আগামীকালের স্বপ্ন

কালের যাত্রা

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২১

হাসান আজিজুল হক

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বব্যাপী এমন একটা দিন আসতে পারে- এ কথা কি আমরা ভেবেছি কখনও? কলেরা, গুটিবসন্ত নির্মূল হয়েছে। টাইফয়েডও আগের মতো ভয়াবহ নয়। কিন্তু করোনা? মুখে মাস্ক সেঁটে বসে থাকি। সারাক্ষণ ভয়, কে যেন ছুঁয়ে দেয়। আমরা লড়ছি এক অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে। লকডাউন শেষ হলেও সবার মধ্যে ভয়, কখন কী হয়ে যায়! জীবনসায়াহ্নে এসে এ দৃশ্য দেখতে হবে, একেবারেই ভাবিনি। মহামারি আগেও দেখেছি। তবে এমন ধারার সঙ্গে পরিচয় ছিল না।

করোনা আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে অনেকাংশে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কথাই যদি বলি, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাই এই জাতির সর্বনাশ ডেকে আনছে। শিক্ষার প্রায়োগিক ক্ষেত্র সংকুচিত করা হয়েছে নির্মমভাবে শিক্ষার বাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক শিক্ষা মানুষের মুক্তি দিতে পারে না। করোনা মহামারি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আমরা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার কারণেই আমাদের থমকে যেতে হয়েছে। শিক্ষা মূলত ওপরে ওঠার সিঁড়ি নয়। শিক্ষার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যেখান থেকে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। অথচ সে শিক্ষা আজ বহুদূর।

আসল প্রশ্ন হচ্ছে- মানুষকে কী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে! শিক্ষা পেয়ে মানুষ ভেতর থেকে শিক্ষিত হন। সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তন সাধিত হয়। মানুষ মানবিক হওয়ার আলো পায়। অথচ এক আঁধার ঘিরে ধরছে সমাজ-সভ্যতাকে। চারদিকে মহামারির মতো ধর্ষণের ঘটনা, খুনের ঘটনা, মানুষ গুম হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো নৈতিকতাহীন শিক্ষারই প্রভাব। আগেও অসংখ্যবার বলেছি, আজ আবারও বলছি, সমাজ-মানবিকতার প্রশ্নে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা বড় দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছি। দেখছি, প্রকৃত শিক্ষা থেকে মানুষ বঞ্চিত। অথচ গ্রামের সাধারণ মানুষরাই আমাদের খাওয়ায়-পরায়। এটি মনে রাখা উচিত যে, উচ্চবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তরাও উৎপাদনে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। সাধারণ মানুষকে অজ্ঞ রাখলে সবই নষ্ট হয়। সেখানে গণতন্ত্রও অর্থবহ থাকে না। গণতন্ত্রে স্বৈরতন্ত্র ভর করে। আমি মনে করি, রাষ্ট্রের অন্যত্র ব্যয় কমিয়ে শিক্ষায় ব্যয় আরও বাড়ানো দরকার। অর্থবহ শিক্ষা সর্বস্তরের মানুষে বিরাজ করলে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ শুরু থেকে যে পথে যাওয়ার কথা ছিল সে পথে যায়নি। কোনো আশাই আমাদের ঠিকমতো পূরণ হয়নি। এই যে স্বাধীনতার ৫০তম বছরে পা দিতে যাচ্ছি আমরা; আমরা হিসাব করে দেখি না কেন। আমাদের একটি সংবিধান ছিল এবং আছে। সেই সংবিধানের কতগুলো সংশোধন হয়েছে? বোধহয় পঞ্চদশ বা ষষ্ঠদশ সংশোধনী হয়েছে। এই সংশোধনগুলোর কোনটা অভিপ্রেত ছিল? সংবিধান যে একটা মস্ত পথপ্রদর্শক গ্রন্থ- রাষ্ট্র কেমন করে চলবে, দেশের অর্থনীতি কেমন করে চলবে, দেশের মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার কেমন করে নিশ্চিত হবে; এসব বিষয়ের নির্দেশনা এই গ্রন্থে রয়েছে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি অনেক কিছুই সংবিধানে লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারি যে, কোনোটাই আর ঠিক অবিকৃত অবস্থায় নেই।

