এমন হত্যাকাণ্ড আগে কখনও ঘটেনি

চারপাশে রক্ত আর লাশ

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

গোলাগুলির শব্দ শুনে ভেবেছিলাম, কোথাও বাজি ফুটছে। এরপর ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পাঁচিল টপকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাই। দেখতে পাই, প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। পড়ে আছে নিথর দেহ। চারপাশে রক্ত আর লাশ। এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী। তার মতো আরও অনেকের বর্ণনায় উঠে এসেছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলার ভয়াবহতা। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।

শুক্রবার ডিনস এভিনিউয়ের আল নুর মসজিদে কয়েকশ' মানুষ সমবেত হয়েছিলেন জুমার নামাজ আদায়ে। একইভাবে লিনউড মসজিদেও সমবেত হয়েছিলেন মুসল্লিরা। আল নুর ও লিনউড মসজিদের ভেতরে ও বাইরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য প্রেস ও নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাদের বর্ণনায় ভয়ঙ্কর দুপুরটির চিত্র।

আনোয়ার আল সালেহ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আল নুর মসজিদে হামলার সময় সেখানকার ছোট অজুখানায় ছিলেন তিনি। হাত ধোয়ার সময় হঠাৎ করেই গুলির আওয়াজ শোনেন। বাইরে প্রচ চিৎকার। আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে মানুষ। এর মধ্যে শুনতে পান হামলাকারী আক্রোশে বলছে, আজ তোদের সবাইকে খুন করব। অজুর ঘরে বসেই জরুরি সেবায় ফোন করেন তিনি। ঘটনার ২০ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। আনোয়ার জানান, গুলি খেয়ে আহত মানুষগুলো বন্দুকধারীর কাছেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। তবে তাদের আবারও গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বন্দুকধারীরা। তিনি বলেন, এদের সন্ত্রাসী বললে কম বলা হয়, এরা ঠাণ্ডা মাথার ভয়ঙ্কর খুনি।

অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী সেখানকার সংবাদপত্র ক্রাইস্টচার্চ প্রেসকে বলেছেন, তার স্ত্রী মারা গেছেন। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, তার ওপরেও মৃতদেহ এসে পড়ে। মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামে এক ব্যক্তি নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে জানান, গুলি শুরুর সময়ে তিনি আল নুর মসজিদের ভেতরেই ছিলেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন বৈদ্যুতিক শক লেগেছে কিন্তু তারপরই মানুষ দৌড়াতে শুরু করে। ভেতরে তখনও তার বন্ধুরা রয়ে গেছে বলে জানান তিনি। অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, সামরিক কায়দার জ্যাকেট ও হেলমেট পরা হামলাকারীরা বন্দুক নিয়ে হামলা চালায়।

১৪ বছরের এক কিশোর জানায়, তার চাচাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে বন্দুকধারী। লেন পানাহ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, কালো কাপড় পরা এক ব্যক্তিকে

মসজিদে ঢুকে অসংখ্য গুলি ছুঁড়তে দেখেছেন। এরপরই সেখান থেকে মানুষ পালাতে শুরু করে।

দ্বিতীয় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে লিনউড মসজিদে। ওই ঘটনা প্রসঙ্গে সায়িদ আহমেদ জানান, ছদ্মবেশ ধারণকারী এক হামলাকারী মোটরসাইকেলে হেলমেট পরে মসজিদে ঢুকে হামলা শুরু করে। তিনি হামলাকারীকে চিৎকার করতে শুনেছেন তবে তিনি কী বলছিল তার অর্থ বুঝতে পারেননি বলে জানান।

এদিকে, বিশ্বের যে কোনো দেশের মতোই নিউজিল্যান্ডেও যে খুনখারাবি হয় না, তা নয়। কিন্তু শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার মতো এমন ব্যাপক হত্যাকাণ্ড দেশটিতে আর কখনও হয়নি বললেই চলে। বিশেষ একটি স্থানে এরকম টার্গেট হত্যাকাণ্ড আর কখনও হয়নি দেশটিতে। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের।

২০১৭ সালে সারা নিউজিল্যান্ডে ৩৫ ব্যক্তি খুন হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে হত্যা বা খুনের সংখ্যা কখনই দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছায়নি। কেবল ২০০৯ সালে নিহত হয়েছিলেন ১১ জন। কিন্তু শুক্রবারের ওই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড রীতিমতো হতবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনা।

নিউজিল্যান্ডে নাগরিকদের হাতে অস্ত্র থাকে। সুইজারল্যান্ডের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান স্মল আর্মস সার্ভে তাদের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির ৪৬ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ১২ লাখ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র বহন করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিউজিল্যান্ডে বৈধ অস্ত্রধারীদের মধ্যে যখন-তখন অস্ত্র চালানোর নজির নেই।

নিউজিল্যান্ডে এর আগে ১৯৯০ সালে এক স্থানে বড় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সমুদ্র উপকূলীয় শহর আরামোনায় প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ার সুবাদে এক ব্যক্তি গুলি চালালে এক শিশুসহ ১৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর দেশটিতে অস্ত্র আইন অনেকটা কঠোর করা হয়। সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা সেমিঅটোম্যাটিক অস্ত্র রক্ষণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেশটির সরকার।