রাশেদা কে চৌধুরী

স্বপ্নকে সঙ্গী করে

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

আমার এক পরিচিত। শিশুকে প্রথম স্কুলে দিয়েছে। রাজধানীর একটি মিশনারিজ স্কুলে। প্রথম কয়দিন শিশু খুব আনন্দ সহকারে স্কুলে গেল। কিন্তু বাদ সাধে মাস দুয়েক পর। শিশুটি আর স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলে যাবার কথা শুনলেই সকালে বাসাটাকে প্রলয়ংকরী বানিয়ে ফেলে। কোনোভাবেই সেই চার বছরের ছোট্ট শিশুটিকে স্কুলমুখী করা যায় না। মায়ের তো আক্ষেপ, কেন তারা শিশুটিকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেন না! বাংলা মাধ্যমে পড়ার অনেক চাপ। পড়ার ভয়ে শিশুটি স্কুলে যেতে চাইত না। শিশুটির অভিভাবক যখন স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করল, তারা শিশুটিকে পড়ার জন্য একটু চাপ কম দিতে বললে অধ্যক্ষের জবাব হয়- 'আপনারা তো আর বিদেশে থাকেন না যে বিদেশি সিস্টেমে সন্তানকে পড়াশোনা করাবেন। যেহেতু বাংলাদেশে আছেন তাই এখানকার মতো করেই সন্তানকে পড়াতে হবে।'

এটা একটি স্কুলের অধ্যক্ষের কথা। আমাদের অভিভাবকরা আসলে স্কুলের চাপে অনেক সময় চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। আর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর কথা না হয় না-ই বললাম।

আর সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির নামে যে পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তা দ্বারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমুখ, জ্ঞানবিমুখ, পাঠবিমুখ করে তোলা হচ্ছে। কে চেয়েছেন এই পরীক্ষা পদ্ধতি? শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, লেখক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা কে? এখন তো এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টিও। ক্রমাগত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন দেখা দেয়। প্রতিকার হয় না।

বাংলাদেশের বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার যে ধারায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পাঠ্যপুস্তকের জোগান দেয়, তা মূলধারার শিক্ষা বলে অভিহিত। এটা বাংলা মাধ্যমে চলত। এখন এ ধারাকে দুই শাখায় বিভক্ত করে ইংলিশ ভার্সন নামে নতুন শাখা চালু করা হয়েছে। সরকার ঘোষণা না দিয়ে এ ধারায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধারার শিক্ষাকে যে কোনো উন্নত রূপ ও প্রকৃতি দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো লক্ষণই আমরা খুঁজে পাই না। সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণের জন্য বিশেষ তৎপর। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ইংলিশ মিডিয়ামে পরিচালিত 'ও' লেভেল, 'এ' লেভেল বাংলাদেশে ভালোভাবেই চলছে। তার ওপর প্রবর্তন করা হয়েছে ইংলিশ ভার্সন। অবহেলিত হয়ে চলছে মূলধারার বাংলা মাধ্যমের শাখা। সরকার শিক্ষা, জাতি ও রাষ্ট্র নিয়ে কী চায় বোঝা যায় না। জাতীয় জীবনে কাজকর্মের মধ্যে সরকারের চরিত্র-রাজনৈতিক চরিত্র তলিয়ে দেখা একান্ত দরকার।

আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলাম। সেটা যেমন ছিল আমাদের সংস্কৃতিতে, তেমন আমাদের সামাজিক-পারিবারিক জীবনেও প্রভাবিত হতো। কিন্তু সেই অসাম্প্রদায়িক বেড়াজাল থেকে ধীরে ধীরে আমরা কেমন যেন একটা খোলসের মধ্যে আটকে ফেলছি নিজেদের। সেটা আমাদের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমনটা দেখা যায়, তেমনি আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও।

শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র ক্ষমতাধীনে প্রবর্তিত একটি ব্যবস্থা। বাংলাদেশে প্রচলিত বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সরকার প্রবর্তিত ব্যবস্থা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত বিভিন্ন আদর্শিক শ্রেণি কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রবর্তিত ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশে প্রচলিত এ ব্যবস্থাটি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। জাতীয় শিক্ষানীতিতে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ দুটি ধারার অস্তিত্ব রয়েছে বলে বিবৃত রয়েছে। একটি দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজি শিক্ষা- এ তিনটি ধারায় বিভক্ত বলে দেখানো হয়েছে। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা- এ দুটি ধারায় বিভক্ত বলে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিত ধারা বিভক্ত এ শিক্ষাব্যবস্থা উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সাধারণ শিক্ষাকে মূল ধরে অন্য শিক্ষাকে ভিন্ন বলে দেখানো হয়েছে।

