিঘিকে ঘিরেই মূলত এ স্মারক উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। দিঘির সম্মুখভাগেই আছে যুদ্ধস্মারক বিমান ও ট্যাঙ্ক। এ ছাড়া আছে কিছু ভাস্কর্য। দিঘির চারপাশে গাছগাছালি, হাঁটাচলা ও বসার ব্যবস্থাও আছে।
স্মারক উদ্যান থেকে লোকাল বাসে আসি পল্টনবাজার। সময় লাগল ৫ মিনিটের মতো। তারপর হেঁটে আসি গৌহাটি রেলস্টেশন। বেশ বড় এ স্টেশন থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ট্রেন যাতায়াত করে। স্টেশনটি ঘুরে দেখি।
রেল স্টেশন থেকে বেরিয়ে হেঁটে আসি পানবাজার। তারপর এখান থেকে হেঁটে আসি ফেন্সিবাজার। রেল স্টেশন থেকে কাছেই এসব বাজার। ফেন্সিবাজার থেকে চা কিনি। দার্জিলিংয়ের চায়ের মতো ভারতসহ সারা দুনিয়াতে আসামের চা বিশেষভাবে বিখ্যাত। এ চায়ের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া আসামিকা। চা কিনে দুপুরের খাবার খেয়ে ফুটপাতের টি-স্টলে চা খাই। তারপর আবার পল্টনবাজার থেকে উঠি শিলংয়ের গাড়িতে।
যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া : আসাম যাওয়ার জন্য মেঘালয়ের ডাউকি বর্ডার সহজ মাধ্যম হবে। কারণ কলকাতা থেকে আসাম অনেক দূর। অবশ্য কলকাতা থেকে গৌহাটি বিমানে যাওয়া যায়। সিলেটের তামাবিল বর্ডার পার হলেই ডাউকি বর্ডার। ডাউকি থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায় শিংলের। ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রুপিতে ট্যাক্সিতে চারজন শিলং যেতে পারবেন। শিলংয়ের পুলিশ বাজার থেকে ট্যাক্সি বা সুমো জিপ পাবেন গৌহাটি যাওয়ার জন্য। ভাড়া ট্যাক্সিতে ১৫০ রুপি আর সুমো বা জিপে ৮০ রুপি জনপ্রতি।
থাকার জন্য গৌহাটির পল্টনবাজার ও রেলস্টশনের আশপাশে অনেক হোটেল আছে। ভাড়া সিঙ্গেল রুম ৭০০ থেকে ২ হাজার রুপি। খাওয়ার জন্যও পল্টনবাজার ও রেলস্টেশন এলাকায় অনেক হোটেল পাবেন। ১০০ থেকে ৩০০ রুপিতে ভাত-মাছ-মাংস-রুটি সবই পাবেন।
পল্টনবাজার বা রেলস্টশন থেকে লোকাল বাসে বিভিন্ন স্থানে যেতে পারবেন। চাইলে রেলস্টেশন এলাকা থেকে জিপ বা ট্যাক্সি ভাড়া করেও ঘুরতে পারবেন।
হোটেলে থাকার জন্য পাসপোর্টের ফটোকপি ও ছবির প্রয়োজন হবে। ডলার ভাঙানোর জন্য শিলংয়ের পুলিশ বাজার মানি এক্সচেঞ্জ আছে।
আসাম যেতে চাইলে ভিসার আবেদনে ডাউকি বর্ডার উল্লেখ করুন (যদি সড়কপথে তামাবিল হয়ে যেতে চান)। যাওয়ার আগে সোনালী ব্যাংকে ৫০০ টাকা ভ্রমণ কর দিয়ে নিন। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র, এনওসিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একাধিক ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। হোটেল ভাড়াসহ নানা কাজে লাগতে পারে। টাকা বা ভারতীয় রুপি না নিয়ে সঙ্গে ডলার নেওয়া ভালো। বর্ডারে সঙ্গে নেওয়া ডলার উল্লেখ করতে হয়।
ঢাকা থেকে রাতের বাসে বা ট্রেনে সিলেট গিয়ে সেখান থেকে অটোরিকশায় তামাবিল বর্ডার। সকালেই বর্ডারে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কার্যক্রম শুরু হয়। এ ছাড়া কমলাপুর থেকে শিলংয়ের উদ্দেশে বিআরটিসি-শ্যামলী বাস ছাড়ে। এ বাস বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে শুক্রবার দুপুরে পেঁৗছে শিলং। সেখান থেকে আবার সোমবার সকালে রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশে। এ বাসের আসা-যাওয়ার ভাড়া ৫ হাজার ৬০০ টাকা। যোগাযোগ করতে পারেন কমলাপুরের বিআরটিসি-শ্যামলী বাস সার্ভিস কাউন্টারে। আর কলাকাতা হয়ে যেতে চাইল বেনাপোল বর্ডার ব্যবহার করুন।

ছবি : লেখক