নতুন আশা আবাসনে

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মিরাজ শামস

সার্বিক জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সব কিছুই গত এক বছর ধরে করোনাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। অন্য সব খাতের মতো আবাসনও বাদ যায়নি মহামারির প্রকোপ থেকে। আশার কথা হলো সংকট কাটিয়ে আবাসন খাতে নতুন করে যাত্রা শুরু হয়েছে। আগে থেকেই মন্দা ও বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা এ খাতে এখন সুদিন ফিরছে। মূলত ২০১২ সাল থেকে সংকটের মধ্যে সময় পার করছে এ খাত। তিন থেকে চার বছর অনেকটা মন্দার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার আগেই করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে পুরো খাতটি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় সর্বশেষ তিন মাসে কেনাবেচা অনেক বেড়েছে। অনেকের মতে তা আবার আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

করোনার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় বেচাকেনা ফিরে আসার তথ্যও মিলছে জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধনের পরিসংখ্যানে। এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, করোনার কারণে সামান্য হলেও সুবিধা পেয়েছে আবাসন খাত। অনেকে এখন নিরাপদ আবাসনের দিকে নজর দিচ্ছেন। এতে ফ্ল্যাটের চাহিদা বেড়েছে। এখন ভালো কোম্পানিগুলোর প্রকল্প পরিদর্শনে ছুটির দিনে লাইন দিচ্ছেন ক্রেতারা। যদিও এই সময়ে নির্মাণাধীন ও নির্মাণ করা ফ্ল্যাটও তুলনামূলক কম ছিল। এ কারণে বেচাকেনা দ্রুত হচ্ছে। ক্রেতাদের পছন্দ হলেই বুকিং দিয়ে কিনে নিচ্ছেন বলে তারা জানান। অন্যদিকে করোনার আগে যারা বিদেশে সেকেন্ড হোম করার পরিকল্পনায় ছিলেন, তাদের অনেকে দেশে ফ্ল্যাট কেনায় নজর দিয়েছেন। আবার প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফ্ল্যাট ও প্লট কিনছেন।

শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানি গত বছর করোনার সংক্রমণের আগে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। এপ্রিলে বিক্রি প্রায় বন্ধ ছিল। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতি মাসে বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। এরপর থেকে মূলত বাড়তে থাকে বেচাকেনা। অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মাসে গড়ে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা।

খাত-সংশ্নিষ্টরা যা বলছেন :আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (এসইএল) ব্যবস্থাপন পরিচালক আবদুল আউয়াল সমকালকে বলেন, করোনার সংকট বড় কোম্পানিগুলো কাটিয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে ক্রেতাদের চাহিদা থাকলেও কোম্পানিগুলোর হাতে এখন রেডি কিছু নেই। নতুন প্রকল্প অনুমোদনেও দেরি হচ্ছে। কিছু প্রকল্পের আলোচনা মাঝ পথে আটকে আছে। জমি মালিকদের কাছে আগের মতো যাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে নতুন প্রকল্প হচ্ছে কম। অথচ ক্রেতার চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার কমায় এবং রেমিট্যান্স বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আবাসন খাতে। অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কারণেও বিনিয়োগ বাড়ছে। এখন হাতে প্রকল্প থাকলে বিক্রি আরও বাড়ানো সম্ভব হতো।

রিহ্যাবের সহসভাপতি কামাল মাহমুদও অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসনে বিনিয়োগের ইতিবাচক প্রভাবের কথা জানান। তিনি বলেন, এতদিন অপ্রদর্শিত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম হয়েছে। এখন দেশের রেডি ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ হচ্ছে, বিশেষ করে উচ্চ মূল্যের ফ্ল্যাটে। আরও দুই বছর এ সুবিধা থাকলে আবাসন খাত এগিয়ে যাবে। তিনি নতুন করে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করার দাবি জানান।