বাংলাদেশের যে জন্মকথা সেটা নিয়ে আমাদের বিরাট গৌরব আছে। বাংলাদেশের জন্মকথা- এটা একটা রূপকথার মতো। এটা মানুষের উত্থানের এমন এক মহাকাব্য, যা চিন্তা করা যায় না। একটা মহাকাব্যে যে উত্থানের কথা থাকে এটিই এখানে মনে হয়। সে জন্য বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের ভেতরে এমন সব আবেগ কাজ করে। তখন মনে হয়েছিল, বাংলা যাদের ভাষা তাদের জন্য আলাদা একটা রাষ্ট্র হলো। মানুষের বসবাসযোগ্য একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে, গণতন্ত্র আসলে রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না- ধর্ম থাকে একমাত্র ব্যক্তির। কাজেই ধর্মনিরপেক্ষ না হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায়ই নেই। যদি কেউ খুন করে, তার বিচারের সময় সে কোন ধর্মের লোক- এটা কখনও বিচার করা হয় না।

যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রেই তাই ঘটে। রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে- এটাই কথা এবং যেটাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলা হয়েছে, বরাবরই বলে এসেছি, সেটাকে সংবিধানের মধ্যে সন্নিবেশিত হওয়াকে আমি তেমন সুদৃষ্টিতে দেখিনি।

যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু রাষ্ট্রকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আলাদা হতে দেখেছি। যারা নিজেদের জাতিরাষ্ট্র বলে মনে করে তারা একটা বিশেষ লক্ষণ দিয়ে নিজেদের আলাদা করে এবং অন্য কোনো জাতির বসবাসই সেখানে থাকবে না। এটা করতে গেলে রাষ্ট্রের চরিত্র থাকে না এবং রাষ্ট্রটি অগণতান্ত্রিক হয়ে পড়ে এবং আস্তে আস্তে সে ধর্মনির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাজনৈতিক নেতারা উন্নয়নের কথা খুব বলেন। উন্নয়ন তো হবেই। কেউ যদি বলে আপনি কি কোনো উন্নয়নই দেখতে পাননি? প্রতিটি মানুষের পেটের ভাত জুটছে। কিন্তু এখানেই কি কথা শেষ? যদিওবা পেটে ভাত আছে কিন্তু মাথায় চাল নেই। মাথার ওপর চাল আছে কিন্তু চিকিৎসা নেই। উন্নয়নের কথা বলে যে যতই উল্লসিত হোক না কেন, আমি অন্তত উল্লসিত হই না। দেশে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে, সেই সঙ্গে দেশে অভূতপূর্ব বৈষম্যও তৈরি হয়েছে। সেটা বোঝা যায়, বাংলাদেশের মতো ছোট জায়গায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কতজন মানুষ কোটিপতি? একজনের কাছ থেকে না নিলে আরেকজন বড় হবে কী করে! কাজেই শোষণের এক ধরনের প্রক্রিয়া যদি না থাকে, তাহলে এ রকম পার্থক্যগুলো তৈরি হতে পারত না। সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ও নাকি বাড়ছে। কিন্তু আয়ের স্তূপটাকে কত সংখ্যক ভাগ দিয়ে ভাগফলটা দেখানো হচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি। ১৭ কোটি লোকের জায়গায় মোট আয়কে যদি ১০ লাখ দিয়ে ভাগ দেওয়া যায় তাহলে মাথাপিছু আয় বেড়ে তো যাবেই। আর যদি ১৭ কোটি লোক দিয়ে ভাগ দেওয়া যায় তাহলে মাথাপিছু আয় যৎকিঞ্চিৎ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের কোন হিসাবটা জানানো হচ্ছে তা পরিস্কার নয়। মানুষ বেঁচে থাকে কেন? কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত জীবনটা তাকে ছেড়ে যায় না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে বেঁচে থাকে। একবার একজনকে বলেছিলাম- যতক্ষণ পর্যন্ত আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি মরব না! কথাটা হলো তাই, এভাবে বাঁচার কোনো মূল্য নেই। কিন্তু বাঁচাটাকে যদি মূল্য দিই আমরা, তখন কিন্তু এর একটা মূল্য দাঁড়ায়। যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ বাঁচার মতো বেঁচে থাকব, মরব না। জীবনানন্দের মতো দুঃখবাদী কবিও লিখে গেছেন, 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন; মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।' আসলেও তাই। মারি আসবে, দুর্ভিক্ষ আসবে। তবু আমাদের সব আকাঙ্ক্ষা এই পৃথিবীর কাছে। সবশেষে বলব, এই দেশকে নিয়ে, জীবনকে নিয়ে এখনও স্বপ্ন দেখি। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাহস বুকে নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম। একটা মহামারির কাল পেরিয়ে জীবন জেগে থাকার স্বপ্ন নিয়েই আগামী দিনগুলো চলতে হবে আমাদের।

 লেখক :কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক