সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০১৪      

হায়াৎ মামুদ

একটি মানবগোষ্ঠী তার উদ্ভবকাল থেকে যতদিন পর্যন্ত সে টিকে থাকছে ততদিন যাপিত গোষ্ঠীজীবনে অসংখ্য বস্তু-উপাদান ও মনন-কল্পনাজাত ভাব-উপাদানের সম্মিলনে নিজের সংস্কৃতি নির্মাণ করে তোলে। জীবন যেহেতু তৈরি হয় স্থান, কাল ও পাত্রের চালচিত্রে, তাই জীবন এক জায়গায় থেমে থাকে না, সমাজের মানুষ জ্ঞাতসারে কি অজ্ঞাতে পাল্টাতে-পাল্টাতেই এগিয়ে যায়। কালস্রোতে মানুষের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক আচরণ ও অভ্যাসে ভিন্নতা আসে, শিল্পের সাধনায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়, মোড়বদল ঘটে। খাদ্যের অভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাস্তুনির্মাণ, ভাষা, ধর্ম, সামাজিক সংস্কার, এমনকি কুসংস্কারও এবং মনের গড়ন ও কল্পনার ধাঁচ_ সবই একটি জাতির সাংস্কৃতিক উপাদান। জীবনকে বাদ দিয়ে তাই সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। জীবন পাল্টে যেতে থাকলে সে-কারণে সংস্কৃতির রূপও অন্য রকম হতে থাকে। আর জীবন পাল্টায় ঘটনার অভিঘাতে। ব্যক্তি মানুষের জীবন ও গোষ্ঠীজীবন উভয়ই।
যদি কেউ ভেবে থাকেন, সংস্কৃতির রূপ অপরিবর্তনীয় তিনি যেমন কট্টরপন্থি ছুৎমার্গের পরিচয় দেবেন, তেমনি সংস্কৃতির নিত্য পরিবর্তনশীলতাকে চূড়ান্ত বলে যিনি মানবেন, তার চিন্তায় উন্মার্গতা ও আতিশয্য প্রাবল্য পাবেই। সত্য, মনে হয়, দাঁড়িয়ে আছে এ-দুয়ের মাঝখানে। সংস্কৃতিরূপের পরিবর্তন না-মেনে উপায় নেই, কারণ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে তাতে পরিবর্তন ধীর ও সূক্ষ্ম লয়ে ঘটতেই থাকে; যেসব কারণে ঘটে তার মধ্যে মুখ্য হলো জীবনযাত্রার চলিষ্ণুতাজনিত পার্থক্য। যুগ থেকে যুগে কিংবা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জীবনযাপনে তফাৎ আসে অর্থনৈতিক কারণে অর্থাৎ অর্থনীতিসঞ্জাত কর্মপ্রণোদনার ব্যাপ্তিতে বা সংকোচনে। গ্রামের ভেতরে শহরের অনুপ্রবেশ, এমনকি একে যদি 'শহুরে আগ্রাসনও বলি, ঘটে তো গেছেই। ইচ্ছা করে পরিকল্পনামাফিক কেউ ঘটায়নি, অবশ্যম্ভাবী বলেই তা ঘটেছে। গ্রামীণ বাংলায় পেশার রূপান্তর নিয়ে জরিপ নিলে গ্রামাঞ্চলে বৃত্তিবিন্যাসের পরিবর্তন তীব্রভাবে চোখে পড়বে এবং কারণ শনাক্ত করতে গেলে দেখা যাবে পারিবারিক বৃত্তি ত্যাগ করে নতুন বৃত্তি গ্রহণের পেছনে অর্থনৈতিক নিয়মই নিয়ন্ত্রক শক্তি। কাঠের আগুনে মাটির হাঁড়িতে রান্নার স্বাদ বেশি, জ্বাল-দেওয়া দুধ তো আসলেই অমৃতস্বাদী_ এমন খেদ মনের মধ্যে যেমনই পোষণ করি তাতে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল-থালা-বাসনের অনুপ্রবেশ রোধ করা কারও পক্ষেই সম্ভব হয় না। এর পশ্চাৎবর্তী কারণ জিহ্বার স্বাদ পরিবর্তন নয়, আর্থিক সঙ্গতির হিসাব-নিকাশেঅধিকতর সাশ্রয়গুণ। পুরুষের পোশাকে সুতিবস্ত্রের জায়গা সিনথেটিক কাপড় যে দখল করে নিল, তার কারণও ব্যয়সংকোচ। এমনি হাজারটা প্রাত্যহিক জীবনের খুুঁটিনাটিতে ধরা পড়বে গ্রাম বা শহরের মানুষ ৫০ বছর আগে যেমন ছিল এখন তেমন আর নয়। কোনো মৃতের আত্মা যদি তার স্বগ্রাম পরিভ্রমণে হঠাৎ এসে হাজির হয় তাহলে সে তার আত্মীয়-স্বজনের হাবভাব, চালচলন, পোশাক-আশাক অনেক কিছুই চিনে উঠতে পারবে না। সারকথা, নানাবিধ অনিবার্য কার্যকারণে মানুষের জীবনযাপন পাল্টাতে থাকলে তাদের মনোজগৎ পাল্টে যেতে থাকে এবং মনোজগৎ পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের সংস্কৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু ওই পরিবর্তন কোথায়, কতখানি এবং কেন? এই প্রশ্নাবলি সমাজের ভাবুক ও ধীমান মানুষকে বিবেচনা করতেই হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব তাদের ওপর এসে পড়ার কারণ সমাজের যৌথচৈতন্যের বা কালেক্টিভ সেনসিটিভিটির মাপজোখ করে সমাজকে উৎসাহদান বা বিপদসংকেত জানানোর ঔচিত্যবুদ্ধি ও প্রাজ্ঞতা তারা অর্জন করেছেন বলে সাধারণ মানুষ বিবেচনা করে।
দুই. কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ার কারণে উৎসব-পালা-পার্বণের সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাঙালির সমাজও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয় এবং ব্যতিক্রম ছিলও না। এমন একটি সময়ের কথা ভাবা যাক যখন এই জনগোষ্ঠী আচরিত ধর্মের (যেমন হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ইত্যাদি) আনুগত্যে প্রবলভাবে বাঁধা পড়েনি। তখন কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যাবতীয় লৌকিক উৎসবগুলো স্বতঃসারিত হয়েছিল। ধর্ম সেকালেও জীবনকে 'ধারণ' করত বটে, কিন্তু সে ধর্মের বাহ্যিক রূপ ছিল লোক-সংস্কৃতিপ্রসূত, লৌকিক। অর্থাৎ বাতাবরণে ধর্ম থাকত, যদিও কর্মকা ের অভ্যন্তরীণ কার্যকারণ ছিল সামাজিক প্রয়োজননির্ভর, সমাজবিজ্ঞানের কা জ্ঞানপ্রসূত। কৃষিভিত্তিক সমাজের লোকজ ধর্মের পাশে মরু অঞ্চলের ধর্ম ইসলাম এসে যখন স্থান করে নিল তখন আচরিত পালা-পার্বণের মধ্যে ব্যবধান, বৈপরীত্য, সংঘাত ইত্যাদি দেখা দিতে শুরু করে। সময়ের প্রবাহে সেখানেও সঙ্গতিসূত্র স্থাপিত হয়, নানা ধর্মসম্প্রদায়ের ভেতরে জীবনের প্রয়োজনে সহাবস্থান অনিবার্য হয়ে দেখা দেয় এবং ধর্মাচারগত ব্যবধান সত্ত্বেও সহমর্মিতা অব্যাহত থাকে। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, বহিরাগত ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর সব সামাজিক উৎসবই ধর্মকেন্দ্রিক, ইসলাম-সমর্থিত ধর্মীয় উৎসব; সেখানে ঐতিহ্য অনুসারী লৌকিক উৎসবের কোনো স্থান ছিল না, থাকার কথাও নয়। তবে যা স্বাভাবিক তা তো ঘটতে বাধ্য। মুসলমান সমাজের ধর্মভিত্তিক উৎসবও ক্রমে স্থানীয় লোকাচারের অর্থাৎ প্রাগৈতিহাসিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা থেকে উদ্ভূত অজস্র উপাদান সাঙ্গীকরণ করে নেয়। জনসাধারণের মনোজগতেও সহিষ্ণুতা স্থায়ী আসন গাড়ে, নিজেদের অজ্ঞাতেই ধর্মনিরপেক্ষ অনুভবশক্তির উদ্ভব ঘটে। নানা ধর্মসম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবও পারস্পরিক লেনদেনে-অংশগ্রহণে সর্বজনীনতার রূপ নেয়। এতকিছুর পরও যা লক্ষণীয় তা হলো_ বাঙালির নববর্ষ-উৎসবের ইতিহাস প্রাচীন নয়। চৈত্রসংক্রান্তির যে লৌকিক উৎসব চালু ছিল তা-ই গড়িয়ে চলে যেত পহেলা বৈশাখ অবধি। তাতে মুসলিম সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না, সে ছিল দর্শক ও উপভোক্তার দলে। বাঙালি জনগোষ্ঠীর উৎসবাবলির এই ধর্মকেন্দ্রিকতা, যতদূর মনে হয়, সচেতনভাবে প্রথম লক্ষ করেন রবীন্দ্রনাথ। তার প্রজ্ঞা ও বোধশক্তিতে প্রথম ধরা পড়ে বহুধর্মী জনগোষ্ঠীতে ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব চালু না করতে পারলে বিভিন্ন সম্প্রদায় আত্তিকভাবে যুক্ত হতে পারবে না। ততদিনে ভারতবর্ষীয় রাজনীতিতে একটি উপাদান হিসেবে ধর্মকে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে এবং ধর্মী ভেদনীতিতে রাজনৈতিক বিভাজন ও হিন্দু-মুসলিম বিরোধের বীজ রোপিত হয়েছে_ এসবও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি নিশ্চয়ই খুলে দিয়েছিল। কবি শান্তিনিকেতেন ও শ্রীনিকেতনে যেসব উৎসব প্রচলন করেছিলেন তার গভীরে ধর্মসম্প্রদায়গত ঐক্যবন্ধনের দর্শন কাজ করেছিল নিশ্চয়ই, নইলে বসন্ত উৎসব, হলকর্ষণ উৎসব ইত্যাদি সেক্যুলার সম্মিলনীগুলো উদ্ভাবনের কোনো কারণ তার ছিল না। বহুধর্মীয় সমাজে একমাত্র ধর্মভিত্তিক উৎসব কোনো ঐক্যসূত্র প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না, তিনি জানতেন। বাংলাদেশের অপরিসীম সৌভাগ্য যে, পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন দেশব্যাপী সর্বজনীন উৎসবের রূপ গ্রহণ করেছে। অন্তত বাংলা ভাষাভাষী এই ভূখ ে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসেবে বাংলা নববর্ষকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। পহেলা বৈশাখের আনন্দসম্মিলন সর্বাংশে স্বতঃউৎসারিত এবং বাঙালি সংস্কৃতির সর্বাত্মক পরিচয় হিসেবে এই দিনটির যাবতীয় কর্মপ্রণোদনাকে আমরা দেখতে চাইছি। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবৎ লক্ষ করা যাচ্ছে, এ দিবসের উৎসবশরীরে অন্তত ঢাকা শহরে কিছু মালিন্য লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রমনার মাঠে নববর্ষের প্রভাতে যেসব দৃশ্য ইদানীং চোখে পড়ছে তার মধ্যে রুচিবৈকল্য এত নগ্ন ও নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত যে প্রতিবাদজ্ঞাপন যে কোনো রুচিমান নাগরিকের অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নব্য ধনিকশ্রেণীর পাশ্চাত্যপ্রেমী তরুণরা এমন ধৃষ্টতার সাহস কোথা থেকে পায় যার বলে তারা সানকিতে পান্তা ভাত নিয়ে প্রাতঃরাশ ভক্ষণের মহড়া দিতে পারে? এরা কি জানে না, এই গরিব দেশটির নিরন্ন অর্ধহারী-অনাহারী কৃষকদের অপমান করা হচ্ছে এতে? বাঙালি সংস্কৃতির ভেতরে অপরিবর্তনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে নান্দনিক যা কিছু আছে তার বিপরীতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ-অনুসরণে মূল্যবোধ যে বিপর্যস্ত হচ্ছে সে বিষয়ে এরা কি সচেতন? বাঙালির ঐতিহ্য অনুযায়ী সঙ্গীতধারার বাইরে ব্যান্ডসঙ্গীতের মঞ্চানুষ্ঠান তবে হয় কীভাবে?
সংস্কৃতি নিজস্ব নিয়মে ধারাবাহিকতায় প্রবাহিত হয়, ঠিকই। কিন্তু স্বচ্ছ স্রোতোধারায় আবিলতা নিক্ষিপ্ত হলে তাকে পরিস্কার করে নির্মলতা ফিরিয়ে আনতে হয়। তাই সংস্কৃতিচর্চার ধারাও নিরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, কখনোবা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে বৈকি। নববর্ষের দিনটিতে সংস্কৃতি-সাংকর্য ততটুকুই কাম্য যতটুকুতে কোনো সংঘর্ষ না লাগে। হ
লেখক

