মামুনুর রশীদ

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য :১৯৪৮-১৯৭১

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮     আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

এক অদ্ভুত সময়ে আমার জন্ম হয়েছে। হিন্দুস্তান আর পাকিস্তানের জন্মলগ্নে। বুঝতেই পারিনি ব্রিটিশ শাসন কেমন ছিল। তবে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের সময় একদিকে আমার দাঁতের ব্যথা হলো আর অন্যদিকে শুনছি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই স্লোগান। মায়ের কোলে কাঁদতে কাঁদতে গ্রামের স্টু্কলঘরের মাঠে কিছু যুবকের আকাশছোঁয়া স্লোগান শুনছি। সেই স্লোগান পাকিস্তানের রাজধানী করাচি বা ঢাকা মেডিকেল কলেজে হয়তো পৌঁছায়নি, কিন্তু অনেক পরে ভেবেছি কী করে সারাদেশের স্লোগান একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটা সফল আন্দোলনের জন্ম দিল। এই প্রশ্নের জবাব ওই ঘটনার পরপরই পাওয়া গিয়েছিল, কারণ ভাষা আন্দোলনের পরপরই ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত অনেক ধরনের আন্দোলন, অনেক ধরনের রাজনীতির পালাবদল আমরা লক্ষ্য করেছি যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে। অনেক রাজনৈতিক নেতা কারারুদ্ধ হন এবং মধ্যযুগীয় কায়দায় রাজবন্দিদের বেত্রাঘাত করার নির্দেশ আসে। বেশকিছু রাজনীতিক নেতা এবং কর্মীকে অমানুষিক নির্যাতন ও বর্বরতার শিকার হতে হয়। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি, আইয়ুবের শাসনের কাছে মাথানত করেনি। ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন একটা প্রবল গতি নিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হয়। ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলন তার একটি বড় উদাহরণ। শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শরীফ কমিশনের রিপোর্টে ছিল যে, শিক্ষা সবার জন্য নয়, প্রকারান্তে শিক্ষা একটা পণ্য যাদের দরকার সেটা তারা ক্রয় করতে পারবে। একটি অত্যন্ত সামন্তবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবনার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হলো। এই সময় সেসব ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, যাদের হৃদয় ভয়শূন্য এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকার প্রশ্নাতীত। পৃথিবীব্যাপী তখন মুক্তির সংগ্রাম চলছে। একদিকে ভিয়েতনাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে অন্যদিকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্র্রো, চে গুয়েভারার কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। চীন রুখে দাঁড়িয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সোভিয়েট ইউনিয়ন পৃথিবীর যেখানেই মুক্তি সংগ্রাম চলছে সেখানেই এগিয়ে আসছে। পাকিস্তানের নিগড় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে প্রবল জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এই সময়ে পাকিস্তান সরকার ১৯৪৮ সালের ভাষার প্রশ্নে যে রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তেমনি রবীন্দ্রনাথকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, সংস্কৃতিসেবী সবাই প্রতিবাদী হয়ে উঠল।

ষাটের দশক আমাদের অধ্যয়নকাল।

এই সময়েই ছাত্র সংগঠনগুলোর যারা নেতা তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাই আপসহীন। যারা পাকিস্তান সরকারের লেজুড়বৃত্তি করত তারা সবারই ঘৃণার পাত্র ছিল। তাদের সঙ্গে নূ্যনতম সম্পর্কও রাখত না অন্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীরা। আবার জাতীয় স্বার্থে সবাই এক। মওলানা ভাসানীর উদাত্ত কণ্ঠ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের আপসহীন কণ্ঠস্বর যেমন আছে তেমনি আছে কমিউনিস্ট নেতাদের জেল-জুলুম উপেক্ষা করে গ্রামগঞ্জে, শহরে পদচারণা। কেউ কেউ তখন জেলে আবার কেউ কেউ গা-ঢাকা দিয়ে পার্টির কাজ করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বিপুল-বিশাল কর্মী বাহিনীকেও দেখা গেছে। দেখা গেছে ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিকের এক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম।