শেলটেকের চিফ অপারেটিং অফিসার শরীফ হোসেন ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, পর্যায়ক্রমে আগের অবস্থায় ফিরেছে বিক্রি। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার কমায় বিশেষ সুবিধা হয়েছে। যদি ১০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হয় এর মধ্যে ৮ জন ঋণ নিয়ে কিনছেন। আগে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়েছে এখন ৯ শতাংশে সব ঋণ পাচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন ঋণে ভালো সাড়া মিলেছে। নিবন্ধন ব্যয় আগের চেয়ে কমেছে। তবে তা আরও কমানো প্রয়োজন। অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ কাজে এসেছে। করোনার কারণে মানুষ এখন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। এ কারণেও বিক্রি বাড়ছে। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে গত ৮ বছর সংকটে ছিল। এতে উদ্যোক্তারা প্রকল্প কম নিয়েছেন। এখন নতুন প্রকল্প বাড়ছে।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মো. ফরহাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, ফ্ল্যাট ও প্লটের বেচাকেনা আস্তে আস্তে চাঙ্গা হচ্ছে। বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় আশার সঞ্চার হয়েছে বেশি। এখন উৎসাহ নিয়ে অনেকে ফ্ল্যাট কিনছেন। তাছাড়া করোনার পরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আবাসনকে বেছে নিচ্ছেন অনেকে। সুদহার কমে আমানত ৬ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় অনেকে এফডিআর না করে প্লট ও ফ্ল্যাট কিনছেন। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ হওয়ার ইতিবাচক ফলও মিলছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আবাসনে বিনিয়োগে ফিরেছেন ক্রেতারা। তিনি জানান, মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে জুন পর্যন্ত বিক্রি প্রায় বন্ধ ছিল। এরপর নভেম্বর থেকে বেশ ভালো হয়েছে। তবে এখন নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়ায় ডেভেলপার কোম্পানিগুলো চাপে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর ফ্ল্যাটের দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ে। এবার করোনার কারণে দাম বাড়েনি। তবে চাহিদার তুলনায় আবাসন প্রকল্পের সংখ্যা কমতে থাকায় ৫ শতাংশের মতো দাম বেড়েছে।

চাঙ্গা হওয়ার নেপথ্যে :উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘ সময় সংকটে ছিল আবাসন খাত। ফ্ল্যাটের দাম কমিয়েও ক্রেতা খুঁজে পায়নি অনেক প্রতিষ্ঠান। কিস্তি দিতে না পারায় অনেক ফ্ল্যাটের ক্রেতা বুকিং বাতিলও করেছেন। সেই অস্থির সময় পার করে ২০১৬ সালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতে শুরু করে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। আবার গত বছর নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। ফলে করোনার আগ পর্যন্ত আবাসন ব্যবসা ইতিবাচক ধারায় ছিল।

বিক্রি বাড়ার তথ্য সরকারি হিসাবেও :নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জমি ও ফ্ল্যাট বেচাকেনার জন্য ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ২৬৭টি দলিল হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শুরুর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে ৩ লাখ ৪ হাজার ৩৬২টি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫১টি ও মার্চে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৬টি দলিল হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি অবনতির কারণে সারাদেশ লকডাউনে থাকায় এপ্রিলে জমি বা ফ্ল্যাট বেচাকেনা হয়নি। মে মাসে মাত্র ১ হাজার ২৮৪টি দলিল হয়েছে। এর পরে বিক্রি বাড়তে শুরু করে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে ২ লাখ ৫০ হাজার ৪১০টি, জুলাইতে ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৫৭টি ও আগস্টে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭৮০টি দলিল হয়। এ তিন মাসে বেচাকেনা করোনা-পূর্ববর্তী আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এরপর বিক্রি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ৩ লাখ ৬২ হাজার ২৩৫টি, অক্টোবরে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৪টি ও নভেম্বরে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫১০টি দলিল হয়। ডিসেম্বরে আরও এক লাখ বেড়ে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৪২৮টি দলিল হয়েছে। দলিল করার এ পরিসংখ্যানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জমি, আবাসন কোম্পানির প্লট ও ফ্ল্যাটসহ সব ধরনের জমি ও অবকাঠামো বিক্রির দলিলের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।