মৃতের উত্থান

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

খুব ভোরে, আলো হওয়ার আগে, ট্রেনটা ছেড়েছে। কামরাতে বাতি নেই, আশপাশের লোকজনের মুখ অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, শুধু আন্দাজে বুঝতে পারি। আমার ভারী তোরঙ্গটা যে ট্রেনে তুলে আমার সিটের নিচে ঢুকিয়ে দিল, সে যুবক আমার মুখোমুখিই বসেছে। সোজা, স্তব্ধ হয়ে। সে বসে আছে, দয়ালু মানুষটি, তার ভেতরটা আর্দ্র আর নরম, তাতে একটা মানুষের প্রাণ আছে। একটা সুন্দর মানুষের প্রাণ। এরকম একটা মানুষের সঙ্গে আমি জীবনটা গেঁথে নিয়েছিলাম, কিন্তু অনেককাল হলো, সে আমার হাত গলিয়ে চলে গেছে। আমার ছেলের সঙ্গে ছিলাম এ দীর্ঘ সময়। কায়ক্লেশে চলে যাচ্ছিল দিন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। গ্রামের লোক আমাকে তাড়িয়ে দিল। আমার ছেলে কিছুই বলল না: বেজার হয়েছে বড় জোর, কিন্তু প্রতিবাদ করল না। আমার ছেলের বউ নিলুফা গ্রামের লোকের পক্ষ নিল। এই নিলুফাকে একদিন নিজের হাতের সেবা দিয়ে মরণের পার দুয়ার থেকে আমি ফিরিয়ে এনেছিলাম।
গ্রাম থেকে বের করে দিল আমাকে, রাজা মিয়া সব কলকাঠি নাড়ল, বুঝতে পারলাম। কিন্তু তাকে রুখে দাঁড়াই, সে শক্তি আমার কই? এককালে ছিল, হয়তো এখনও আছে। কিন্তু খুঁজে যে দেখব সেই শক্তিকে, তাকে উদ্ধার করব, সেই ইচ্ছাটাও আর নেই। (স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে যুবকটির মতো কিছুক্ষণ)
আর এই তোরঙ্গটি ছিল আমার সঙ্গে। এর ভেতর আমার সারাজীবনের সংসার। কী নেই তাতে! স্বামীর পোড়া লুঙ্গিটি, তার চটি জোড়া, পতনের প্রথম ভাত খাওয়ার থালাটা। আমার পতনরে! পতন বেঁচে থাকলে কি আমার এ অবস্থা হয়? কে জানে! হয়তো পতনও পক্ষ নিত রাজা মিয়ার। দুনিয়াতে ক্ষমতার পক্ষে থাকাটাই আদর্শ।
আমার তোরঙ্গটাতে ওইসব ছিল। পতন যে ষাঁড়ের শিং-এর গুঁতো খেয়ে মারা গেল- হায়! সেও আমারি দোষ, সবাই বলেছে; যেন নিজের ছেলের কেউ অমঙ্গল চায়। যেন, কেউ একটা ষাঁড়কে জাগিয়ে তোলে, দিনের বিশ্রাম থেকে। আর বলে, ওগো ষাঁড়, যাও, ছেলেটার গলা এফোঁড়-ওঁফোড় করে দিয়ে আস। হায়! সেই ষাঁড়ের শিংটাও আছে আমার তোরঙ্গে। পতনের গলার নালী চিরে বেরুনো রক্তের দাগসমেত। ষাঁড়টাকে আমি বাঁচতে দিইনি।
কত বয়স ছিল পতনের? দশ? সেই রকম বয়সই তো নাতিটার- পতনের ভাই, আমার ক্ষমতাহীন ছেলে দরদ মিয়ার সন্তান- মান্তুর। নাতিটা ভালোবাসে আমাকে, টের পাই। সে তোরঙ্গটাতে এটা-ওটা অনেক জিনিস ঢোকালো- চিড়া, গুড়, শুকনো খাবার। এসব ঢোকালো আর কাঁদলো। রাজা মিয়া আর তার লোকজন বলল, 'পারুল বেওয়া, তোরঙ্গটা এক হাতে তুলতে পারবি? নাকি ডাকবি তোর কালা জিনটাকে'?
