বঙ্গবন্ধু ও যুবসমাজ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৯

ড. মোহীত উল আলম

বাংলাদেশের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল) ফেসবুকে ছাত্রসমাজের শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি বলেছেন, যুবসমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা ও সদস্যদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করে তিনি চরম উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। সেটি হচ্ছে, ছাত্রলীগসহ শিক্ষার্থী যুবসমাজ জ্ঞানচর্চার দিকে ধাবিত না হয়ে হুজুগে রাজনীতি ও স্লোগাননির্ভর কর্মধারায় মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে তিনি মনে করছেন, এই অপপ্রক্রিয়ায় সংশ্নিষ্ট হয়ে ছাত্রসমাজ তাদের মাহেন্দ্রক্ষণকে বাজেভাবে নষ্ট করছে। তারা পড়ালেখা ছেড়ে টেন্ডার ব্যবসাসহ লেজুড়বৃত্তিতে অকাতরে জড়িয়ে পড়ছে। উপমন্ত্রীর এই উপলব্ধির সঙ্গে সমাজের সচেতন অংশ কমবেশি সবাই একমত পোষণ করেছে। সেভাবে লাইকও পড়েছে, মন্তব্যও এসেছে।

আজকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ৪৪ বছর পার হলো। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ যে অবস্থানে ছিল এখন আর সে অবস্থানে নেই। তাঁরই সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তৃতীয় কাতার থেকে দ্বিতীয় কাতারে পৌঁছে গেছে। ১৬ কোটির ছোট্ট দেশটি এখন সার্বিক দারিদ্র্যের চেহারা বদলে ফেলতে পেরেছে। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষা উপমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণের আলোকে বঙ্গবন্ধু ঠিক যুব ও ছাত্রসমাজ নিয়ে কী চিন্তা করেছিলেন, তার একটা সাক্ষ্য তুলে ধরা।

১৯ আগস্ট, ১৯৭৩-এ ঢাকায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, '১৯৪৮-৪৭ সালে আমরা কিছু কিছু সংগ্রাম শুরু করলাম। '৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত করে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে ধারণা তা স্পষ্ট হয়ে গেল। ১৯৪৮ সালে তারা আমার ভাষা, আমার কৃষ্টির ওপর আঘাত করল। বাংলাভাষাকে ভুলিয়ে আমাদের উর্দু শেখানোর চেষ্টা করল। জিন্নাহ সাহেবকে ঢাকায় আনা হলো। এই রেসকোর্স ময়দান যখন নাম ছিল এখানে বক্তৃতা করে জিন্নাহ সাহেব বলেছিলেন, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। তার বিরুদ্ধে কথা বলা তখন বড় সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল। মাথা থাকত কি-না জানতাম না। প্রতিবাদ করেছিলাম আমি ওখানে দাঁড়িয়ে, প্রতিবাদ করেছিল বাংলার ছাত্রসমাজ সেই যুগে, প্রতিবাদ করেছিল বুদ্ধিজীবী সমাজ। জনগণ তখন বুঝতে পারে নাই, আমাদের ওপর হলো অত্যাচার। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ করে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। ৯ ঘটিকার সময় আমি গ্রেফতার হয়ে যাই, আমার সহযোগীরা গ্রেফতার হয়ে যায়।' বঙ্গবন্ধুর এ থিসিসটা হলো বাংলাদেশ উজ্জীবনের প্রথম সূত্র। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বভিত্তিক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উপনীত হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এ আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ছিল নেতৃত্বে এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার যোগ্য নেতা। দেশ গড়ার কাজে তরুণ প্রজন্ম তথা ছাত্রলীগকে নিজেদের উজাড় করার জন্য তিনি আহ্বান জানান : 'ছাত্র ভাইয়েরা ও বোনেরা, খেয়েদেয়ে শুয়ে পোড়ো না। তোমরা আমার ছেলেরা তোমরা আমার ছেলের মতো। শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। আমি তোমাদের শাসন করতে চাই, সোহাগও করতে চাই। তোমাদের আত্মসমালোচনা কর, আত্মসংযম কর, তারপরে আত্মশুদ্ধি কর, তারপরে রাস্তায় নামো মানুষ বুঝবে, মানুষ ভালো বাসবে, মানুষজন তোমাদের সাথে যোগ দিবে। নাইলে হবে না।'