আমার বাল্যকালের একটি স্মৃতি, আমাকে এখনও নাড়া দেয়। মূল ঘটনাটি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কারণ আমি একেবারেই বালক। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের কাগমারিতে একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। টাঙ্গাইল শহরে ঢাকা থেকে যাওয়ার ভালো রাস্তা ছিল না, আসতে হতো ময়মনসিংহ হয়ে। ওই কাঁচা রাস্তা দিয়ে এবং ময়মনসিংহ ঘুরে সারাদেশ থেকে লাখ লাখ কর্মী-জনতা, শিল্পী-সাহিত্যিক উপস্থিত হয়েছিলেন। সংগঠক হিসেবে মওলানা ভাসানীর অসাধারণ ক্ষমতা সেই দিনগুলোতে প্রমাণিত হয়েছিল।

কমিউনিস্ট নেতা নূরুল হক চৌধুরী (কমরেড মেহেদী) তার এক স্মৃতিচারণে বলেছেন :

'আমি ডেলিগেট হিসেবে সম্মেলনে যোগদান করেছিলাম। টাঙ্গাইল ঢুকেই দেখি হযরত মোহাম্মদ তোরণ, তারপর তোরণ আর তোরণ। গান্ধী তোরণ, মওলানা মোহাম্মদ আলী তোরণ, নজরুল তোরণ, ইকবাল তোরণ, নেতাজী সুভাষ বসু তোরণ, হাজী শরীয়ত তোরণ, তিতুমীর তোরণ, নেহেরু তোরণ, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন তোরণ, সি আর দাস তোরণ, লেনিন তোরণ, স্ট্যালিন তোরণ, মাও সে-তুং তোরণ, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, বায়রন, শেলী, হালী, রুমী, ইমাম আবু হানিফা, গাজ্জালী তোরণ।' টাঙ্গাইল থেকে সন্তোষ পর্যন্ত মোট ৫১টি তোরণ। সর্বশেষ আর সর্বপ্রথম তোরণ ছিল কায়েদ-ই-আযম তোরণ। সন্তোষ পৌঁছে দেখি এলাহী কাণ্ড। মনে হলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী সাময়িকভাবে সন্তোষে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানসহ সব প্রাদেশিক মন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ সব বাঙালি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন। মন্ত্রীদের জন্য সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল তাঁবু। মন্ত্রীদের তাঁবুতে বসে নিজ নিজ দপ্তরের কিছু কিছু কাজ করতেও দেখা যায়, অস্থায়ী শতাধিক ছনের (খড়ের) দোচালা ঘর তোলা হয়েছিল। ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই প্রত্যেক জেলার কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের জন্য। সন্তোষে কয়েক লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল এবং সম্মেলন চলছিল ছয় দিন। (সাংস্কৃতিক ও আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনসহ)। লাখ লাখ লোকের পানি ও পায়খানার যে সুবন্দোবস্ত করেছিল তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। লাখ লাখ লোকে ছয় দিনব্যাপী পায়খানা-প্রস্রাব করেছে কিন্তু কোনো দুর্গন্ধ পেয়েছে এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।

গোটা সন্তোষকে বিদ্যুতায়িত করা হয়েছিল। টেলিগ্রাম, টেলিফোন, সেক্রেটারি অফিসসহ বহু অফিস বসেছিল অস্থায়ীভাবে। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করা হয়েছিল। খাওয়া-দাওয়া ব্যবস্থাপনার কথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাটির পরিখা কেটে চমৎকারভাবে চুলা তৈরি করা হয়েছিল। একাধারে ছয় দিন ছয় রাত চুলার আগুন নেভেনি।