এ বিভিন্নতাকে জাতীয় শিক্ষানীতিতে এভাবে দেখানো হয়েছে বটে, একে অন্যভাবে দেখারও সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা মাধ্যমের ভিন্নতার কারণে সূচিত শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ধারাগুলো হলো- ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম ও আরবি মাধ্যম। মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে সূচিত শিক্ষাধারার বিভিন্ন শিক্ষাধারাগুলো হল- আধুনিক শিক্ষাধারা, কারিগরি শিক্ষাধারা ও ইসলামী শিক্ষাধারা। প্রচলিত বিভিন্ন ধারার শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে এসেছে। কারণ ধারাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে দেশে যেমন সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিরসন হবে, তেমনিভাবে শিক্ষা খাতে অপব্যয়ও হ্রাস পাবে। উপরন্তু দেশ পাবে একটি গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। তবে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের কাজটি দেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে শুরু হলেও অদ্যাবধি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা যায়নি, উপরন্তু অনিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষাব্যবস্থার এ সমস্ত বিভিন্ন ধারা আরও অনেক উপধারায় পল্লবিত হয়ে উঠেছে। কাজেই এ সমস্ত শিক্ষা ধারার বর্তমানে যে কতগুলো উপধারা রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। তবে জাতীয় ঐক্য সাধনের জন্য জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা যে অতি জরুরি, সে বিষয়ে শিক্ষাবিদরা একমত।

জনসাধারণের অজ্ঞতাই সরকারের শক্তির ভিত্তি। সরকার এটা জানে। এ জন্য সব সময়ই সরকার প্রকৃত জ্ঞান বিস্তারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখে। এ সত্য এখন আমরা উপলব্ধি করেছি। সরকার কাজ করে যাচ্ছে জনসাধারণকে অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখার জন্য। এ অবস্থায় সরকার দেশে জ্ঞান বিজ্ঞানের যে ভান করে চলছে, কোনো ক্রমেই তাকে চলতে দেওয়া যায় না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, একাডেমি নানা ধরনের অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখার কাজই করছে। ভালো তখনই ভালো, যখন তা প্রকৃতপক্ষেই ভালো এবং জ্ঞানও তখনই জ্ঞান, যখন তা প্রকৃতপক্ষেই জ্ঞান। যখন দেখি, অনুপ্রাণিত নিস্কাম লোকদের প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন গভীর দুঃখ অনুভব করি। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি যে, মহৎপ্রাণ জ্ঞানী লোকরা সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শক্তি ক্ষয় করেন কিন্তু সংগ্রামে তাদের শক্তি অপচিত হয় মাত্র এবং তাদের প্রয়াস শেষ পর্যন্ত সরকার যা করতে চায় তারই অনুকূলে যায়। যে অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা চলছি, তাতে মনে হয়, ঠিক কাজটি নীরবে ধৈর্যের সঙ্গে করে যাওয়াই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। আমরা যা করতে চাই, তাতে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার কোনো দরকার নেই। কেবল সরকারের অনুমোদন পরিহার করাই যথেষ্ট নয়, আমাদের কাজ করতে হবে সরকারের সাহায্য-সহযোগিতাও পরিহার করে।

বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। পর্যায়ক্রমে করতে হবে। টলস্টয়ের পর্যবেক্ষণ অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তারপরও সংস্কারের জন্য কাজ করতে হবে। সারা দেশের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা যদি ন্যায়-নিষ্ঠার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে কাজ করেন, তাহলে জনজীবনে তার সুফল দেখা দেবে। আমি আশা করব আমার দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, আমার দেশ সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটবে।

লেখক



নির্বাহী পরিচালক

গণসাক্ষরতা অভিযান

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে জয়-পরাজয়ে যত ফ্যাক্টর

সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে জয়-পরাজয়ে যত ফ্যাক্টর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯ আসন নিয়ে পুলিশের ...

টি২০-তেও দারুণ চমকের অপেক্ষা

টি২০-তেও দারুণ চমকের অপেক্ষা

দূরে মাইকে কোথাও বেজে চলেছে বিজয় দিবসে কচিকাঁচার কণ্ঠে আমার ...

সরব বাবলা, নীরব সালাহ উদ্দিন

সরব বাবলা, নীরব সালাহ উদ্দিন

ঢাকা-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে আছেন মহাজোটভুক্ত জাতীয় পার্টির ...

২৭ লাখ নারী ভোটার নিয়ে বিশেষ কৌশল ৩২

২৭ লাখ নারী ভোটার নিয়ে বিশেষ কৌশল ৩২

চট্টগ্রামের বন্দর-পতেঙ্গা আসনে ৫ লাখ ৮ হাজার ভোটারের প্রায় অর্ধেকই ...

রক্তিম অলরেডসে রং চটা ম্যানইউ

রক্তিম অলরেডসে রং চটা ম্যানইউ

কোন দলের রং বেশি লাল। রেড ডেভিলস নাকি অল রেডসদের। ...

আ স ম রবের নির্বাচনী অফিসে তালা, ভাঙচুরের অভিযোগ

আ স ম রবের নির্বাচনী অফিসে তালা, ভাঙচুরের অভিযোগ

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বড়খেরী ও চরগাজী ইউনিয়নে আ স ম ...

শিক্ষামন্ত্রীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন সমশের

শিক্ষামন্ত্রীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন সমশের

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বিকল্পধারা বাংলাদেশ মনোনীত ...

ড. কামাল নীতিহীন: তোফায়েল

ড. কামাল নীতিহীন: তোফায়েল

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ...