বর্ণাঢ্য খাগড়াছড়ি

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৭

পাহাড়ের সবুজ শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি এখানে বিশ্রাম নেয়। তারপর আবার ঝর্ণার দিকে যায়। জায়গাটা আসলে গিরিপথের অংশ। আর দেরি না করে রিচাং ঝর্ণার খোঁজে পা বাড়ালাম। লিখেছেন ঋআজ মোর্শেদ
ঈদের তৃতীয় দিন সন্ধ্যার পর মিরপুরে কোনো এক ছয়তলার ছাদে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে মেঘের ফাঁকে তারা দেখছিলাম। সঙ্গে সহজিয়া ব্যান্ডের গিটারিস্ট শিমুল আর ওর ছাত্র মিল্টন। এবারই প্রথম ঈদ থেকে ঈদ জানাজানি হলো। তবুও আমাদের ভেতর বিন্দুমাত্র 'ঈদের' কোনো আমেজ নেই! গুমোট আর স্যাঁতসেঁতে চারপাশ। নিজেরা আবোল-তাবোল প্রসঙ্গ তুলে একঘেয়ে সময় পার করছি। কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ শিমুল প্রস্তাব ছুড়ল_ কোথাও ঘুরতে যাওয়া যায় কি-না। কী টেলিপ্যাথি! আমিও তখন এ রকম কিছু ভাবছিলাম আর বাকি থাকা মিল্টনও সাড়া দিতে দেরি করল না। আমরা তিনজন আর দুটি গিটার। ঠিক হলো খাগড়াছড়ি যাব। ওই শহরটা নাকি মিল্টনের চেনা। মোবাইল ফোনে সময় দেখে নিলাম। রাত সাড়ে ৯টা। জোগাড়যন্তর, খাওয়া-দাওয়া আর হাবিজাবি করে সিএনজি যখন সায়েদাবাদে তিন চাকা ঠেকাল, তখন রাত প্রায় ১২টা। ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত কাউন্টারের উদ্দেশে পা চালালাম। এদিক-সেদিক তন্নতন্ন করে কোথাও ৫২০ টাকায় খাগড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি কোনো বাস পেলাম না। ঠিক করলাম চট্টগ্রাম যাব। ওখানে যেতে পারলে কোনো একটা উপায় বের করা যাবে। ৪-৫টা কাউন্টার ঘুরে সাউদিয়া পরিবহনের রাত ১২টার টিকিট কেটে ফেললাম। ভাড়া ৪৮০ টাকা করে।
বাসে উঠে যে যার মতো সিটে বসে পড়লাম। আধেক জেগে আধেক ঘুমে যখন বারৈয়ারহাটে নামলাম, তখন রাত প্রায় ৪টা। সেখানে তিন রাস্তার মোড়ে একটা হোটেলে রুটি আর ডিমে ডিনার আর ব্রেকফাস্টের মাঝামাঝি একটা কিছু হলো। তারপর প্রায় মিনিট কুড়ি দাঁড়িয়ে একটা সংবাদপত্রবাহী মাইক্রোবাসের দেখা পেলাম। খাগড়াছড়ি যাবে। ভাড়া জনপ্রতি ২০০। তবে তিনজন মিলে ৫০০ টাকা দেব জানিয়ে উঠে পড়লাম। মাইক্রোবাসের একেবারে পেছনের সিটে পিঠ এলিয়ে দিয়ে ঠিক করলাম একটুও ঘুমাব না। চারপাশে শিশুতোষ পবিত্র আলো। ঢাকার জঞ্জালে ভারাক্রান্ত দু'চোখও চাইছিল না একটা দৃশ্যও যেন বাদ পড়ে। অচেনা পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকেই বিস্ময় আর ওপরে মেঘের গড়াগড়ি। দেখতে দেখতে খাগড়াছড়ি দেড় ঘণ্টায় চলে এলাম। থাকার জন্য ৫০০ টাকায় একটা ডাবল বেডের হোটেল ভাড়া করা হলো। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে। ততক্ষণে তিনজনেরই প্রচুর খিদে লেগেছে। মিল্টন জানাল, ওর পরিচিত একটি আদিবাসী হোটেল আছে। সেখানে আদিবাসীদের পছন্দের নানা খাবার সুলভে পাওয়া যায়। গুইসাপ, সাপ, শূকর, মদসহ আরও নানা পদ। (গুইসাপ খেয়েছিলাম, বাসায় জানে না!) পাশাপাশি বাংলা খাবারও আছে। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার শুরু হলো শহর ঘোরা। ঠিক করলাম পরদিন যাব আলুটিলা গুহায়।
পরদিন আমাদের সঙ্গে যোগ হলো স্থানীয় বন্ধু কামরুল ও বাবু। সবাই মিলে সকাল ১০টার দিকে আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহার উদ্দেশে রওনা করলাম। খাগড়াছড়ি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাস যায় তারেং পর্যন্ত। ভাড়া ১৫ টাকা। সব দেখার জন্য বাসের ছাদে বসলাম। কিছুক্ষণ পর বাস চলে এলো আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে। মূল সড়কের পাশেই এই পর্যটন কেন্দ্র। গুহায় ঢুকতে হলে ১০ টাকায় টিকিট কাটতে হয়। স্থানীয় ভাষায় রহস্যময় ওই গুহাকে বলা হয় 'মাকাই হাকর'। মানে দেবতার গুহা। আলো ছাড়া নাতিদীর্ঘ এই গুহা পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। টিকিট কাউন্টারের পাশ থেকে ৫টা মশাল ৫০ টাকায় কিনে নেওয়া হলো। শুক্রবার হওয়ায় পর্যটক সমাগমও ছিল অগণিত। ভেতরে ঢুকে মশালের আলোতে ছোটখাটো একটা গানের বিরতি নিলাম। আধা ঘণ্টা গান-বাজনার পর আবার হাঁটা। হিসাব করে দেখা গেল সম্পূর্ণ গুহা পার করতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট সময় লাগে।
পরদিন গেলাম রিচাং ঝর্ণায়। আবারও খাগড়াছড়ি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাসের ছাদে। ভাড়া পড়ল জনপ্রতি ১৫ টাকা। বাস যেখানে নামিয়ে দেয়, সেখান থেকে ঝর্ণা পর্যন্ত যেতে আধা ঘণ্টারও বেশি হাঁটতে হয়। হাঁটতে না চাইলে মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা আছে। ঠিক করলাম মূল রাস্তা দিয়ে সরাসরি না গিয়ে ভেতর দিয়ে যাব। ভেতরের পথে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম খুব নির্জন একটা গোসল করার জায়গা।
পাহাড়ের সবুজ শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি এখানে বিশ্রাম নেয়। তারপর আবার ঝর্ণার দিকে যায়। জায়গাটা আসলে গিরিপথের অংশ। এখানে কিছু সময় বসতে না বসতেই শুরু হলো অঝোর বৃষ্টি। আর দেরি না করে রিচাং ঝর্ণার খোঁজে পা বাড়ালাম। আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে লোমহর্ষক যাত্রাও এখান থেকে শুরু হলো। প্রবল বৃষ্টিতে অচেনা পিচ্ছিল পথে চলতে চলতে এমন ঢাল পেয়ে গেলাম, যেখানে মাত্র ৬ মিটার নামতে আমাদের প্রায় ৩০ মিনিট লেগেছিল। কারণ পা ফসকালেই মৃত্যু অথবা বড় ধরনের শারীরিক আঘাতের আশঙ্কা। শেষ পর্যন্ত কারও কোনো ক্ষতি ছাড়াই পেঁৗছে গেলাম রিচাং ঝর্ণায়।
খাগড়াছড়ি গিয়ে সাজেক ঘুরে না এলে খুবই বোকার মতো কাজ হতো। কিন্তু সাজেক যাওয়ার খরচ শুনেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে গরিব হয়ে গেলাম! চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করতেই নাকি পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন। তবুও রাখে আল্লাহ মারে কে! দরকার হলে ৭০ কিলোমিটার হেঁটেই যাব পণ নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে মাহেন্দ্রায় উঠলাম। উদ্দেশ্য_ দীঘিনালা। ভাড়া ৫০ টাকা। সেখানে নামার পর খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম রিজার্ভ না করেও যাওয়া যায়। তবে সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা পাওয়া নিশ্চিত নয়। ঝুঁকি নিলাম। দীঘিনালা থেকে চান্দের গাড়িতে রাঙামাটির বাঘাইহাট যেতে ২৫ টাকা লাগে। বাঘাইহাট থেকে সাজেকের জন্য আবারও চান্দের গাড়িতে উঠতে হয়। ভাড়া ১১০ টাকা। আর্মি চেকপোস্টে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বিকেল ৪টার মধ্যেই চলে এলাম মেঘের দেশে। ঢুকতেই প্রথমে রুইলুই পাড়া। তারপর মারিশ্যা। একদম শেষ পাড়ার নাম কংলাক। এখানে লুসাইদের বাস। সাজেকের সব সৌন্দর্য কংলাক পাড়াতেই হামাগুড়ি খায়। ওখানে রক প্যারাডাইস নামে একটা কটেজ ভাড়া করা হলো। ১৫০০ টাকায় চারজন। ৩৬০ ডিগ্রি দেখার জন্য রক প্যারাডাইস আদর্শ। ওপারে ভারতের লুসাই পাহাড় আর এপারে রাঙামাটির সাজেক পাহাড়। সবখানেই ছেলে-বুড়ো মেঘ-বৃষ্টি নামার তাল গুনছে। রাতটা মেঘের সাম্রাজ্যে কাটিয়ে সকালেই রওনা দিলাম খাগড়াছড়ি হয়ে ঢাকার উদ্দেশে।

ছবি : লেখক