প্রেসিডেন্ট বুশের পাশে, তবে...

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

ফরিদুর রেজা সাগর

কিছুদিন আগে আমরা ইথিওপিয়া গিয়েছিলাম।
সবাই জানেন। তবুও বলছি, ইথিওপিয়া আফ্রিকার এক দেশ। যে দেশটি পূর্ব আফ্রিকায়। একদিকে সুদান, দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা, কেনিয়া আর সোমালিয়া। অন্যদিকে ইয়েমেন আর সৌদি আরব। মাঝখানে উপসাগর। যে সাগর চিকন হতে হতে মিসরের কায়রোতে গিয়ে মিশেছে।
বড় জরাজীর্ণ, অবহেলিত এই দেশটিতে যাইনি। উপলক্ষ না পেলে কখনও যাওয়া হতো কি-না কে জানে!
আমরা তিনজন রওনা হলাম ইথিওপিয়ায়। আমি ছাড়াও আমীরুল ইসলাম আর রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তিনজনের টিম।
বন্যার এক আত্মীয়ার পোস্টিং হয়েছে ইথিওপিয়ায়। ইউএনডিপিতে বন্যার মামাতো বোন চাকরি নিয়ে গেছেন। ডাক্তার ও পিএইচডি করা ডক্টর এবং ওই ভদ্রমহিলার স্বামীও উচ্চপদে কাজ করেন।
কিছুদিনের জন্য ইথিওপিয়ায় পোস্টিং হয়েছে ওদের।
বন্যার কাছে তথ্যটি পেতেই চিন্তা করলাম, কখনও তো এমনিতে ইথিওপিয়ায় যাওয়া হবে না, তো চট করে একটু ঘুরে আসা যাক। গেলাম।
ভেবেছিলাম যা, তা-ই হলো। নানা সমস্যায় ভর্তি দেশটিতে এয়ারপোর্টে নেমেই প্রথম ধাক্কা!
সবার লাগেজ এসেছে, শুধু বন্যার লাগেজ আসেনি। বিপত্তির শুরু যখন এয়ারপোর্টের মানুষজনের কাছ থেকে লাগেজ পাওয়ার কোনো গ্যারান্টি পাওয়া গেল না।
অনেকটা সময় লাগবে বেল্টে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বীতশ্রদ্ধের চূড়ান্ত হয়ে ছোটা হলো অনুসন্ধান ডেস্কে। গুরুত্বই পাওয়া গেল না। নানা জিজ্ঞাসা শেষে নৈর্ব্যক্তিক উত্তর 'ফর্ম ফিলআপ করতে হবে। দেখুন যদি কিছু হয়।'
'যদি কিছু হয় মানে?'
প্রতিক্রিয়া ঘটল আমীরুল ইসলামের।
উত্তর এলো কঠিন ভাষায়, 'মানে লাগেজ কখন পাবেন, কখন পাবেন না, তার গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি?'
'পারছেন না?'
'না। সরি। শুধু ফরমালিটিজগুলো সেরে বেরিয়ে যান।'
তাই করলেন বন্যা। একাধিক ফর্মের পাতা পূরণ করে বন্যার সঙ্গে আমরা বাইরে এলাম। বলা হলো, লাগেজ এলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বন্যা তেমন চিন্তায় পড়লেন না। বোন ইউএনডিপিতে আছে। কাজেই একটা সময় লাগেজ ঠিকই পাওয়া যাবে।
শুরু হলো নতুন ঘটনা। গরিব একটা দেশের চিত্র দেখার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু যেখানে যাই, যেখানে দাঁড়াই, পাঞ্জাবির কাপড় ধরে টানাটানি চলতে থাকল। বিরক্ত হওয়া আমাদের স্বভারের সঙ্গে যায় না। বিরক্তি হচ্ছি না বলে যেন পেয়ে বসল বেশি।
দ্বিতীয় দিনে আমরা গেলাম বিশেষ একটা জায়গায়। এ মুহূর্তে নামটা মনে আসছে না। রাজধানীর বাইরে। 'লালিবেলা' জাতীয় একটা নাম। বিখ্যাত জায়গা। ইথিওপিয়া এলে পর্যটকরা সেখানে যায়।
আমরাও সকাল সকাল চলে গেলাম সেখানে। আমি, বন্যা, আমীরুল আর বন্যার ডক্টর স্মার্ট বোনটি।
এ জায়গায় একসময় দেশটিতে গির্জা স্থাপিত হয়।
এ গির্জাগুলো প্রতিটিই মাটির নিচে। এভাবেই তৈরি করা। যুদ্ধ বিগ্রহের দেশ তখন ইথিওপিয়া। যুদ্ধে যাতে গির্জাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই চিন্তায় প্রতিটি মাটির তলায় স্থাপিত।
মনে পড়ে গেল, এমনটিই দেখেছি ভিয়েতনামে। ওখানে গির্জা নয়, পুরো শহরটা নিয়ে যাওয়া হয় মাটির নিচে। যুদ্ধের আঁচ যাতে না লাগে আস্ত শহরটাই মাটির নিচে বানানো হয়েছিল। সেই শহরে ঢোকার জন্য দেখেছি, সুড়ঙ্গ দিয়ে শহরে ঢুকতে হয়। অনেকটা দিন মাটির তলায় থাকা যায় সেই ব্যবস্থাও করা ছিল।
দশটা গির্জা মাটির নিচে তৈরি করায় আজকের পৃথিবীতে এক 'বিশাল স্থাপনা' হিসেবে দলে দলে মানুষ দেখতে আসে। প্লেনে রাজধানী থেকে সেখানে পেঁৗছতে সময় লাগে ৪০ মিনিট। সুতরাং এত কাছে এসে কেউ তা না দেখে যায় না।
আমরাও গেলাম।
একটার পর একটা দেখছি ঘুরে ঘুরে।
খুবই গরিব দেশ। যেখানে যাই, সেখানে ভিড় করে আসে স্থানীয়রা। জটলা করে ঘিরে ধরে। তাকিয়ে থাকে। অনেকে দুস্থতার কারণে সাহায্য চায়।
একজন তরুণ আমীরুলের কাছে বলল, 'আমায় কিছু টাকা দেবে?'
বিব্রত না হয়ে আমীরুল প্রতি উত্তরে জিজ্ঞেস করে, 'টাকা?'
'হ্যাঁ টাকা।'
'কী করবে?'
'একটা ডিকশনারি কিনব তাহলে!'
আমীরুল আরও অবাক, 'কিসের ডিকশনারি'!
'ইথিওপিয়ান টু ইংলিশ। তোমার টাকা দিতে হবে না নগদ। কাছের লাইব্রেরি থেকে যদি ডিকশনারিটা তুমি নিজ হাতে কিনে দাও, তবেই অনেক কাজে লাগবে। উপকৃত হবো পড়াশোনার জন্য।' অকপট গলায় তরুণটা জানাল। এও জানাল, ভালো করে না শিখলে এগোতে পারব না। পাশের দোকানটায় রয়েছে। তুমি আমাকে নিয়ে গিয়ে ডিকশনারি কিনে দিতে পার।
দেখলাম, খালি গা হাফ প্যান্ট পরা গরিব একটা ছেলে!
আমি মানুষের মুখের কথা বলি। ডিকশনারিটা কিনে দেওয়ার পর ছেলেটির মুখটা ঝলমলে উজ্জ্বল চেহারা হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে!
ডিকশনারি দেখে কারও অবয়ব যে আমূল বদলে যায়, আমার ধারণা ছিল না।
যেখানে যাই, সেখানে দেখি সংকট।
এবার তিনটা গির্জা ক্রস করে আমরা একটা গির্জার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে দেখি, আমাদের চারপাশে কিছু সশস্ত্র মানুষ। ঘিরে ফেলল আমাদের সেকেন্ডের মধ্যে।
কী হলো, কী ব্যাপার?
ফটাফট সশস্ত্র কয়েকজন বিভিন্ন পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এখানে অস্ত্র বহনকারী আর্মি কেন?
খানিক দুশ্চিন্তা তৈরি হলো চোখের নিমিষে।
আমি প্রশ্ন করলাম তাদের, 'আমাদের কি এখান থেকে সরে যেতে হবে?'
একজন আর্মি অফিসার উত্তর দিলেন, 'না, না তোমরা থাক।'
'থাকব? শিওর? চলে যেতে হবে না তো?'
অফিসার বললেন, 'একদম না। তোমরা ট্যুরিস্ট। তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না। কোনো অসুবিধা নেই।'
দেখলাম, প্রতিটি কোনায় কোনায়, মানে ছয় কিনারে অন্তত ছয়জন সটান দাঁড়িয়ে গেছে।
আমাদের উৎকণ্ঠা তবু যাচ্ছে না। একে অন্যের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছি। একটু পরেই জানলাম যে, এখানে জর্জ বুশ আসবেন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে আমাদের মতো ভিজিটর হিসেবে আসবেন।
সে কারণেই তার প্রাথমিক নিরাপত্তা হিসেবে এই সশস্ত্র মহড়া।
আমরা পরের গির্জা দেখার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। কিন্তু দাঁড়িয়ে গেলাম তৎক্ষণাৎ। ভাবলাম, এমন একজন ব্যক্তিত্ব আসবেন, বুশের মতো সাবেক প্রসিডেন্ট, সুতরাং ঠিক করে ফেললাম, দেখেই যাই!
আমরা একটা উঁচু জায়গায় ছিলাম। ওখানেই নীরবে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই প্রেসিডেন্ট বুশ এলেন। কেতাদুরস্ত পোশাকে। গটগট করে হেঁটে ঢুকলেন গির্জার ভেতরে।
ঘুরে ঘুরে গির্জা দেখছেন। দূর থেকে সবই লক্ষ্য করছি।
হঠাৎ আমার মাথাতেই এলো। একটা কাজ করা যাক। কী কাজ? তিনি তো গির্জা দেখে ফিরবেন, ফেরার সময় তার সঙ্গে কথা বলব?
একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলব। এত বিরাট ঘটনা।
বন্যা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এটা সম্ভব নাকি। আমরা সিনিয়র মানুষ। এ বয়সে তার সঙ্গে আমরা কী করে কথা বলব।
যদি সঙ্গে দু'একটা শিশু বাচ্চা থাকত, তাহলে ছুতো নিয়ে সামনে দাঁড়ানো যেত। হয়তো বলা যেত, ওরা আপনার সঙ্গে ছবি তুলবে। একটু দাঁড়াবেন? সেটাও তো সম্ভব না। আমরা কি কাছে গিয়ে সে কথা বলতে পারি?
বললাম, হতাশ হবেন না। দাঁড়ান, ব্যবস্থা করছি। আপনি দরজার কাছাকাছি এই জায়গায় দাঁড়ান।
বন্যা তাই করলেন। বন্যার পরনে শাড়ি। আমার পরনে পাঞ্জাবি। আমীরুলের পরনে পাঞ্জাবি। নিরাপত্তা জিজ্ঞেস করে আমরা এমন এক জায়গায় দাঁড়ালাম, যেখানে নিরাপত্তা প্রহরীদের আপত্তি থাকল না, আমরাও চোখে পড়ব।
তখন আইফোন কারও কাছে নেই। আছে আইপ্যাড।
বন্যার মামাতো বোন দিশা স্মার্ট ডাক্তার। চলাফেরা-কথাবার্তা সবকিছুতেই নির্ভীক। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় চাকরির কল্যাণে।
দিশাকে আইপ্যাডটা দিয়ে বললাম, দিশা, তুমি আমার কাছ থেকে দূরে উল্টো পাশে গিয়ে দাঁড়াও কাইন্ডলি। যে মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট বুশ আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন, তুমি চটপট ছবি তুলবে।
দিশার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বলল, আপনি কি পাগল হয়েছেন সাগর ভাই? প্রেসিডেন্ট বুশ আপনার সঙ্গে কথা বলবেন, এটা কী করে হয়? যেনতেন প্রেসিডেন্ট নন। আমেরিকার সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্টের একজন তিনি। অত সহজ ব্যাপার না।
আমি বললাম, তুমি পজিশন নিয়ে গিয়ে দাঁড়াও না। না বলতেই পারেন। না বললে আমরাও চলে যাব। অপেক্ষা কর। দেখ কথা বলেন কি-না। ঠিক আছে?

জর্জ বুশ যখন দৃঢ় পায়ে দৃপ্তভঙ্গিতে সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন দিশাও হতভম্ব হয়ে ছবি তোলা ভুলে গিয়ে বুশের দিকে তাকিয়ে আছেন।
কাছাকাছি আসতেই বন্যা আনন্দিত ভঙ্গিতে বুশের দিকে তাকালেন। বুশ হাত তুলে অভিবাদন জানালেন। আমাদের সবার চোখমুখই তখন খুব উজ্জ্বল। আনন্দের রেশ।
বুশ আমাদের অতিক্রম করে যাওয়ার সময় বন্যার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে তাকালেন। তারপর খুব সরলভাবে হাসিমুখে বললেন,
তুমি কি ভারতীয়? তোমার পরনের পোশাকটা খুব সুন্দর।
বন্যাও তখন সহজ হয়ে উঠেছেন। আনন্দের আতিশয্যে আমরা সবাই কিছুটা হতভম্ব। বন্যা চিৎকার করে দূর থেকে বললেন,
না। আমি বাংলাদেশি। আমার পরনের পোশাকের নাম শাড়ি।
জর্জ বুশ বললেন,
তোমার পোশাকটা খুব সুন্দর। তুমিও খুব সুন্দর।
বন্যা তখন লাজুক ভঙ্গিতে হাসছেন।
বুশও হাসতে হাসতে এগিয়ে গেলেন অপেক্ষমাণ হেলিকপ্টারের দিকে।
দিশা হতভম্ব ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। আইপ্যাড দিয়ে সে এলোমেলো ছবি তুলেছে। বুশের সঙ্গে বন্যার কথোপকথনের ছবি সে তুলতে পারেনি।
বন্যা অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। আমাদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। একজন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের মুখে বন্যার প্রশংসা! আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে জ্বলতে লাগল।