কবিতার অন্তরালে

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

কবিতার অন্তরালে

বেলাল চৌধুরী ছবি ::রাজিব পাল

শূন্যতাই তার একমাত্র গভীরতা
বেলাল চৌধুরী
কবিতা কতটা বিষয় কতটা শিল্পনির্ভর। কবিতা তো বটেই, যে কোনো সৃজনশীল কাজের জন্যই বিষয় এবং শিল্প দুটোই একান্তভাবে প্রয়োজনীয়। কথাটা হচ্ছে বিষয়কে নিয়ে, যে কোনো বিষয়কেই শিল্পোত্তীর্ণ করতে না পারলে সেটা তো নিছক একটা নিষ্প্রাণ জড়পিণ্ড ছাড়া আর কিছুই হবে না। আবার শুধু শিল্প শিল্প করলেও কিছু হবে না। দুটোর মধ্যে সমন্বয় সাধনই প্রকৃত শিল্পীর কাজ। বিষয় এবং শিল্প দুটোই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। অলিখিত যুগের কবিতার সঙ্গে লিখিত যুগের কবিতার শৃঙ্খলাগত ও শৈলীগত পার্থক্য কতটুকু? এ প্রশ্নের জবাবে বলা যেতে পারে অবশ্যই দুটোর মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। অলিখিত যুগের কবিতা বলতে তো সেই আবহমান পয়ার... মানুষের, বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের মুখের কথা ভাষাতেই রয়েছে পয়ারের টান... যুগের পর যুগ ধরে যে ধারা অব্যাহত গতিতে, বংশানুক্রমে মুখে মুখে চলে আসছিল তার মধ্যে শৃঙ্খলা বা শৈলী বলতে যা ছিল তার বেশিরভাগই ছিল অপরিশীলিত এবং বাধাবন্ধনহীন। অসম্ভব মনোটোনাস একটা ব্যাপার- মানে একঘেয়ে, ক্লান্তিকর, কখনও কখনও বিরক্ত উৎপাদনকারীও বলা যেতে পারে। বরং লিখিত যুগই এসে বল্গাহীন সেই অবিরল ধারার ওপর প্রথম রাশ টেনে ধরল, উচ্ছল ও চপল গতিকে বেঁধে দিল একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। এলো ব্যাকরণের বন্ধন, ছন্দের ভেতর বহু বৈচিত্র্য... শৈলীর মধ্যে ছাপ পড়ল নিজস্ব মুদ্রার, উচ্চকণ্ঠ প্রগলভতা প্রশমিত হয়ে এলো নিয়মের শৃঙ্খলা...এখানে যে পাঁচটি কবিতা আঁটিবদ্ধ করা হলো সেগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেজাজে রচিত হয়েছে বলে মনে হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন বীজের ফসল। এর পরেও কবিতা বলে কথা; কবিতার যথার্থতা প্রমাণ কবির কাজ নয়।
কবিতা, এমনকি আমি- অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে বন্দি হয়ে আছি যেন। স্বপ্নের এই প্রাচীরের নেই কোন ঘনত্ব ও তৌল- শুধু শূন্যতাই এর একমাত্র গভীরতা, প্রাচীন প্রাচীরগুলি হয় যেমন প্রহর আর প্রহরগুলি তেমনি হয়ে ওঠে বিষম অবাধ্য। আর এই প্রহরগুলির মধ্যে সময়, কত যে সন্তাপ, শোক আর দুঃখ জমিয়ে তোলে, তা আর বলার মতন নয় বোধ হয়।

প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি

আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর
বিরূপ-বৈরিতায় শস্ত্রপাণি হয়ে উঠেছে

এবার তাদের বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে
উচ্চারিত হলো- আমার কঠোর দণ্ডাজ্ঞা
আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষষ্ট কৃপাণ
চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহশলাকা
ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এবার ওরা অটল
আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো
বিস্টেম্ফাটক দগদগে ঘা পুঁজ আর শটিত গরল
গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি
নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি- হায় রে জলধারা
কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- নিষ্কৃৃতি নেই আমার
নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড- ঠান্ডা চোখে দেখছি আমি
নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ ।