চন্দনাইশের কুঁচে যাচ্ছে চীনে

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৪      

নোমান আবদুল্লাহ / শহীদ উদ্দীন চৌধুরী

দেখতে সাপের মতো, কিন্তু সাপ নয়। আসলে এটি মাছ। নাম কুঁচে। ইংরেজি নাম ইল ফিশ। সাপের মতো দেখতে এ মাছের কদর নেই এ দেশে। তবে খালে-বিলে বেশি থাকায় আমাদের দেশে এটি পাওয়া যায় বেশি। তাই এটি এখন রফতানি হচ্ছে সুদূর চীনে। আর চীনে রফতানি করা এ কুঁচের সিংহভাগই যাচ্ছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা থেকে। স্থানীয় বাজারের আড়াইশ' টাকার কুঁচে ঢাকা থেকে বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায়!
ঢাকার অন্যতম কুঁচে রফতানিকারক উইং কমান্ডার (অব.) শফিকুল আলম বলেন, 'আমাদের দেশে অপ্রচলিত হলেও চীনে কুঁচের চাহিদা প্রচুর। আর চীনে চন্দনাইশের কুঁচের আলাদা কদর রয়েছে। প্রতি কেজি কুঁচে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়।'
সরেজমিন দেখা যায়, চন্দনাইশ পৌর সদর এলাকার জোয়ারায় হারালা বিলে গ্রামের শতাধিক শিকারি প্রতিদিন কুঁচে ধরেন। শিকারিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিদিনই তারা পেতে রাখেন কয়েকশ' ফাঁদ। কেঁচো দিয়ে ডোবার পানিতে পাতা হয় এসব ফাঁদ। কেঁচো খেতে ঢুকলেই ফাঁদে আটকা পড়ে কুঁচে। পরে ফাঁদ তুলে নিয়ে সংগ্রহ করা হয় কুঁচে। বড় ড্রামে পানি দিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষিত কুঁচে প্রতি সপ্তাহেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায় আড়তদারদের কাছে। প্রতিদিন গড়ে দুইশ' মণ কুঁচে চন্দনাইশে ধরা পড়ে বলে জানান শিকারিরা। আর প্রতি কেজি কুঁচের মূল্য আড়াই থেকে তিনশ' টাকা। লাভ বেশি হওয়ায় স্থানীয় এলাকাবাসীও ঝুঁকছেন কুঁচে শিকারে। তাই মাত্র এক বছর আগে দশ-বারজন কুঁচে শিকারি থাকলেও এখন শিকারি সংখ্যা শ'য়ের ওপরে। স্থানীয় কুঁচে শিকারি বুদ্ধিশ্বর বলেন, 'প্রতিদিন গড়ে জনপ্রতি আট কেজি কুঁচে পাওয়া যায়। আর প্রতি কেজি আড়াইশঁ থেকে তিনশ' টাকায় বিক্রি করা যায়। ক্রমেই লাভজনক পেশা হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষই এখন এ পেশায় ঝুঁকছেন।' আরেক শিকারি বল্লভ বলেন, 'আর কোনো পেশায় দৈনিক দুই হাজার টাকা আয়ের সুযোগ নেই। তাই এ পেশাই বেছে নিয়েছি।'
কুঁচে কী
আমাদের দেশে কুঁচে একটি অপ্রচলিত জলজ প্রাণী। পুকুর, খালবিল, ডোবায় এটি পাওয়া যায়। তবে আমাদের দেশে এটিকে সাপ হিসেবে অনেকেই ভুল করেন। তাই অধিকাংশ সময় ধরা পড়ার পরই সেটি মেরে ফেলা হয়। কিন্তু চীনসহ বিভিন্ন দেশে এটির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম গাজী আসমত বলেন, ' কুঁচে একটি প্রোটিনযুক্ত মৎস্য গোত্রের প্রাণী। এটি একটি হালাল খাদ্য। মানুষের মাঝে ভুল ধারণা থাকায় এটি ধরার পর মেরে ফেলা হয়।' দেশে এটির বাণিজ্যিক চাষ করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চন্দনাইশের কুঁচে যাচ্ছে চীনে
আমাদের দেশে অপ্রচলিত হলেও চীনে যাচ্ছে চন্দনাইশের কুঁচে। প্রতি কেজি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে চন্দনাইশের আড়াইশ' টাকার কুঁচে। বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক (মান নিয়ন্ত্রণ) মোহাম্মদ ছালেহ আহমদ বলেন, 'চন্দনাইশের কুঁচের আলাদা কদর রয়েছে চীনে। এখানকার ৯০ শতাংশ কুঁচেই রফতানি হয় চীনে। পাশাপাশি তাইওয়ানে এর চাহিদা রয়েছে।' কুঁচের ইতিবাচক বিষয়গুলো প্রচার করা গেলে আরও অনেক দেশে এটি বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
আড়াইশ' টাকার কুঁচে আড়াই হাজার টাকা!
কুঁচে শিকারিরা সাধারণত কুঁচে ধরে তা বিক্রি করে দেন স্থানীয় বাজারে। কেজিপ্রতি আড়াইশ' থেকে তিনশ' টাকা দরে বিক্রি হয় এ কুঁচে। পরে স্থানীয় পাইকাররা এগুলো পাঠিয়ে দেন ঢাকায় আড়তদারদের কাছে। সেখান থেকে রফতানিকারকরা কেজিপ্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন চন্দনাইশের এ কুঁচে। ঢাকার উত্তরায় কুঁচের আড়তদার আনোয়ার ব্রোকার হাউসের মালিক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, 'স্থানীয় শিকারিদের কাছ থেকে আড়াইশ' থেকে তিনশ' টাকা দিয়ে আমরা কুঁচে সংগ্রহ করে থাকি। পরে তা কিছু বেশি দামে রফতানিকারকদের কাছে বিক্রি করে দিই। রফতানিকারকরা তা উচ্চমূল্যে চীন-তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে দেন।' ঢাকার কুঁচের অন্যতম রফতানিকারক উইং কমান্ডার (অব.) শফিকুল আলম বলেন, 'আমাদের দেশে অপ্রচলিত হলেও চীনে কুঁচের চাহিদা প্রচুর। সেখানে প্রতি কেজি কুঁচে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় রফতানি করা হয়।'
কদর বাড়ছে চন্দনাইশের কুঁচের
ক্রমেই বিদেশে জনপ্রিয় হচ্ছে চন্দনাইশের কুঁচের। দেশের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, সিলেটে কুঁচে পাওয়া গেলেও চন্দনাইশের কুঁচের রয়েছে আলাদা কদর। তাই অন্যান্য এলাকার কুঁচে কেজিপ্রতি দেড় থেকে দুইশ' টাকায় বিক্রি হলেও চন্দনাইশের কুঁচে বিক্রি হয় আড়াই থেকে তিনশ' টাকায়। ঢাকার আড়তদার প্রদীপ বলেন, 'অন্যান্য এলাকার চেয়ে বাইরে চন্দনাইশের কুঁচের কদর বেশি। তাই দাম বেশি হলেও এটিকেই তারা পছন্দ করেন।' হ