গবেষক
প্রাবন্ধিক
'বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচের পরই জানাবো'

'বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচের পরই জানাবো'

সতেরো বছর ধরে চেনা মানুষটিকে কি মুখের সামনে বলা যায় ...

দীর্ঘ সময় এয়ারফোন ব্যবহারে যেসব ক্ষতি হয়

দীর্ঘ সময় এয়ারফোন ব্যবহারে যেসব ক্ষতি হয়

আজকাল এয়ারফোন ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যয়াম ...

সাতক্ষীরায় ৭৪ জন গ্রেফতার

সাতক্ষীরায় ৭৪ জন গ্রেফতার

সাতক্ষীরা জেলাব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৭৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার ...

ড. কামাল হোসেনের দুঃখ প্রকাশ

ড. কামাল হোসেনের দুঃখ প্রকাশ

রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুক্রবারের ঘটনার জন্য ...

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি অস্ট্রেলিয়ার

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি অস্ট্রেলিয়ার

অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ...

নজরুলকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের শুটিং চুরুলিয়ায়

নজরুলকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের শুটিং চুরুলিয়ায়

পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের বড় পোস্ট অফিসের ঠিক উল্টোদিকের ফুটপাত। চারপাশে ব্যস্ত ...

ড. কামালের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

ড. কামালের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের ...

দলগুলোকেই অঙ্গীকার করতে হবে

দলগুলোকেই অঙ্গীকার করতে হবে

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সব সময়ই অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ...