কান পেতে রই

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০১৪      

রেদওয়ান রিদন

একটা খুশির খবর দিয়ে শুরু করি। ক্লাসে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশিই খুশি খুশি লাগছে নাফিসাকে (ছদ্মনাম)। তার এমন প্রাণোচ্ছল আচরণ অনেক দিন দেখেনি তার খুব কাছের সহপাঠীরাও। মাত্র ক'দিন আগেও এক বিষণ্নতা গ্রাস করছিল তাকে। পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবে বলে বাসায় জানিয়েছিল। পরিবারের সম্মতিতে সবকিছুই চলছিল ঠিকঠাক। মহাসমারোহে চলছিল পরিবারের কনিষ্ঠ মেয়েটির বিয়ের আয়োজন। এত কিছুর মাঝেই হুট করে বিয়ের আগের দিন ছেলেটি বেঁকে বসল। ভেস্তে গেল বিয়ে। আর তখন থেকেই নাফিসা নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেলে। কীভাবে পরিবার-সমাজের মুখোমুখি হবে এই ভয় গ্রাস করছিল তাকে। নিয়ে ফেলেছিল কিছু প্রাণঘাতী সিদ্ধান্তও। এমন বিষণ্নতা থেকে পরিবর্তনটা হলো কীভাবে?
'কান পেতে রই' বাংলাদেশের প্রথম মানসিক সহায়তা হেল্পলাইন, যেখানে নাফিসার মতো যে কেউ ফোন করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে জরুরি মানসিক সেবা পেতে পারেন। এ হেল্পলাইনের মূল উদ্দেশ্য সমাজের অনেক মানুষের মনে হতাশা, একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা। তাদের মানসিক সমর্থন জোগানো। এ লক্ষ্যটি মাথায় রেখে 'কান পেতে রই' গোপনীয়তা এবং সহমর্মিতার সঙ্গে মানুষের কথা শোনে। বিশ্বের ৪০টি দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা আত্মহত্যা রোধ করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে 'কান পেতে রই' এই ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠান।
'কান পেতে রই'-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ইয়েশিম ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করার সময় নিজেই এ রকম একটি মানসিক সহায়তা কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন তিন বছর। তখন থেকেই এ রকম কিছু একটা তার নিজের দেশে করা যায় কি-না তা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেন। ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল 'কান পেতে রই'-এর হেল্পলাইন নাম্বারগুলো চালু করা হয়। তবে এ জন্য ইয়েশিম দু'জনের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করেন, রোজি হোসেন ও হাম্মাদ আলি। এই তিনজনের সচেষ্ট প্রয়াসেই আলোর মুখ দেখে 'কান পেতে রই'।
ইয়েশিম বলেন, 'মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অনেক মানুষই আসলে কোনো উপদেশ শোনার অবস্থায় থাকে না। বরং সে চায় তার কথাগুলো কেউ শুনুক। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের কাজটা এক কথায় বললে খুবই সহজ এবং সাধারণ, কোনো সাহায্যগ্রহীতার কল এলে তার কথাগুলো শোনা। আমরা ওভাবে কারও সঙ্গে কাউন্সিলিং করি না, তবে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে সাহায্যগ্রহীতা আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে গেলে তাকে যথাসম্ভব নিবৃত্ত করার মতো দক্ষতা একজন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের আছে।' বাংলাদেশ পৃথিবীর ৪১তম দেশ যেখানে এ রকম পদ্ধতিতে সফলভাবে মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং কোনো অবস্থাতেই সাহায্যগ্রহীতার পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয় না। ফলে যে কেউ কোনো রকম ভয় এবং সংকোচ ছাড়াই মানসিক সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।
'কান পেতে রই'-এ মানসিক সহায়তা করার সম্পূর্ণ কাজ করে থাকেন যে স্বেচ্ছাসেবকরা, তাদের শুধু স্বেচ্ছাসেবক বললে তথ্যটি অসম্পূর্ণ হয়। অনেক যাচাই-বাছাই করে তাদের নেওয়া হয়। এরপর সবাইকে একটা দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে এ কাজের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়। চমকপ্রদ তথ্য হলো, যারা এখানে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন তাদের পরিচয় কখনও প্রকাশ করা হয় না। ফলে যিনি সহায়তা নিচ্ছেন তার পরিচয় যেমন গোপন থাকছে, যিনি সহায়তা দিচ্ছেন তার পরিচয়ও কেউ জানছেন না।
'কান পেতে রই'-এর প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, গত এক বছরের কিছু বেশি সময়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০ ফোন কল রিসিভ করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৫৯ জনকে। নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে 'কান পেতে রই' বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যা রোধে নানা কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। সম্প্রতি দেশব্যাপী মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন চালু রাখা হয়েছিল।
'কান পেতে রই' সম্পূর্ণ অলাভজনক এবং স্বেচ্ছাসেবী একটি প্রতিষ্ঠান। গুটিকয়েক বড় মানুষের সহায়তার ছোট ছোট পদক্ষেপে বেড়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যপরিধি। বর্তমানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলোয় একটি নির্দিষ্ট সময়ে হেল্পলাইনগুলো চালু থাকে। এর সঙ্গে জড়িতরা স্বপ্ন দেখেন প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টাই হেল্পলাইন চালু থাকবে একসময়। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত লোকবল এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, যা এ মুহূর্তে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন ইয়েশিম। তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশে এটি নতুন একটি ধারণা। এই ব্যাপারটিকে আরও কার্যকর করতে মানুষের কাছে পেঁৗছে দেওয়া জরুরি। বর্তমানে আমাদের প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এবং লিফলেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা আরও মানুষের কাছে পেঁৗছতে পারব।'
যেভাবে সাহায্য পেতে পারেন
রোববার থেকে বুধবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত যে কারও কথা শোনার জন্যই অপেক্ষা করে থাকেন 'কান পেতে রই' এর প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা। হ