কক্সবাজারে উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কে স্থানীয়রা

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

আবু তাহের, কক্সবাজার

কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া ডিগ্রি কলেজ। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মারাত্মক ফল বিপর্যয় ঘটেছে কলেজটিতে। এই কলেজ থেকে ৫৬৩ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৫৪ জন। কেউ জিপিএ ৫ পাননি। পাসের হার মাত্র ২৭ শতাংশ। উপজেলার অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা কলেজে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৪৭৮ জন। পাস করেছেন ২১০ জন। বিপর্যয়কর এই ফলের জন্য দায়ী করা হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকটকে। কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, গত দুই বছরে কলেজে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। রোহিঙ্গা সংকটের জন্য উখিয়া কলেজে স্থাপন করা হয়েছে ত্রাণ বিতরণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। সম্প্রতি তা সরিয়ে নেওয়া হলেও ক্ষতি যা হয়েছে তা কোনোভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান  ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়েছে। শিক্ষকদের বড় একটি অংশ চাকরি নিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তিনি বলেন, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভারে বিপর্যস্ত এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অঙ্কে মেলানো যাবে না।

কক্সবাজার বন বিভাগের হিসাব মতে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য সাড়ে ছয় হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০  কোটি টাকার। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা অকল্পনীয়। পাহাড় কাটায় বদলে গেছে ভূমির প্রকৃতি।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে প্রতিদিন বৃক্ষনিধন হচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে এলাকার সবুজ প্রকৃতি। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাস ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়েছে আশপাশের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কৃষি ভূমি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এই এলাকা।

স্থানীয়দের অভিমত, রোহিঙ্গা সংকট যতই বিলম্বিত হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। রোহিঙ্গাদের কারণে বদলে যাচ্ছে স্থানীয়দের জীবনধারা; বদলে যাচ্ছে কক্সবাজার জেলার আর্থ-সামজিক অবস্থা। বিপুল রোহিঙ্গার ভারে উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি)  এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আগমনে কক্সবাজারের পানি,  বায়ু ও শব্দদূষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি মাসে রোহিঙ্গারা বন থেকে প্রায় সাত হাজার টন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য ঘর তৈরিতে প্রয়োজন হচ্ছে অন্তত ৬০টি বাঁশ। ক্যাম্পে হাজারো টিউবওয়েল স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। রোহিঙ্গাদের ফেলে দেওয়া পলিথিন সামগ্রী ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি :উখিয়া উপজেলার কুতুপালং থেকে দক্ষিণে থাইংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। এখানে বন বিভাগের পাহাড়-টিলা-সমতল ভূমি সব দখল করে নিয়েছে রোহিঙ্গারা। বৃক্ষহীন  ন্যাড়া পাহাড়ে দেড় লাখের মতো ঘর উঠেছে। ফলে এলাকায় মারাত্মক ভূমি ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক কর্মকর্তা বলেছেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় এখানে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার শাহনাজ বেগম বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ভূমি দখল হচ্ছে। ক্যাম্প সম্প্রসারণ করে সম্প্রতি ৫০০ নতুন শেড তৈরি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন- এভাবে কি পুরো এলাকা রোহিঙ্গাদের দখলে চলে যাবে?

রাজাপালং ইউনিয়নের মেম্বার (সংরক্ষিত) মর্জিনা বেগম বলেন, ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ শুধু রোহিঙ্গাদের নিয়ে। স্থানীয়দের সমস্যা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এই অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয়দের উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র পালাতে হবে।

ওরা ত্রাণও পাচ্ছে, কাজও পাচ্ছে :উখিয়ার বালুখালী-২ রোহিঙ্গা ক্যাম্প। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে দেখা গেল সমুদা বেগম নামে এক নারী ত্রাণের বোঝা মাথায় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। স্বামী কোথায় জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, রিকশা চালাতে গেছে। শুধু সমুদা বেগমের স্বচামী নয়, এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় সব পুরুষ নানা পেশায় নিয়োজিত। নারীরাও বাদ যাচ্ছে না শ্রমবাজার দখলে। তুলনামূলক কম বেতনে এরা স্থানীয়দের শ্রমবাজার কেড়ে নিচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আন্দোলনের নেতা মাহমদুল হক চৌধুরী বলেন, এখানে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের জন্য চরম বিপদ হয়ে এসেছে। তারা আমাদের আবাসভূমি ও ফসলি জমি, শ্রমবাজার সবই দখল করেছে। বিদেশি সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের চাকরি দিচ্ছে। স্থানীয়দের জীবন-জীবিকার জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করলেও বাস্তবে এর কিছুই করছে না তারা।

স্থানীয় রহমতের বিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক বলেন, কক্সবাজার জেলায় কৃষি শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক এবং জেলেদের শতকরা ৮০ ভাগ রোহিঙ্গা। মজুরি কম নেয় বলে তারা কাজ পেয়ে যাচ্ছে।

প্রয়োজনীয় তহবিল না পেলে ভয়াবহ বিপর্যয় :বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার যে বরাদ্দ তা খুবই সীমিত। প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে বলে সংশ্নিষ্ট দাতা সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ সমন্বয় গ্রুপের (আইএসসিজি) কর্মকর্তা সৈকত বিশ্বাস জানিয়েছেন, চলতি বছরে রোহিঙ্গাদের জন্য চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ তহবিল পাওয়া গেছে। তিনি জানান, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা খাতে ৯২০ মিলিয়ন ডলার অর্থ চাহিদার কথা জানানো হয়। এ পর্যন্ত ২৩০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা পাওয়া গেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এই অর্থ পাওয়া না গেলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। এ ছাড়া পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় দাতা সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শরাণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, 'জেআরপি'র জন্য দাবি করা তহবিলের সংকট খুবই হতাশাজনক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোর আহ্বান রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের পক্ষে একা এই বোঝা বহন করা কঠিন হবে।

বাড়ছে অপরাধ, বাড়ছে উৎকণ্ঠা :মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনার পর প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। তখন স্থানীয় লোকজন বিপন্ন রোহিঙ্গাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছিল। এখন সেই আশ্রয়দাতাদের হত্যা করতে দ্বিধা করছে না কিছু রোহিঙ্গা দুর্বৃত্ত। বৃহস্পতিবার রাতে ধরে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে স্থানীয় যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ ওমর ফারুককে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে পুরো এলাকা। তাদের হাতে এত অস্ত্র দেখে স্থানীয়রা আতঙ্কিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও এ নিয়ে চিন্তিত। তারা কথায় কথায় হামলা চালায় স্থানীয় লোকজনের ওপর। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার কাছে সংখ্যালঘু স্থানীয়রা এখন অসহায়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যমতে, গত এক বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্প থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল অস্ত্র ও মাদক। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মীর শাহেদুল ইসলাম রুমান বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্র আসছে মিয়ানমার থেকে। শঙ্কায় আছি, কখন আমাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়।

২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাখাইনে পুলিশের ২৪টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাঘাঁটিতে আরসা হামলা চালায় বলে অভিযোগ করে মিয়ানমার সরকার। ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনজুড়ে অভিযান শুরু হয়। সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট চালানো হয় তাদের ওপর। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের জন্যও চরম বিপদ হয়ে উঠেছে।