সরেজমিন

শূন্য পড়ে আছে সাজানো ঘর

ভাসানচর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

সারোয়ার সুমন, ভাসানচর থেকে ফিরে

১২০টি গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে ভাসানচরে। প্রতিটি গ্রামে আবার ১২টি করে টিনশেড ঘর। প্রত্যেক ঘরে কক্ষ রয়েছে ১৬টি। প্রতিটি কক্ষে অনায়াসে থাকতে পারবে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন সুবিধা দিতে গড়ে তোলা হয়েছে ১২০টি সাইক্লোন শেল্টার। তৈরি করা হয়েছে বাজার। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্মিত হয়েছে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সুগম করতে পাকা করা হয়েছে ১৯ কি. মি. সড়ক।

এখানেই শেষ নয়- সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধার জন্য ভাসানচরে বসেছে সোলার, সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ। নিরাপত্তা সুবিধা দিতে রয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। অথচ এসব স্থাপনায় আসতে রাজি নয় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ১৩ হাজার একর ভূমিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনা তাই শূন্য পড়ে আছে।

এ প্রসঙ্গে হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর-এ-আলম বলেন, 'সর্বশেষ জুন মাসে বিভাগীয় কমিশনারকে নিয়ে ওই এলাকা সরেজমিন দেখে এসেছি। শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাজারসহ বিভিন্ন কাজের উপযোগী নানা স্থাপনা সেখানে শতভাগ তৈরি হয়ে আছে। তার পরও রোহিঙ্গাদের কেউ এখানে আসতে রাজি হচ্ছে না। অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকা এসব স্থাপনার ব্যাপারে বিকল্প কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি আমাদের কাছে।'

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থাপনা নির্মাণসহ নানা দায়িত্ব নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে নৌবাহিনীর বিশেষ টিম কাজ করছে। এ ব্যাপারে আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ  বলেন, 'মানুষের বসবাসের জন্য এখন ভাসানচর পুরোপুরি প্রস্তুত। সেখানে যেসব স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল, তার সবই যথাযথভাবে যথাসময়ে নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।'

স্থানীয়ভাবে ভাসানচর ঠেঙ্গারচর নামে পরিচিত। এই ঠেঙ্গারচরকে বসতি হিসেবে গড়ে তোলার কাজে নৌবাহিনীর সহায়তার সার্বিক সমন্বয় করছে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল জয়নাল আবেদীন এ চর পরিদর্শন করেছেন। এরপর এ এলাকায় বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে গতি আসে। পরিদর্শনের পর তিনি বলেছিলেন, 'রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাই তাদের একত্রিত করে একই জায়গায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ঠেঙ্গারচরকে। জায়গাটিকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে সব ধরনের উন্নয়ন কাজ চলছে। সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যেই এসব কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।' বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শত শত সদস্য ঠেঙ্গারচরকে  বসবাসের উপযোগী করতে দিনরাত কাজ করছেন  বলে জানান তিনি।

নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কি. মি., উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচর থেকে প্রায় ৫০ কি. মি. ও হাতিয়া উপজেলা থেকে ২৫ কি. মি. দূরে এই ঠেঙ্গার চর। তবে সন্দ্বীপ উপজেলা থেকে এর দূরত্ব মাত্র পাঁচ কি. মি.। মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত ঠেঙ্গারচরের দৈর্ঘ্য আট কি. মি. ও প্রস্থ চার দশমিক পাঁচ কি. মি.। স্থানীয় সাংবাদিক মাসুমুল ইসলাম জানান, সন্দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে মেঘনার মোহনায় প্রায় ১২ বছর আগে জেগে ওঠে এ নতুন চর। সন্দ্বীপের কয়েকটি ইউনিয়ন ভেঙে গড়ে ওঠে এই চর। সন্দ্বীপের জেলেরাই এর নাম দেন ঠেঙ্গারচর। এখানে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল বলে মনে করেন সন্দ্বীপের বাসিন্দারা। চরের মালিকানার জন্য আইনি লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছে সন্দ্বীপের মানুষ। তবে চরটিকে হাতিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে রোহিঙ্গাদের বসবাস উপযোগী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে কাজও হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, গত দুই বছরে আমূল পাল্টে ফেলা হয়েছে এই চর। জোয়ার-ভাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ঠেঙ্গার চরের চারপাশে সুরক্ষিত করা হয়েছে বেড়িবাঁধ। প্রায় ১৩ কি. মি. বেড়িবাঁধ নতুন করে নির্মাণ করেছে নৌবাহিনী। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ করতে পাকা সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টারগুলো অর্থাৎ দুর্যোগের সময়ের জন্য নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন সুবিধাসমেত। কিন্তু এসব স্থাপনা আর কোনো কাজেই আসছে না- শূন্য পড়ে আছে দিনের পর দিন।