১৯৭১ ফরিদপুর :বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুজিব বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে বিভিন্ন থানায় মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়োল্লাস করতে করতে ফরিদপুর শহর অভিমুখে অগ্রসর হয়। পরদিন সকাল ৭টায় ক্যাপ্টেন বাবুলের নেতৃত্বে বিরাট বাহিনীসহ ভাঙ্গা, নগরকান্দা ও মুকসুদপুর (গোপালগঞ্জ) থেকে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা বাখুন্ডা ব্রিজ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। তখন ক্যাপ্টেন বাবুল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের আহ্বান সংবলিত তার স্ব্বাক্ষরিত একটি চিঠিসহ দু'জন মুক্তিযোদ্ধাকে ফরিদপুরে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যশোর ক্যান্টনমেন্টের রিয়ার হেডকোয়ার্টার প্রধানের (ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর জাহানজেব আরবার) কাছে প্রেরণ করেন এবং সার্কিট হাউসের পাকবাহিনীর কার্যালয়ে জনৈক পাকসেনা কর্মকর্তার কাছে তারা চিঠিটি হস্তান্তর করেন। তিনি কিছুক্ষণ পরে জানান, তারা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না। তখন ক্যাপ্টেন বাবুলসহ কয়েক সহস্র মুক্তিযোদ্ধা ফরিদপুর শহর সংলগ্ন ভাঙ্গা রাস্তার মোড়ে এসে সমবেত হয়। বোয়ালমারী কোতোয়ালির আরও সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা এসে মিলিত হয়। সবাই ভারতীয় বাহিনীর জন্য অপেক্ষায় থাকে।

সকাল ১০টায় চার্লি সেক্টরের অধীন ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুরে মিত্র বাহিনীর অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ্রনাথ পঞ্চম মারাঠা রেজিমেন্টের কর্নেল টরপি, মেজর করম বাইয়া, মেজর চক্রবর্তীর সঙ্গে ক্যাপ্টেন বাবুল, আজিজ মোল্যাসহ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য ও সমবেত জনগণ জয় বাংলা, জয় ভারত, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক ইত্যাদি স্লোগান ও উল্লাসে ফেটে পড়ে।

চরটেপুরাকান্দি যুদ্ধ : যশোর পতনের পর রাজবাড়ীর বিহারি, রাজাকার ও মিলিশিয়াদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। ১৩ ডিসেম্বর বিহারি ও মিলিশিয়ারা তাদের পরিবার-পরিজনসহ গোয়ালন্দে সমবেত হয় এবং পরে পদ্মার পাড় দিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। এ খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার মোকারম গ্রুপের ১৫-২০ জন মুক্তযোদ্ধা তাহের দেওয়ানের নেতৃত্বে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গেলে তারা বিহারি-মিলিশিয়াদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায় এবং গুলিবিনিময় চলতে থাকে।

ওই খবর পেয়ে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা মেজবাহউদ্দিন খান মিরোজ, নীতিভূষণ সাহা প্রমুখের নেতৃত্বে সম্মিলিতভাবে তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। তাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তারা গুলি চালাতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর দুপুর থেকে ১৭ তারিখ দুপুর পর্যন্ত ব্যাপক গুলিবিনিময় হয়। ১৭ তারিখে ফরিদপুর শহর এবং ভাঙ্গা, নগরকান্দা ও চরভদ্রাসন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা যোগদান করেন।

হাজার হাজার জনগণের গগনবিদারি জয় বাংলা স্লোগান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবৃষ্টির মুখে বিহারি-মিলিশিয়ারা আত্মসমর্পণ করেন। ওই যুদ্ধ সিঅ্যান্ডবি ঘাটের মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউনুস শহীদ হন। অন্যদিকে কয়েকশ' বিহারি-মিলিশিয়া নিহত হয়। আত্মসমর্পণকারী বিহারি-মিলিশিয়ারা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়।

ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরবর্তী পটভূমিতে ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের রাজবাড়ীর বিহারি-মিলিশিয়াদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাই তারা বারবার তাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, আত্মসমর্পণকারীদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কিন্তু তারা আত্মসমর্পণ না করে দু'দিন যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এর কারণ, তারা নিজেরাই আশ্বস্ত হতে পারছিল না। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে এসব বিহারি-মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরা অবর্ণনীয় নির্যাতন, গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও লুটপাট করেছে। তাদের ধারণা ছিল, আত্মসমর্পণ করলে তারা ক্ষমা পাবে না। তাদের এই মনোভাবের জন্য বিজয়ের পরও এই রক্তক্ষয়ী ও মর্মান্তিক যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়।

হানাদারমুক্ত ফরিদপুর : ১৭ ডিসেম্বর ফরিদপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও টেপুরাকান্দিতে বিহারি ও পাক মিলিশিয়ারা নতুন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। ভাটিয়াপাড়ায় পাকসেনাদের বিরাট একটি দল আত্মসমর্পণে রাজি হচ্ছিল না। ফরিদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল। ভাটিয়াপাড়ায় পাকসেনাদের আত্মসমর্পণ কিংবা পুরোদস্তুর পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়োল্লাস পালন করতে পারছিল না। ভাটিয়াপাড়ায় তখনও প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। এ যুদ্ধ আগেই শুরু হয়েছিল। ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়ায় লে. সিদ্দিকীর বাহিনীর সঙ্গে ১২ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর সংঘর্ষ চলছিল। মুক্তিবাহিনীর অবস্থা আশঙ্কাজনক জানতে পেরে মেজর নাজমুল হুদা অবিলম্বে তার বাহিনী নিয়ে ভাটিয়াপাড়া পৌঁছে যান। এই মুক্তিবাহিনী ১৪ ডিসেম্বর পাকসেনাদের অবস্থানের ওপর প্রচণ্ডগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই আক্রমণে এফএফ বাহিনীর বহু সদস্যও অংশগ্রহণ করে। মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে ১৮ ডিসেম্বর ১৫০ জন পাকিস্তানি অফিসার ও সাধারণ সৈনিক মেজর নাজমুল হুদার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সেদিনই যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনাসহ পুরো ৮নং সেক্টর এলাকা হানাদারমুক্ত হয়। া