রাজা মিয়া তার ডান পাশে কুদ্দুস মোল্লাকে রেখেছিল কাল সারাদিন। তার ভয় ছিল, আমি যদি কিছু করে বসি। কুদ্দুস মোল্লা সারাক্ষণ দোয়া-দরুদ পড়ছিল। আর তার চোখ দুটি চিকচিক করছিল, রাজা মিয়া তাকে দু-একশ' টাকা না দিয়ে পারেনি গতকাল। দশ বছর আগে হলে ফেলে দিতে পারতাম পাষণ্ডটাকে, এখনও হয়তো পারি। কিন্তু ইচ্ছে হয় না। নিজের শক্তি কতটা আছে, কতটা নেই, সেটাও পরখ করে দেখার উৎসাহ এখন হারিয়ে ফেলেছি।
চলে এলাম। না এলে ছেলের বাড়িতে ওরা আগুন দিত।
ভাগ্যে দরদ মিয়ার এটুকু দরদ হয়েছিল। গ্রামের মাথায় এসে একটা মোষের গাড়িতে আমাকে তুলে দিল, তোরঙ্গটা তুলে দিল। তার চোখটা ছলাৎ ছলাৎ করল, আমি আমল দিলাম না। দরদ মিয়ার অনেক কান্না দেখেছি। তার সাথে অনেক কেঁদেওছি। আর শক্তি নেই, ইচ্ছেও নেই।
কিন্তু মান্তুটা অনেক পথ মোষের গাড়ির সঙ্গে হেঁটে দৌড়ে এলো। ওর কান্নায় আমার চোখে টান পড়ল। আমি ছৈ-এর নিচে লুকিয়ে রইলাম। মান্তু বলল, দাদি গো, ফিরে আয়!
মোষের চালক একটা হাঁক দিয়ে বলল, বাড়ি যা, বেটা, ঝামেলা করিস না। মান্তু কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
ভুলেই গিয়েছিলাম মানুষের আত্মার খবর। স্বামী যতদিন বেঁচে ছিল, মানুষ কী জিনিস, জেনেছি; তার আত্মাটা ছিল মানুষের। তার পর কতদিন চলে গেল! আর এই মান্তুটা। তা, সে তো একটা আধা-মানুষ, এইটুকু ছেলে। তবুও তার ভেতরটা যে মানুষের, সেটা বলতে পারি।
সামনে বসা ছেলেটা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে অন্ধকারে, আমি ঠাহর করতে পারি। তার ঘুম আসেনি, ঘুম লাগেনি; যদিও অন্য সবাই ঢুলছে, কেউ ডুবে আছে গভীর ঘুমে। আমার ঘুম সে কবে পালিয়েছে চোখ থেকে! আমাদের মতো মানুষ যারা, তাদের ঘুম আর জেগে থাকার মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। কিন্তু এ ছেলেটি ঘুমায় না কেন? এই দয়ালু ছেলেটা?
আশ্চর্য, সময় কী যে আস্তে চলে, ধীরে, যেন ভারী চাকাঅলা একটা গাড়ি, যেতে চায় বুকের ওপর দিয়ে। এতক্ষণে সকাল হচ্ছে। কতটা সময় লাগবে কুষ্টিয়া যেতে, কে জানে! সেখান থেকে ছেঁউড়িয়া, লালন সাঁইর মাজার। সেখানেই আমার শেষ ঠাঁই। আমার স্বামী ভালো মানুষ, মজেছিল এই মাজারের টানে। যেত আর আসত। বলত, পারুল রে, শেষ বয়সে বুড়াবুড়ির ঠিকানা হবে সাঁইয়ের মাজার। তা আর হলো না। মাঠ থেকে গরু আনতে গেল লোকটা, মাথায় ভেঙে পড়ল আকাশটা। বাজে পুড়ে খাক হয়ে গেল ওই রকম তাজা শরীর।
তখনও দোষটা আমার। গ্রামের লোক বাসা ভেঙে পড়ল আমাকে গঞ্জনা দিতে; কেউ মুখে, কেউ চোখে। এতটুকু সমবেদনা নেই, শুধুই গঞ্জনা। সবারই ধারণা, যেন আমিই দায়ী তার মৃত্যুর জন্য। যেন আমি বাজটাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বলেছি, যাও তো বাবা, লোকটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঝলসে দিয়ে আস। নিজের স্বামীকে! হায়! কিন্তু লোকটা তো আর ফিরল না।
ছেলেটার মুখের ওপর এবার আলো পড়েছে। আহা! কী সুন্দর ছেলেটা! কত বয়স? পঁচিশ? মুখটা ফর্সা, ভ্রু দুটি জোড়া হয়ে আছে, আর কালো ছায়া ফেলেছে চোখে। মাথায় চুল কালো আর ঘন। কিন্তু কতদিন চিরুনি পড়েনি! কতদিন ছেলেটি দাড়িও কাটেনি! এতক্ষণে তার ঘুম পেয়েছে। চোখ দুটো হাল্কা খুলে রেখেই ঘুমাচ্ছে। ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিচ্ছে, বাচ্চা ছেলেরা জেগে ওঠার আগে যেমনটা নেয়। মাথাটা হেলে পড়েছে একদিকে; সকালের আলোয় কী সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে! তার ভিতরে মানুষের একটা প্রাণ আছে। খোদা!
