গাজীর পট ও গাজীর গান, ভাটি অঞ্চলের মানুষের নীতিশিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। অতীতে আমাদের দেশে এই লোকসংস্কৃতির ব্যাপক প্রচলন থাকলেও গাজীর পট ও গাজীর গান এখন বিলুপ্তপ্রায়। এক সময় বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে পট বা চিত্র দেখিয়ে গাজীর গান গেয়ে বেড়াত বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা। তার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী অঞ্চলেই এমন বেদেদের বিচরণ ছিল বেশি। বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে গাজীর গান গেয়ে ধান অথবা টাকা নিত। এক সময় গাজীর গান হয়ে উঠল বাংলা লোকসংস্কৃতির অংশ।
গাজীর গান গাওয়ার সময় ছিল কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস। যে সময় কৃষকের উঠোনে ধান থাকে। অন্য সময় কখনোই বেদেদের গাজীর গান গাইতে দেখা যেত না। গাজীর পটের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রবাদ আছে 'অদিনে গাজীর পট'। সঠিক সময় ছাড়া বা অসময়ে কেউ কিছু করলে এই প্রবাদটি বলা হয়। পট হচ্ছে মূলত মারকিন কাপড়ে আঁকা একটি চিত্রকর্ম, যা প্রস্থে চার ফুট, দৈর্ঘ্যে সাত-আট ফুটের মতো। মাঝখানের বড় ছবিটি পীর গাজীর। তার দুই পাশে ভাই কালু ও মানিক। গাজী বসে আছে বাঘের ওপর। এই ছবিটি কেন্দ্র করে আরও আছে কিছু নীতি বিষয়ক ছবি বা চিত্র। মনোরম ক্যানভাসের এ পটটির বিভিন্ন অংশের ছবি লাঠি দিয়ে চিহ্নিত করে গীত গাওয়া হয়।
মুন্সীগঞ্জের সুধীর আচার্য ছিলেন একমাত্র পটুয়া। তার কাছ থেকে পট কিনে নিয়ে বেদেরা গ্রামে গ্রামে গান গাইত। এক সময় সুধীর আচার্য তার পেশা ছেড়ে দেন। আশির দশকে লোকশিল্পপ্রেমী তোফায়েল আহমেদ এই লোকশিল্পীকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। বর্তমানে সুধীরের ছেলে শম্ভু আচার্য গাজীর পটকে নিয়ে গেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। পৃথিবীর বড় বড় গ্যালারিতে তার পট সংরক্ষিত আছে। গাজীর পট এখন লোকশিল্প হিসেবে সামাদৃত। গাজীর পট বেঁচে গেলেও পট গায়ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না অনেক দিন ধরে।
মুন্সীগঞ্জের হাজারো বেদের মধ্যে একজনকে পেয়েছিলাম পট গাইতে পারে, কিন্তু তার কাছে পট নেই। পট ছাড়া পট গাওয়া, কিছুই বোঝা যায় না। নরসিংদীর দুই বেদে দুর্জন আলী ও কোনাই মিয়ার কথা শোনা যায় মাঝে মাঝে। তারা সর্বশেষ পটের গান গাইতেন। কিন্তু অনেকের মতে, এই দুই পট গায়ক মৃত্যুবরণ করেছেন এক যুগ আগে। ধরেই নিয়েছি বাংলার লোকসঙ্গীত পটের গান হারিয়েই গেছে বাংলা থেকে। এ বছরের শুরুতে সাংবাদিক আপেল মাহমুদ জানালেন পটের গায়ক দুর্জন আলী বেঁচে আছেন। নরসিংদীর হাজীপুরে একটি পটের গায়েন দল করেছেন তার ভাতিজাকে নিয়ে। শহরে গিয়ে দুর্জন আলীকে খুঁজে বের করতে তেমন কষ্ট হলো না।
আমাদের যাওয়ার খবর পেয়েই দুর্জন আলী তার দল নিয়ে তৈরি হলেন। ৯২ বছর বয়সী দুর্জন আলী এবং তার ভাই কোনাই মিয়ার ছেলে মূল গায়ক। বাকিরা ঢোল, বায়া ও করতাল বাজায়। তার গানের অন্তরাটা হলো, 'হরদমে গাজীর নাম লইয় পাষাণ মনরে, হরদমে গাজীর নাম লইয়।' এরপরই বয়ান করেন গাজীর মহত্ত্বের কথা, সেখানে তাজ মাথায় সোনার খড়ম পায়ে গাজীর পোশাকের বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি আছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি গাজীর আনুগত্য ও ভালোবাসার কথা। সব শেষে আসে নীতিকথা। 'রান্ধিয়া-বান্ধিয়া অন্ন পুরুষের আগে খায়/ভরানা কলসের পানি তিরাসে শুকায়/দুবদুবাইয়া হাঁটে নারী চোখ ঘোরাইয়া চায়/অলক্ষ্মীরে দিয়া ঘরে লক্ষ্মী লইয়া যায়।' পূর্বপুরুষদের মতো দুর্জন আলীও গাজীর পটের গান দুটি চরণ দিয়ে শেষ করেন। 'এই পর্যন্ত বইলা আমি ইতি দিয়া যাই/আল্লায় বাঁচাইলে আবার আরেক দিন গাই।' দুর্জন আলী সাত পুরুষের ২০০ বছরের এই গায়কী রীতি এখনও অটুট রেখেছেন। দর্শক দেখে দীর্ঘদিন পেঁচিয়ে রাখা একটি সাদা শার্ট পরে নেচে নেচে গাজীর গান শোনাতে শুরু করেন। দুর্জন আলী যে পট দেখিয়ে গান পরিবেশন করেন সেটি শম্ভু আচার্যের ১৯৯২ সালে আঁকা।
এই পট নিয়ে ১৯৯৯ সালে দুর্জন আলী পট গাইতে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সে বছর লন্ডনে বাংলাদেশ উৎসবের যৌথভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। টনি ব্লেয়ারের স্বাক্ষর করা একটি সনদপত্র বুকে নিয়ে গর্ব করলেন এই পট গায়ক। নিঃসন্তান দুর্জন আলীর মধ্যে বেদে স্বভাব নেই বললেই চলে। অনেক আগেই তারা স্থলে বসতি স্থাপন শুরু করেন। শত কষ্ট আর অভাবের মধ্যেও সাত-আট দশক ধরে আগলে রেখেছেন লোকসঙ্গীত গাজীর পটের গান। দুর্জন আলীর পর আর কেউ পটের গান নিয়ে মানুষের বাড়িতে হাজির হবেন কি-না জানেন না তিনি। তবে বাংলার লোকসংস্কৃতিতে গাজীর গান টিকে থাকবে সব সময়_ শেষ বেলায় এসে এমনটাই স্বপ্ন দেখেন দুর্জন আলী।

মন্তব্য করুন