একস্থানে জমা করেছিল হাজার হাজার মাটির বাসন। একটা বাসন নিয়ে ভাতের স্তূপ থেকে ইচ্ছামতো ভাত নিয়ে এগিয়ে গেলে ডালের নৌকায় ডাল পাক করে বড় বড় নৌকাভর্তি করে রাখা হয়েছিল কাছেই, বড় বড় হাতা নিয়ে প্রতিটা নৌকার কাছে স্বেচ্ছাসেবকরা দাঁড়িয়েছিল, ভাতের বাসন এগিয়ে দিতেই এক টবগা ডাল দিয়ে দিত স্বেচ্ছাসেবক। খাওয়া শেষ করে পানির কলের কাছে গিয়ে বাসনটা পরিস্কার করে ধুয়ে যথাস্থানে রেখে দিতে হতো। কোনো হৈহুল্লোড় নেই, সবাই চলেছে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে। এই কাগমারি সাংস্কৃতিক সম্মেলনেই মওলানার দূরদর্শী বাণী উচ্চারিত হয়। যেখানে তিনি বলেন, আসসালামু আলাইকুম- অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসনকে বিদায়ী সূচক বক্তব্যের সূচনা করেন।

এরপর ষাটের দশকে ছাত্রনেতাদের কথা বলেছি। নির্লোভ এবং নিজ নিজ রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এসব নেতৃবৃন্দ ছিল একশ'ভাগ ধর্মনিরপেক্ষ। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তোলার পক্ষে তারা ছিলেন দৃঢ় সংকল্প। গণমাধ্যমে যারা কাজ করতেন তারাও এই আদর্শের প্রতি ছিলেন অনুগত। যারা ছিলেন না তারা হতেন ঘৃণার বস্তু এবং হয়ে থাকতেন একঘরে। আইয়ুবের মুসলিম লীগের শাসন থাকলেও মূলত তা ছিল সেনাশাসন। সমাজজীবনে তার তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। মৌলিক গণতন্ত্রের সেই স্বৈরাচারী গণতন্ত্র মূলত ছিল সামরিক শাসন এবং কিছু বশংবদ রাজনীতিবিদদের আমল। এই সময় একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রার্থী আইয়ুব খান তার বিরুদ্ধে একটা প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে। আইয়ুব শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে এই নির্বাচনে জনগণ ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে থাকলেও মৌলিক গণতন্ত্রীরা যাদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে তারা আইয়ুবকেই নির্বাচনে জয়ী করেন। এই একটি উত্তাল সময় আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। নির্বাচনে জনগণ পরাজিত হলো।

কিন্তু আন্দোলন থামল না। সেই আন্দোলন একটি প্রবল ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হয়। শরীফ কমিশন ও হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল। এর মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের ছয় দফা প্রণয়ন করেন। ছাত্র আন্দোলনটি ক্রমান্বয়ে কৃষক শ্রমিকের এবং জনতার আন্দোলনের সঙ্গে মিশে এক প্রবল গণআন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। এই সময়ে মওলানা ভাসানী কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় সমাবেশের আয়োজন করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা ছুতোয় শেখ মুজিবসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনীতিককে গ্রেফতার করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি মিথ্যা মামলায় শেখ মুজিব এবং বেশকিছু বাঙালি সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। সেই ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের সংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছে যায়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী অভ্যুত্থানকে আমরা প্রত্যক্ষ করি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তরা সবাই একে একে মুক্তি পেয়ে যান, আইয়ুব খান ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু তিনিও ক্ষমতা হস্তান্তর করেন আরেক নিষ্ঠুর সেনাশাসকের কাছে। ইয়াহিয়া খান একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন, যে নির্বাচনে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু বিজয়ী হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারল না আওয়ামী লীগ। কৃষক-ছাত্র-জনতার এক অদম্য প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র বানচাল হতে থাকে। সেই সময়ের সাহসী মানুষদের দেখেছি, দেখেছি পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর জনসভায় মানুষের ঢল। ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতায় মরণপণ করা বাঙালি জাতির উত্থানকে দেখেছি। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর বাংলার গ্রামগঞ্জে অনেক নির্ভীক মানুষের বীর হয়ে ওঠার ঘটনা দেখে স্তম্ভিত হয়েছি। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য জেনে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক অসম সাহসী বাঙালি জাতির জন্ম হয়।

লেখক



নাট্যব্যক্তিত্ব