এত করুণ লাগছে কেন ছেলেটার মুখ? ছেলেটি কি দুঃখী? এ-তো দুঃখী মানুষের মুখ, নিঃসন্দেহে। এই বসে থাকা, এই মাথাটা খানিকটা হেলিয়ে দেয়া, এই ক্লান্তির কালি ঢেলে দেয়া চোখের চারপাশে- এসব লরণ আমি চিনি। আমাকে বলে দিতে হয় না।
ছেলেটির কী দুঃখ, আমাকে জানতে হবে। ছেলেটির ভেতরে একটি মানুষের প্রাণ আছে, সেটি যেন কষ্ট না পায়। সে কষ্টের একটা সুরাহা করতে হবে।
কী সেই কষ্ট, যার ভারে নুয়ে পড়েছে ছেলেটা? মানুষের দুঃখ দেখে মনে হতে পারে, জীবন অনেক কষ্টের। কিন্তু কষ্ট আসলে খুব বেশি রকমের থাকে না। আর একেকটা বয়স থাকে যখন কষ্টগুলো যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে। এই ছেলেটির যে বয়স, তাতে দুটি বা তিনটি কষ্ট তার থাকার কথা। তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি, সে জাগলে। কিন্তু কী লাভ হবে? এসব কষ্ট মানুষ ভেতরে চাপা দিয়ে রাখতে চায়। এসব কথা দিয়ে বোঝানো যায় না, দিতে গেলেই তারা ফণা তুলে ছোবল মারে। আহ!
আমার বয়সে কষ্টরা কমতে কমতে দুই একটাতে এসে দাঁড়ায়। বড় কষ্টটা বেঁচে থাকার ... নিলুফাকে মেয়ে ছাড়া ভাবিনি কোনোদিন, আল্লার কসম। মান্তুর জন্মের সময় প্রায় যেতে বসেছিল মেয়েটি। যেতে বসেছিল মানে, চলেই যেত, যদি আমার ভেতরের শক্তিগুলো সব একত্র করে তাকে ফিরিয়ে না আনতাম। আমার সারা শরীরে কী চাপ, অসহ্য যন্ত্রণা! আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। কিন্তু মেয়েটা কঁকাতে কঁকাতে ফিরে এলো! সেই নিলুফা এখন আমাকে ভাবে জাত শত্রু। তার শেষ বাচ্চাটা আঁতুড় ঘরে মরল। এ রকম বাচ্চারা কত মরে! কিন্তু সব দোষ গিয়ে পড়ল আমার ওপর। নিলুফা চিৎকার করে কান্নাকাটি করল, বিলাপ করল, আর আমাকে অপবাদ-অভিশাপ দিল। যেন আমি এইটুকু সোনার টুকরা একটা বাচ্চাকে মেরে ফেলার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। যেন বলেছি আজরাইল ফেরেশতাকে, জনাব, এই মানব সন্তানটিকে সরিয়ে দিন দুনিয়া থেকে। হায়! কেউ আমাকে জিজ্ঞেসও করল না, আমি কেঁদেছি কি-না বাচ্চাটার জন্য। গ্রামের লোক আমাকে মেরেই ফেলত, বিশেষ করে রাজা মিয়া আর তার দলবল, নেহাৎ আমার ক্ষমতাকে ভয় পায় লোকগুলো। ভাবে, কিছু করতে গেলে গলা দিয়ে রক্ত উঠে যদি মরতে হয়।
এ ভয়টা তাদের হয়েছে ভীষণ বাজে ওই লোকটা মারা যাবার পর। নিজেদের গ্রাম থেকে একটা বোবা মেয়েকে এনে ঘরে রেখেছিল নিলুফা, কাজকর্ম করত, এটা-সেটা করে দিত। সেই মেয়েটাকে, সেই তেরো-চৌদ্দ বছরের ফুটফুটে মেয়েটাকে, একদিন সন্ধ্যায় পুকুরের পাশ থেকে জাপটে ধরে আখক্ষেতে নিয়ে গিয়ে কত কষ্ট দিল ওই লোকটা! মজম আলি ছিল যার নাম, রাজা মিয়ার শ্যালক। দিয়ে-টিয়ে যখন গা ঘিন-ঘিন করা হাসি হেসে চলে যাচ্ছে সে পুকুরপাড় দিয়ে, আর বোবা মেয়েটা কাতরাচ্ছে আখক্ষেতে, আমি সব দেখতে পেলাম। মজম আলি পুকুরটা বাঁয়ে রেখে পথে নামতেই তার রক্তবমি শুরু হলো। কী তার চিৎকার, আর কাতরানো! নামাজ শেষে একটা আস্ত মসজিদ লোক ভেঙে পড়ল তার চারদিকে। মজম আলির সেই ছিল শেষ জেনা-কর্ম।
কিন্তু ছেলেটার কী দুঃখ? সে দু-একবার অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়েছে আমার দিকে। কিছু একটা বলতে চেয়েছে, অথবা হয়তো এ আমারই বোঝার ভুল। হয়তো সে আমার কৌতূহলী চাহনি দেখে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষের ভেতরের কষ্ট যখন সামাজিকতার দায় থেকে বড় হয়ে দাঁড়ায়, মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে যায়, অথবা ভুলে যায় সবকিছু। আমিই কি তাকে জিজ্ঞেস করব? ব্যাপারটা ভালো দেখাবে?
আমার আয়ু আর বেশিদিন নেই_ সেটা বুঝতে পারি নিজের অনিশ্চয়তার দিকে তাকালে। আমাকে কেউ কি কখনও ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে? বাধা দিতে পেরেছে, যা করতে চাই তা থেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছে? তবে আজ?
না, আমার পক্ষে আজ ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা সম্ভব হবে না। তাহলে একটা পথই খোলা থাকে। কিন্তু তাতে কষ্ট আছে। বুড়ো হয়েছি, আগের শক্তি নেই। পারব কি? পারা কি সম্ভব, এই বয়সে? অনেক দিন এমনটি করিনি যে!
কেন এত কৌতূহল হচ্ছে ছেলেটাকে নিয়ে? এ জন্য কি, ছেলেটার ভেতর মানুষের একটা প্রাণ আছে? সেই কবে শেষ একটা মানুষ দেখেছিলাম। তারপর থেকে একটানা জন্তুদের সঙ্গেই বাস করে আসছি। মানুষ কই? সব জন্তু, হায়ওয়ান।
কৌতূহলেরই জয় হবে, শেষ পর্যন্ত, দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ছেলেটার কোনো বিপদ হবে না তো? আমার শক্তি ক্ষয় পাচ্ছে, যদি কিছু হয়! সাহায্যে আসতে পারব কি ছেলেটার?
আহ্-হা! ছেলেটার মাথার একেবারে ভেতরে ঢুকে পড়েছি। ভীষণ পরিশ্রম হচ্ছে, শরীরের সব ক'টি রগে টান টান ব্যথা হচ্ছে, সব নীল হয়ে গেছে। আমি কি মরেই যাব? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু আমার শক্তি ক্ষয়ে যায়নি! কেমন ঢুকে পড়লাম ছেলেটার মাথায়। তার চিন্তায়। বাহ! এখন তাকে কিছু বলতে হবে না। আমি জেনে নেব সবটুকু।
কিন্তু হায়! ছেলেটার মাথার ভেতরটা এত ধূসর। কেন? তার চিন্তাগুলো নিষ্ক্রিয়। অবসাদে আচ্ছন্ন। যেন ঘন কুয়াশার একটা চাদর বিছিয়ে আছে তার স্মৃতির ওপর, যার ওপাশ থেকে কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না। কিছু বিক্ষিপ্ত ছবি, কিছু মানুষের মুখ, আর খুব দ্রুত এবং ঘুরতে থাকা কিছু ভাবনা যারা একটা অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছে না সুস্থির হওয়ার জন্য।
আমি ছেলেটার চিন্তার পরতে ঢুকে গেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোনো মানুষের চিন্তা এত বিক্ষিপ্ত এবং বিশৃঙ্খল হয় কীভাবে? ছেলেটার ভেতরে কোথাও জানি কান্না বাজে, তার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় তার রক্তের চলাচলে। আমি কান পেতে শুনেও তার উৎসটি আবিষ্কার করতে পারি না। এ আমার অক্ষমতা। আমার বার্ধক্যের লক্ষণ। আমি কি ইতি টানব আমার চেষ্টার? একা ছেড়ে দেব ছেলেটাকে, তার কষ্ট এবং কান্না সমেত?
এতক্ষণে কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে একটুখানি এবং একটি মুখের আদল ভাসতে শুরু করেছে তার মনের পর্দায়। একটা নামও শুনতে পাচ্ছি তার বুকের ওঠানামার মধ্যে- ছেলেটার কান্নার সঙ্গে নামটাও বেজে যাচ্ছে- সাহানা- একটা করুণ গানের মতো।
সাহানার ছবিটা খুবই আবছায়া, খুবই অস্বচ্ছ। মুখের কোনো রেখা স্পষ্ট নয়, কোনো ভঙ্গি পরিষ্কার নয়; তবুও ঠাহর করা যায়। ছেলেটার অন্তঃকরণে ছবিটি ঘুরেফিরে প্রক্ষিপ্ত হয়, তার স্মৃতি অথবা নিমগ্নতার নানা ফাঁকফোকর থেকে। বিষণ্ন। বিষণ্ন তার চোখ, তার মুখ, ছেলেটার। চোখ দুটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এত করুণ, যেন সারাক্ষণ আর্তনাদ করছে। আর ছেলেটি প্রাণপণে ওই মুখটাকে কুয়াশার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতে চাইছে।
আমি এবং ছেলেটি- আমরা, তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে। কিন্তু সাহানা তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। ছেলেটা আরও একটু কুয়াশা ঢালল সাহানার চোখের ওপর। সাহানার চোখ দুটি অদৃশ্য হতে থাকল।
বিষয়টি আমাকে অবাক করেই চলেছে- কেন ছেলেটি ভুলতে চাইছে সাহানাকে? তার মন-প্রাণজুড়ে আর কোনো নাম নেই, আর কোনো মুখ নেই। সেখানে সাহানাই এখন একা, চাঁদের মতো। সাহানা কথা বলে, আমি সে কথা শুনতে পাই। কারণ ছেলেটির চেতনার ভেতর তার ছায়ার মতো ঢুকে জড়িয়ে গেছি আমি। সাহানা ছেলেটাকে বলে, তুমি আমাকে ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারবে না।
ছেলেটা বলে, তোমার নামটা মুখে আনতেও বলো না আমাকে।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে আছি, কিন্তু সাহানার আর কোনো কথা শুনতে পাই না। আমার কৌতূহল তীব্র হচ্ছে। কেন এমন কথা বলছে ছেলেটা?
উত্তরটা পেয়ে যাই। উত্তর আর কি - সেই পুরনো ঈর্ষা, সন্দেহ।
ছেলেটা সন্দেহ করেছে সাহানাকে।
আমি কান পেতে থাকি, কিন্তু সাহানার কোনো কথা ছেলেটা শুনতে চায় না। আর সে যদি শুনতে না চায়, আমি কী করে শুনি?
এবার আমার পুরনো একটা জিদ চেপে ধরেছে। সাহানার মধ্যে একজন মানুষকে দেখি আমি, আমার মতো একজন মানুষ, যে আমারই মতো একটা কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ওই কষ্টের ভারটা সহ্য করা যায় না।
কারণ সে কষ্টের জন্য আমি এবং সাহানা কেউ দায়ী নই, তাই তৈরিও নই। মানুষ ভুল বুঝে সে কষ্টের বোঝা চাপায় আমাদের ওপর।
আমার ইচ্ছা হয় সাহানাকে তুলে আনি ছেলেটার মনের সবচেয়ে গভীর অন্ধকার থেকে। তাকে মুক্ত করি, তাকে বসিয়ে দিই তার সব চিন্তা ও চেতনার মাঝখানে, তার রক্ত চলাচলে, তার চোখের তারায়, তার প্রতিটা রোমকূপে।
ছেলেটার ঈর্ষা ও সন্দেহ দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে সাহানাকে। সেটি হতে দেব না। সাহানার জন্য এটুকু আমি করব। আমার নিজের জন্যই এটি করব, আসলে।
আমার শক্তিগুলো আবার একত্র করতে শুরু করেছি। জানি, আমার কষ্ট হবে প্রচণ্ড, বলার মতো তা নয় । হয়তো এই হবে আমার শেষ পরিশ্রম। কিন্তু ছেলেটি তো ফিরে যাবে সাহানার কাছে- এই হবে আমার পুরস্কার। এই ট্রেনের কামরায় না-ই বা ফিরে এলাম, আমি। লালন সাঁইর মাজারটা পড়ে থাক, আর এক জীবনের জন্য।
খোদা! অন্ধকারে আলো দেখতে পাচ্ছি। এবার সাহানা ফিরে আসবে, আর ছেলেটি ফিরে যাবে তার কাছে। আহ্!
আশ্চর্য, আমি মরলাম না। কিন্তু মরা মানুষ থেকে খুব তফাতে কি আছি আমি? হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে, বুকটা কাঁপছে, যেন একটা তুফান যাচ্ছে তার ভেতর দিয়ে। কেউ হাত ধরে না তুললে উঠতে পারব না। অসম্ভব।
ছেলেটা হঠাৎ চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠে। কেউ কিছু বোঝার আগে ট্রেনের দরজার কাছে যায়, এবং বাইরে লাফিয়ে পড়ে।
মাগো!
ডাইনি, ডাইনি! তুই ডাইনি! ছেলেটাকে মেরে ফেললি? এবার বুঝতে পারিস, কেন তোকে গ্রামের লোক ডাইনি বলত? কেন অপবাদ দিত তোকে? কেন রাজা মিয়া তাকে গ্রামছাড়া করল? কেন আপন ছেলে এর প্রতিবাদ করল না? মাগো! ছেলেটিকে আমিই খুন করলাম।
সাহানাকে ভুলে থাকতে চেয়েছিল দয়ালু ছেলেটা। কেন, সে তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু এত দেরি হলো সেটি বুঝতে? সাহানা-
হাঁ, হাঁ, এইমাত্র সাহানার শেষ ছবিটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এত দেরিতে! আমার বয়স হয়েছে, আমার সব ক্ষমতা গেছে, সব ক্ষয় হয়ে গেছে। সাহানার এই ছবিটা আমি আগে কেন ধরতে পারিনি? এমন তো হবার কথা নয়। ওরে ডাইনি, তোর ঠাঁই তো আর সাঁইজির মাজারেও হওয়ার কথা নয়। একটা মানুষ ছিল বেঁচে, তাকেও খুন করে ফেললি! ছেলেটা ভুলে থাকতে চেয়েছিল সাহানাকে, কেন- সে তো তার ছবিই বলে দেয়; বোজা চোখ, চোখের মণি দুটি স্থির- ঠোঁটের পাশে গাঢ় বেগুনি দাগ, যেন ভয়ানক কিছু গড়িয়ে পড়েছিল ঠোঁট দিয়ে। এমন ছবি একটা কথাই বলে- মেয়েটি বিষ খেয়েছিল। এবং ছবিটা পুরনো নয়। তাতে এক সপ্তাহের ধুলোও জমেনি।
হায়!
এবার আমার পালা।