রাখাইনে এখনও অবরুদ্ধ দুই লাখ রোহিঙ্গা

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

কক্সবাজার অফিস

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনও যেসব রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন, গত দুই বছর ধরে তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর তৎপরতা কিছুটা কমে এলেও রোহিঙ্গাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেডক্রস (আইসিআরসি) অবরুদ্ধ রোহিঙ্গাদের কিছু ত্রাণসামগ্রী দিচ্ছিল। গত তিন মাস ধরে তাও বন্ধ। ফলে রাখাইনের তিনটি জেলায় ভিটাবাড়ি আঁকড়ে ধরে এখনও যেসব রোহিঙ্গা রয়ে গেছেন, তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে চরম দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।

২০১৭ সালের আগস্টে সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযান ও গণহত্যার পর বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা। বিভিন্ন  তথ্যসূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে রাখাইনে এখনও দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আছে মংডু ও বুচিদং এলাকায়। গত দুই বছর ধরে তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেনাবাহিনী অনেক রোহিঙ্গা পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে অস্থায়ী ক্যাম্পে। সেখানে মানবেতর শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছে তারা।

মংডু জেলার কেয়ামং এলাকার কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে শনিবার টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। তারা জানান, সেখানে এখন ৫২টি পরিবারের তিন শতাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে। কাজকর্ম করার কোনো অনুমতি তাদের নেই। এই এলাকার প্রায় সবাই কৃষিজীবী হলেও তাদের ফসলি জমি পড়ে রয়েছে অনাবাদি। বাড়িঘর থেকে বের হয়ে পাশের কোনো গ্রামে যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা জানান, আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেডক্রস দেড় বছর ধরে অবরুদ্ধ রোহিঙ্গাদের কিছু ত্রাণসামগ্রী দিয়ে আসছিল। গত তিন মাস ধরে তাও বন্ধ। ওই রোহিঙ্গা বলেন, সর্বশেষ গত ১৩ জুন তিনি ১০ কেজি চাল, তিন কেজি বুট, এক কেজি সুজি ও এক লিটার তেল পেয়েছেন। এরপর রেডক্রসের কেউ তাদের খোঁজ-খবর নেয়নি।

তবে মংডু শহরের অবস্থা কিছুটা ভিন্ন বলে জানিয়েছে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। এই শহরে যেসব রোহিঙ্গার দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের প্রতিদিন বাধ্যতামূলক খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে সেনাবাহিনী। নিরাপত্তাহীন রোহিঙ্গারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবুও সেনাবাহিনীর নির্দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে হচ্ছে। ২৫ আগস্টের সহিংস ঘটনার পর অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালপত্র লুট হয়ে গেছে। শূন্য দোকান খোলা রেখেই সেনাবাহিনীর নির্দেশ পালন করতে হচ্ছে তাদের।

মংডুর ক্যায়াম্বুসন পাড়া থেকে এক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তাদের গ্রামে এখন রয়েছে মাত্র ৭টি পরিবার। এলাকার চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর সেখানে থাকলেও তার পরিবার পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। ওই রোহিঙ্গা বলেন, এখানে রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি, ফসলি জমি সরকার অধিগ্রহণ করে নিচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। সেনা সদস্যরা এখনও নিয়মিত এলাকা টহল দিচ্ছে। ভয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হতে পারে না। কোনো কাজকর্মে যাওয়ার অনুমতি তাদের নেই।

নাইক্ষ্যংছড়ির তুমরু কোনারপাড়া সীমান্তে আইসিআরসির একজন কর্মী জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের আগস্টের পর ৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা এই পয়েন্টের জিরো লাইনে আশ্রয় নিয়েছিল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হুমকিতে অনেক রোহিঙ্গা সেখান থেকে কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ৯২০ পরিবারের সাড়ে ৪ হাজার রোহিঙ্গা জিরো লাইনে অবস্থান করছে। তাদের খাদ্য ও মানবিক সহায়তা দিচ্ছে আইসিআরসি। তিনি আরও জানান, বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র আইসিআরসিকেই রাখাইনে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। তবে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তায় কেন বন্ধ রয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।