ফটোগ্রাফিতে নোবেল খ্যাত 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড।' চলতি বছর শতাধিক দেশ থেকে পাঁচ হাজারের মতো আলোকচিত্রীর লক্ষাধিক এন্ট্রি জমা পড়েছে এই প্রতিযোগিতায়। এ বছর সপ্তমবারের মতো ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড জয় করল বাংলাদেশ। এবারই প্রথম একসঙ্গে দু'জন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। বিষয় রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। একজন তাসলিমা আখতার, অন্যজন রাহুল তালুকদার। তাদের এই প্রাপ্তি জানান দেয়, বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি এগিয়েছে অনেক দূর। আন্তর্জাতিক আসরে এই দুই তরুণ আলোকচিত্রীর অর্জন নিয়ে আমাদের আজকের প্রচ্ছদ। জানাচ্ছেন মোহম্মদ আসাদ


তাসলিমা আখতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সদস্য থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেন তিনি। স্নাতক শেষ করে এক সময় অস্থির হয়ে পড়েন। আবদ্ধ হন বিবাহবন্ধনে। তাসলিমার পছন্দের বিষয় ছিল ফটোগ্রাফি। স্বামীও চাচ্ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক কোথাও থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক স্ত্রী। ২০০৭-০৮ সালের সেই অস্থির সময়গুলোতে প্রথম পাঠশালায় ভর্তি হয়ে বেসিক কোর্স সম্পন্ন করেন তাসলিমা। তারপর মাস্টার্স সম্পন্ন করেন সফলতার সঙ্গে। একই সঙ্গে গড়ে তোলেন গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি নামে একটি সংগঠন। তাসলিমা এই সংগঠনের সমন্বয়ক। যার ফলে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেছেন অনেক। এই শ্রমিকদের আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়াগুলো ফ্রেমবন্দি করেছেন সফলতার সঙ্গে। প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডের মতো প্রেস্টিজিয়াস পুরস্কারও আনেন গার্মেন্ট ট্র্যাজেডির ছবি দিয়ে। তাসলিমার পুরস্কার পাওয়া এই ছবিটি সবারই চেনা। স্বামী-স্ত্রীর একই সঙ্গে মৃত্যু। রোমান্টিক ট্র্যাজেডি। নিথর দেহ দুটি জানান দেয় গার্মেন্ট শ্রমিকদের অগাধ ভালোবাসার কথা। ছবিটি ছাপা হয়েছে এ দেশের বড় বড় পত্রিকায়। স্থান করে নিয়েছে দেশের বাইরে পৃথিবীর বড় বড় পত্রিকায়। টাইমসের ২০১৩ সালের বর্ষসেরা ছবি হিসেবে স্থান পাচ্ছে তাদের ওয়েবসাইটে। ছবিটি তোলার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তাসলিমা আখতার বলেন, 'রানা প্লাজা ধসের খবর পেয়ে সকালেই সেখানে গিয়ে পেঁৗছাই। আমি যেহেতু গার্মেন্ট শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তাই দিনভরই ছেলেমেয়েদের নিয়ে উদ্ধার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কখনও কখনও দূর থেকে দু-একটা ক্লিক করেছি, কাছে গিয়ে ছবি তোলার মানসিক শক্তি ছিল না। উদ্ধার কাজ করলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতে পেছন দিয়ে ভেতরে যাই। এর মধ্যে আমার এক বন্ধু কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলো। একটি মেয়ে বাঁচাতে বলেছে কিন্তু ওকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পেছন দিক দিয়ে তিন কি চার তলায় উঠতেই স্থানীয় লোকজন জানাল, এখানে অনেক লাশ পড়ে আছে। এগিয়ে দেখি একটি গর্তের মতো জায়গায় অনেক মৃতদেহ। তার মধ্যে এই দম্পতির লাশ ছিল। আমার দেখে খুব খারাপ লাগছিল। এখানে আমি চার থেকে পাঁচটি ক্লিক করতে পেরেছি। এই ছবি তোলার পর দু'দিন ফেসবুকে বসিনি, কোনো পোস্ট দিইনি।' এই ছবিটি এখন রানা প্লাজার ভয়াবহ ঘটনার আদর্শ চিত্র। একটিমাত্র ছবি নির্মম এই ট্র্যাজেডির ইতিহাস বর্ণনা করে। এমন একটি ছবি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড পাবে, এমনটি অনেক ফটোবোদ্ধা আগেই ধারণা করেছিলেন।'
এই পুরস্কার পেয়ে আনন্দিত তাসলিমা। আনন্দিত এ দেশের আলোকচিত্রীরাও। তিনি আরও জানালেন, 'আমি নিজেই গার্মেন্ট শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি। তাদের যন্ত্রণাটা আমি অনুভব করতে পারি। আমার ছবিটি যন্ত্রণার ছবি। পুরস্কার পাওয়ার পর বড় ক্যানভাসে পৃথিবীজুড়ে সবার নজরে আসবে। এই ছবি দেখে শ্রমিকদের জীবনে যদি সামান্য উন্নতি হয় সেখানেই আমার সফলতা।'
রাহুল তালুকদার একজন তরুণ আলোকচিত্রী। পাঠশালায় দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাত্র। এরই মধ্যে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আলোকচিত্র বোদ্ধাদের। ২০১২ সালে পেয়েছেন সেলিব্রিটিং লাইফের প্রথম পুরস্কার। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি নিয়ে কাজ সম্পর্কে রাহুল বলেন, 'প্রথম দিনের প্রথম প্রহরেই আমি সেখানে চলে যাই ছবি তোলার জন্য। দিনভর ছবি তুলেছি। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে ছবি তুলেছি। সেখান থেকেই আমি এই স্টোরি তৈরি করেছি।' ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডের স্টোরি ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ১২টি ছবি দেওয়া যায়। রাহুল জমা দিয়েছেন ১১টি ছবি। প্রথম ছবিটি উঁচু ভবন থেকে তোলা রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষের। উদ্ধার কাজ চলছে, তার পাশেই হাজারো মানুষ দেখছে। তারপরের ছবিতেই রাহুল ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির কাছে নিয়ে যান। উদ্ধার কর্মীরা টেনে বের করে আনছেন এক গার্মেন্ট কর্মীকে। কান্নায় ভেঙে পড়ছেন নিহত শ্রমিকের নিকটজনরা। আহত দু'জন শুয়ে আছেন হাসপাতালে। স্কুল মাঠে একজনের লাশ খুঁজে ফেরা, তার পাশের দেয়ালে 'হোয়াই গড, হোয়াই!' লেখাটি ছবিটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লাশের অপেক্ষায় কফিনগুলো। সব শেষে আবার ধ্বংসাবশেষের ওপর একজন দাঁড়িয়ে। ১১টি ছবি দিয়ে সুন্দরভাবে বিশাল এই ট্র্যাজেডির বর্ণনা দিয়েছেন রাহুল। এখানে নেই কোনো পুনরাবৃত্তি। এমন স্টোরিতে পুরস্কার তার প্রাপ্যই বলা চলে। রাহুল আরও জানালেন, 'এই পুরস্কার আমার কাজকে আরও উৎসাহ জোগাবে। এই পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে পাঠশালা এবং আমার শিক্ষকদের অবদানও কম নয়। আমার পড়াশোনা শেষ হয়নি। এখনও নিয়মিত ক্লাসওয়ার্ক করতে হয়। তারপরও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে যারা বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে কাজ শুরু করব।'

মন্তব্য করুন