ক্লিভল্যান্ডের রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেইম

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

শাকুর মজিদ

সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমেরিকার গাছপালার পাতায় রঙ ধরতে শুরু করে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যেমন আমাদের পুঁটিমাছেরা সদ্য যৌবন পেয়ে পেটের ওপর লাল রঙের পাড় বসায়, মনে হয় আমেরিকার শীতপ্রধান অঞ্চলের প্রকৃতিতেও এমন শাড়ি বদলের হিড়িক পড়ে।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল কঠিন শীতের রাজ্য মিশিগান থেকে। আমরা এক হাজার মাইল দূরের ম্যারিল্যান্ডের পথে যাত্রা শুরু করেছি গাড়ি নিয়ে। আমেরিকায় এমন শত শত মাইলের যাত্রাপথ এ কারণেই অনেক বেশি আমোদের যে, যেতে যেতে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির রূপ দেখা যায়। আর কোথাও মাইলের পর মাইল সবুজ ভুট্টা বা ধানক্ষেত আর তার পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামীণ পরিবেশ এবং সড়কের দু'পাশের গাছপালা দিয়ে আড়াল করার বৃক্ষরাজি, সবই দেখার মতো। আমাদের মতো অতিজনবহুল শহরের বাসিন্দারা এমন ফাঁকা সড়কপথে চলতে পারাটাকেই মনে করে বাড়তি বিনোদন।
এ রকম আন্তঃরাজ্য সড়কপথগুলোও তাদের আলাদা। প্রশস্ত সড়কের প্রতি দিকে তিনটি সারি নির্ধারণ করা থাকে। এর কোনোটিতে ধীরগতির ট্রাকলরি, অন্য দুটিতে প্রাইভেট বাহন। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের জন্য আলাদা সড়ক। সেগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি সময় নিয়ে যায়। সুতরাং নিজের গাড়ি চালিয়ে যেতে চাইলে সড়কপথে উঠে স্টিয়ারিং ধরে চুপচাপ বসে থাকলেই হয়। পথে পথে স্ট্রিট সাইন তো আছেই, জিপিএস ডিভাইস একটা গাড়িতে লাগানো থাকলে আর কোনো চিন্তাই নেই। সুকণ্ঠি যন্ত্রবন্ধু কিছুক্ষণ পরপর হালকা করে আওয়াজ দেবে। সামনে কোথায় খাবার দোকান, কোথায় গ্যাস পাওয়া যাবে, কোথায় খাবার আর কোথাও যদি বড় শহরের ভেতর ঢুকেই যায়, তবে ডানে-বামে ঘুরে কী করে প্রধান সড়কে উঠে পার হওয়া যাবে, এসবের বৃত্তান্ত থাকে তাদের কথায়।
মিশিগান থেকে ম্যারিল্যান্ডের ৮শ' মাইল পথ আমরা একবারে যাব না। তিনবারে যাব। মাঝখানে দুই রাত থাকব দুই শহরে, ফেরার পথেও তাই। কিন্তু যাব এক পথে, ফিরব আরেক পথে। এসবের জন্য এখন আর কারও পরামর্শ নেওয়ার দরকার হয় না। সেলফোনে ইন্টারনেট সুবিধা থাকা মানেই কিন্তু পুরো দুনিয়ার সব কিছুর খবর মুঠোর মধ্যে।
মিশিগানের সবচেয়ে কাছের রাজ্য ওয়াহিও। এরপর ক্লিভল্যান্ড, ফিলাডেলফিয়া এবং শেষ মাথায় ওয়াশিংটন ডিসি আর ম্যারিল্যান্ড। ওয়াহিওতে দেখার মতো কী আছে, এমন তালিকা ইন্টারনেটে পেয়েছি। কিন্তু এখান থেকে এক দুপুরে দেখে যাওয়ার মতো কী কী আছে জানার জন্য ফোন করি মোশতাককে।
মোশতাক ওয়াহিওর ডাক্তার। আমার ক্যাডেট কলেজের এক ব্যাচ জুনিয়র। সে আমাকে পরামর্শ দেয়_ আপনি আমিশপাড়ায় এক রাত থেকে পরের দিন এ অঞ্চলটা দেখতে পারেন।
আমি বলি, ডান। আর কী আছে?
