মনের মাটিতে বৃষ্টি পড়ূক

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯      

সোহেল নওরোজ

আঁধারের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলা সময়ে আগ বাড়িয়ে চাওয়ার মতো তেমন কিছু থাকে না। কেবল এক চিলতে আলোর জন্য মনটা চাতক হয়ে ওঠে। এই যেমন একটা নির্বিঘ্ন দিন, সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসার নিশ্চয়তা, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার সংস্থান ছাড়া মানুষের চাওয়ার কিছুই যেন নেই এখন! মুঠোফোনে কোনো মন্দ খবর না শোনা, ফেসবুকে কোনো রক্তাক্ত শরীর দেখে চমকে না ওঠার প্রত্যাশা একটু বাড়াবাড়ি বৈকি! না চাইতে চাইতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে মনের শরীর। অলিন্দ-নিলয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে শুকিয়ে গেছে চাওয়া-পাওয়ার ফুলগুলো। কেউ চায় না কৃষ্ণচূড়া আরেকটু লাল হোক, পুকুরের পানিতে লাল-সাদা পদ্ম ফুটুক, গাছের মগডালে আয়েশে বসে কোকিল ডাকুক কিংবা রাস্তার মোড়ে বুড়ো চাচার হাতমেশিনে পিষে নিংড়ে আনা আখের রসটা আরেকটু মিষ্টি হোক...!

ক্যাসেটপ্লেয়ারে বাজতে থাকা সঞ্জীব চৌধুরীর গানটা শুনে আগের মতো এখন আর কোনো ভাবান্তর হয় না-'চলতে চলতে অনেকটা পথ চলে এলাম/বলতে বলতে অনেক কথাই বলে এলাম/আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও, প্রভু/আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও...'

ভেবে পাই না, কী আজব-অস্থির-অনিশ্চিত সময় পার করছি আমরা!

মুঠোফোনের নষ্ট হয়ে যাওয়া মেমোরি কার্ডের মতো মস্তিস্কের কোষগুলোও ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। যেন সে বলতে চাইছে আর পারছে না। এবার আমাকে নিস্তার দাও।

বুকের ভেতরটা জানা-অজানা শঙ্কায় হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে। কিছু ভালো স্মৃতি ছাড়া আমার তো আর কোনো সম্বল ছিল না। সেটুকু মুছে গেলে বলার মতো আর কিছুই যে অবশিষ্ট থাকবে না- তখন কী হবে?

'কী হবে'- প্রশ্নটাই যে হাস্যকর! বেঁচে থাকার জন্য পুরনো স্মৃতি জমিয়ে রাখা খুব জরুরি নাকি! তাই বলছি কেন? আমার বেঁচে থাকাটাই তো শত-সহস্র অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে। কী হচ্ছে- তাই বুঝতে না বুঝতেই ঘটনার ওপর চাপা পড়ছে ঘটনা। মানুষ কখনও পাথরের মূর্তি, কখনও রান্না শেষে চুলায় জমা হওয়া ছাই। তবু আমি বেঁচে আছি এটাই শেষ কথা। আমাদের নিয়ে ভাবার সময় কই, আমিকে নিয়ে ভাবতেই তো রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়!

কেন জানি কোনো কষ্টই এখন আর স্থায়ী হতে চায় না। কী হয়েছে আমার? আমি কি সত্যিই মানুষ আছি? কেবল নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের আদান-প্রদানই কি বেঁচে থাকার একমাত্র স্মারক? দাঁত কেলিয়ে কত সহজে বলে দিই- হ্যাঁ, তাই তো, দেখছেন না, দিব্যি আছি! এই যে দেখছ না আমার চোখ, হাত, পা, নাক, কান...।

আসলে আমরা বোধহয় আর মানুষ নেই। বাইরে মানুষের আকৃতিটাই আছে শুধু। ভেতরটা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। সাফা-মারওয়ার মতো সেখানে কেবল বালি আর বালি, এক ফোঁটা পানিও নেই। আমাদের আঘাতে নতুন কোনো জমজম তৈরি না হোক, এটুকু প্রার্থনা তো করতে পারি- মনের মাটিতে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ূক, নির্ভেজাল বৃষ্টি।