পুরো ভাষণটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বিস্তৃত এবং বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে ছাত্রমহলের কাছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও তার থেকে শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের দেশ গড়ার সংগ্রামের কথা বলছেন। এ সংগ্রামটা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষানীতি, ভৌত সুবিধাদি, মেধা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক অবস্থানের সরাসরি সম্পর্ক। দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের একটি উপায় মেধা এবং শ্রম দিয়ে লেখাপড়ায় উন্নতি করে জীবিকা অর্জনের পথে সফলতা লাভ করা। আবার সামান্য সচ্ছল কিংবা সম্পূর্ণ সচ্ছল পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকেও লেখাপড়ায় উন্নতি করে জীবনে সফল হওয়া যায়। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান চরিত্র হলো মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা না জাগিয়ে দুষ্ট অহংবোধ তৈরি করা। এ জন্য দেখা যায়, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে মেধা ও শ্রম দিয়ে লেখাপড়ায় উন্নতি করে ভালো চাকরি করে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই অধিকাংশ শিক্ষিত লোকের আরাধনা হয়। এ গোত্রভুক্ত লোকেরা, তারা ধনী হোক, গরিব হোক বা মধ্যবিত্ত হোক, কেবলই আত্মোন্নয়ন মানসিকতায় পরিপুষ্ট থাকে বলে এদের সঙ্গে মানবিক শিক্ষা, সমাজসেবা বা দেশপ্রেমের সম্পর্ক ততটুকুই থাকে, যতটুকু আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। এদের দক্ষতা আছে কিন্তু একান্ত স্বার্থসংশ্নিষ্ট চিন্তায় নিয়োজিত থাকে বলে এদের মধ্যে প্রচুর সাধারণ বোধবুদ্ধির অভাব লক্ষ্য করা যায়। এদের মেধার প্রয়োগ হচ্ছে শুধু নিজের অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন; কিন্তু দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে এরা ৯টা-৫টার বাইরে দায়িত্ব নেবে না। দিনশেষে এদের কেরানিসুলভ মনোবৃত্তির অধিকারী হিসেবে দেখা যায়। এরা প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে সনদভিত্তিক শিক্ষাকে বেশি দাম দেয়। কাজের চেয়েও চেয়ারকে দাম দেয় বেশি। সৃজনশীল চিন্তা করার চেয়েও গৎবাঁধা চিন্তা করতে এরা অভ্যস্ত। দলীয় রাজনীতির মধ্যে যে ব্যক্তিপূজার বা কাল্টিজমের চর্চা হয়, এরা তার সাক্ষাৎ অনুসারী ও রূপায়ণকারী। উপমন্ত্রীর মতে, ছাত্রসমাজের মধ্যে এই কাল্টিজমই সবচেয়ে খারাপ দিক। এরা আদর্শের চেয়েও ব্যক্তিমানুষকে পূজা করে বেশি। এরা ভারে কাটে, ধারে কাটে না। পড়াশেনা ও জ্ঞানচর্চার পথ পরিহার করে এরা নানা রকম অর্থনৈতিক অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবন ও সমাজে ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পায়। এদের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার জ্ঞান খুব টনটনে। সমাজে এদের সফলতা এটাও প্রমাণ করে যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদের কারণে শিক্ষিত লোকের চেয়ে অল্পশিক্ষিত লোকেরাই বাস্তব জীবনে অনেক বেশি সফল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতিরেকেই চরিত্রগতভাবে জ্ঞানী ও বোধসম্পন্ন লোক হতে পারে, তারা যার যার পেশায় শিক্ষিত হতে পারে। যেমন একজন চাষি নিরক্ষর হতে পারে; কিন্তু ধান বুননের বেলায় তাকে অশিক্ষিত বলা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর আলোচ্য ভাষণ থেকে শিক্ষা নিয়ে সার্বিক কল্যাণে চিন্তা আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।

শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও বিশ্নেষক