সে বলে, ইরি হ্রদে এক বিকেল কাটাতে পারেন।
ইরি হ্রদ দেখা আছে। তুমি বলো, আই এম পাইর ডিজাইন করা একটা বিল্ডিং আছে ওয়াহিওতে, খুব নামকরা, এই বিল্ডিং কোথায় দেখি?
দালানকোঠা দেখার কথা শুনে আমার সঙ্গের দুই পুত্র মন খারাপ করে বলে ওঠে, ওসব দেখব না। উঁচা উঁচা দালান দেখার মধ্যে কী আছে, অন্য কিছু দেখি।
ইবন সেলফোন অন করে বসেছে। সে বলে, রক অ্যান্ড রোলের একটা মিউজিয়াম আছে, এটা কোথায় জিজ্ঞেস করো।
আমি সেলফোনের স্পিকার অন করে কথা বলি। মোশতাক জানায়, শাকুর ভাই, আপনার ছেলেরা কি মিউজিক লাভার?
আমি বলি, ভাই, গানের যন্ত্রণায় অস্থির আছি। পেছনের সিটে বড় ছেলে অবিরাম গিটার বাজাচ্ছে।
তাইলে ওই রক অ্যান্ড রোল মিউজিয়ামটা ওদেরকে দেখানো আপনার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। মজার কথা হচ্ছে, আপনি যে বিল্ডিংটার কথা বলছেন, সেটাই এই মিউজিয়াম। ওখানে চলে যান, বাপ-বেটাদের সবার সব কিছু দেখা হয়ে যাবে।
হিসেব করে দেখি, আমরা ওয়াহিওর সেই জায়গা থেকে ৫৫ মাইল দূরে আছি। যেতে লাগবে এক ঘণ্টা। কিন্তু জাদুঘরে ঢোকার দরজা বন্ধ হবে ৪টায়। আমরা কিছুই করতে পারব না। ঠিক হলো, এখন ঠিকই ওখানে যাব। ক্লিভল্যান্ড শহরটা দেখব এবং এর কোনায় হ্রদের পাড়ের সেই জায়গাটা দেখে চলে যাব আমিশ কাউন্টিতে সন্ধ্যাবেলা। পাঁচদিন পর যখন ফেরত আসব, তখন আবার এই রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম, দেখেই যাব। তারা আমার কথায় রাজি হয়ে গেল।
ফেরার পথে দুপুরবেলা আমরা এসে পেঁৗছাই ক্লিভল্যান্ডের এই সঙ্গীত জাদুঘরে। আমাদের চারজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাদের চালক-সঙ্গী বাবলু ভাই চলে যান গাড়ি নিয়ে। এই শহরে তার নিজস্ব কিছু কাজ আছে ঘণ্টা দুইয়ের জন্য। সেই ফাঁকে গাড়ি পার্কিংয়ের ঝামেলা থেকে আমরা বেঁচে যাই।
চত্বরটির সামনে দাঁড়িয়েই টের পাই, এমনি এমনি দালানটির এত নামডাক হয়নি। দুটি সমকোণী ত্রিভূজকে আড়াআড়ি করে এমনভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এটা দালান বা ভাস্কর্য, এক দৃষ্টিতে ঠিক বোঝা যায় না। দালানটির এক কোনায় তাকিয়েই বোঝা গেছে যে এটা চারদিক থেকে চার রকমের ব্যঞ্জনা তৈরি করা বিষয়। চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান স্থপতি আই এম পাই এ সময়ের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের একজন। প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামের নতুন সংস্কার কাজটা তিনিই করেছিলেন। সেখানেও কাচ দিয়ে পিরামিড বানিয়েছিলেন প্রবেশপথে। এখানেও সেই রকমের কাচের কাজ। কিন্তু পিরামিড সরাসরি নয়। একে টুকরা টুকরা করলে যা দাঁড়ায়, অনেকটা সেরকম।
আর স্থান নির্বাচনও ছিল যথাযথ। শহরের এক প্রান্তে, যেখান থেকে একটা সমুদ্রসমান হ্রদের সূচনা, তার প্রান্তে। আর এ জায়গাটিও কেন্দ্রীয় বাণিজ্য এলাকার সঙ্গে লাগানো। এই পুরো অঞ্চলটি খেলাধুলা আর নানা রকমের বিনোদনের জন্য ছেড়ে দেওয়া। আছে ইনডোর, আউটডোর স্টেডিয়াম, অডিটরিয়াম। তবে এই রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেইম চত্বরটি এমনভাবে বানানো যে, এর আশপাশ দিয়ে ছুটে চলা কারও পক্ষেই এ দালানটিকে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়। দালানের সামনে একটা বিশাল আকারের গিটার শুইয়ে রাখা। আর তাকে পেছন রেখে একটা সেলফি তোলা যেন সব পর্যটকের প্রথম কাজ। এর পাশে রাস্তার ওপর একটা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। দোকানটিকে প্রথমে মনে হবে কোনো কনসার্টের জন্য বানানো। একটা স্টেজ। একটু কাছে গেলে দেখা যাবে ১২ চাকার ওপর দাঁড়ানো একটা একটা বড় বাস। এই বাসেই খাবার রান্না হয়, জানালা দিয়ে খাবার সার্ভ করা হয়।
হল অব ফেইম ফাউন্ডেশনটি বেশিদিন আগের নয়। ১৯৮৩ সালে এটি গঠনের তিন বছর পরই এই জায়গাটিকে রক অ্যান্ড রোলের তীর্থভূমি করা হবে এমনটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে যখন এর দরজা খোলা হয়, সে বছরই প্রায় ১ কোটি লোক এটা দেখতে আসেন। ভবন আর জাদুঘরটি দেখতে আসা লোকের কাছ থেকে টিকিট বিক্রি করে তারা আয় করে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আমরা ছবি তোলার পর্ব শেষ করে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকি। ২৩ ডলারের টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে হয় জাদুঘরের ফ্লোর থেকে। তবে কেউ চাইলে জাদুঘরের ভেতরটা না দেখে স্যুভেনির শপগুলোও ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। জাদুঘরে যেসব অরিজিনাল জিনিসপত্র আছে, তার প্রায় সবকিছুরই রেপ্লিকা বানিয়ে বিক্রি হচ্ছে নিচে। কোনো গানের তারকা কী কাপড় পরতেন, তার নকল আছে কাপড়ের দোকানে। আছে তাদের ব্যবহৃত গানের যন্ত্রপাতির ডিজাইনে হুবহু বানানো যন্ত্র। যেমন এলভিস প্রিসলির একটা ছবিতে তিনি যে গিটার হাতে আছেন, সেই গিটার, সেই চশমা, সেই ছেঁড়া জিন্স বা টি-শার্ট বিক্রি হচ্ছে স্যুভেনির শপে।
তার পাশে ছবি তোলার দোকান। ১০ ডলার দিয়ে সবুজ পর্দার পটভূমিতে ছবি তোলা হবে। মিউজিয়াম দেখে ফেরত যাওয়ার সময় ফোল্ডারের ভেতর ছবি ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। সেই ছবিতে দেখা যাবে, পেছনের সবুজ রঙের বদলে এই মিউজিয়ামের একটা ছবি, মনে হবে, যেন ফার্স্টক্লাস লাইটিং করে এই ছবি তোলা হয়েছে।
এই গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে ২৩ ডলারে টিকিট কাটা দর্শনার্থীরা একটা চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবে নিচে, যেখান থেকে শুরু হবে মূল প্রদর্শনশালা। সাত স্তরের এই পুরো দালানের চারটি স্তরই নানা রকমের প্রদর্শনসামগ্রী দিয়ে সাজানো। প্রদর্শনশালার খুপরিগুলো ফটো সেনসেটিভ। আপাতভাবে দেখা যায় অন্ধকার। একটু কাছে গেলেই আলো জ্বলে ওঠে আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্ণনা। বর্ণনা শোনা আর প্রদর্শনসামগ্রী দেখা শেষ করে সরে গেলেই বাতি নিভে যাবে, বর্ণনাও থেমে যাবে। আবার পরের প্রকোষ্ঠে হাজির হলে একই রকম পরিবেশ পাওয়া যাবে। একে একে দেখা হয় বিট্ল্স দি রোলিং স্টোন, জিমি হেনড্রিক্স, এলভিস প্রিসলি এবং আরও কিছু বিখ্যাত রকস্টারের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। শোনা হয় তাদের কনসার্টের গানও।
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কিছুদূর পর পর ছোট ছোট বুথে কিছু হোম থিয়েটার লাগানো। সেখানে বসে দেখা যায় উনিশ শতকের কিছু ঐতিহাসিক কনসার্টও। তার পাশের হলে দেখি সেই আমলের পুরনো গিটার, তাদের কাপড়চোপড় আর রক অ্যান্ড রোলের শিকড় গসপেল, ব্লুজ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ফক, কাউন্ডি অ্যান্ড ব্লুজ গ্রাসের কিছু পুরনো আলোকচিত্রও।
জন লেনন এখানে সবচেয়ে সম্মানের সঙ্গে আছেন। ১৯৯৪ সালে এখানে তার প্রথম অভিষেক হয়। ১৯৬০ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে গঠিত হওয়া তার ব্যান্ড, বিট্স্স-এর স্টুডিওটাই যেন এখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে আছেন পল, হ্যারিসন এবং রিঙ্গোও। মোমের মূর্তিতে মূর্ত হয়ে আছেন তারা, যেন এখনই কোনো এক কনসার্টের ফাঁকে একটা স্রিদ্বল ক্যামেরার ইমেজে ফ্রিজ হয়ে আছেন। এর পাশাপাশি বিট্ল্স-এর রক স্টার রিঙ্গোর ড্রাম সেট, গিটার, পিয়ানোর পাশাপাশি তার ব্যবহৃত চশমা, পাসপোর্ট, হাতের লেখা, চিঠি, গান, এসবও এখানে খুব যত্ন করে সাজিয়ে রাখা। তবে দর্শনার্থীদের ভিড় এলভিস প্রিসলির কাউন্টারেই বেশি। তার মোমমূর্তির পাশে রাখা তার আইডি, ব্রেসলেট, মোটরসাইকেল আর কিছু ব্যবহৃত জিনিসপত্র।
আমি যেসব গান শুনি সে তালিকায় এই মহান শিল্পীরা না থাকার কারণে, আমার পক্ষে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না এই পরিসরে। কিন্তু আমার পুত্রযুগল মহা আনন্দে এলভিস প্রিসলির কাপড়চোপড়, গহনা আর তার বাদ্যযন্ত্র দেখতে থাকে। আমি ওদের সেখানে রেখে তাদের মাকে নিয়ে নেমে আসি নিচে। তাদের বেরোতে ঘণ্টাখানেক লাগবে। এ সময়টা কী করা যায়।
রক অ্যান্ড রোল মিউজিয়ামের পাশেই সবুজ ঘাস। তার মাঝখানে কতগুলো গাছ আছে। আমি একটা গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ি। সামনে সমুদ্রের মতো বিশাল জলরাশি। বিকেল হয়ে আসছে। মিশিগান ফেরার পথে আমাদের এখন যেতে হবে মোশতাকের বাড়ি। আমার বউ স্যুভেনির শপে ঢুকেছে, সস্তায় পাওয়া যায় কি-না, তা দেখে নিতে। আমি অপেক্ষা করি। পুত্রযুগল রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেইম দেখে কখন বেরোবে।