কেন পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২১

অজিত কুমার সরকার

বঙ্গবন্ধু লন্ডন ও দিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তা পূর্ণতা পায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যে বাংলার মাটিতে ফিরে আসবেন ৮ জানুয়ারি মুক্তির আগের দিনও ছিল তা কল্পনার অতীত। পাকিস্তানের সরকারি কোনো সূত্র থেকে এ নিয়ে তেমন আভাস দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর যে কোনো সময় ফাঁসি হতে পারে- এমন বার্তাই মানুষের কাছে নানা সূত্র থেকে ঘুরেফিরে আসছিল। ফলে প্রতিটি বাঙালির মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শঙ্কা আরও বেড়ে যায়। 

সত্তরের নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো দু'জনেরই কুমতলব ও দুরভিসন্ধি ছিল। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস অত্যন্ত প্রবল ছিল। সত্তরের নির্বাচনে জনসংখ্যা অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভের পরও বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবের পরামর্শে ১৫ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন ডাকা হয়নি। ৩ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডাকা এবং স্থগিত করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩১ আসনের মধ্যে ৮১ আসন লাভকারী সংখ্যালঘু দলনেতা ইয়াহিয়ার পানাহারের সঙ্গী ভুট্টোর পরামর্শে। বাড়তি সময়ের কারণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে শেখ মুজিবের অনুসারীদের 'ম্যানেজ' করা। ভুট্টোর কাছে তথ্য ছিল নির্ধারিত সময়ে সংসদের অধিবেশন বসলে সিন্ধু প্রদেশে জি এম সৈয়দের অনুসারী আইয়ুব খুরো, বেলুচিস্তানের গাউস বকস বেজেঞ্জো, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল, খায়ের বকসমারীসহ আরও কয়েকজন বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দিতেন। বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা পাস হয়ে যেত। এটা উপলব্ধি করেই ভুট্টোর পরামর্শেই ইয়াহিয়া সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের গোপন সমঝোতা ও চক্রান্তের কারণে তাই বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি। ভুট্টো ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। অন্তত দুটি কারণে তার মুক্তি নিশ্চিত হয়। প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানে মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের কারণে ভুট্টোর ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং দ্বিতীয়ত, প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন দিন পর ১৯ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর আগে তার প্রথম প্রয়াস ছিল সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্য সম্পন্ন করে শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে তিনি মিয়ানওয়ালি কারাগারের বন্দিদের দিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার দ্বিতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর বাস্তবায়নে সব ব্যবস্থাই তিনি করেছিলেন। কিন্তু এ প্রচেষ্টাও তার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দ্বিতীয়ত, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়। তাদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়- যখন ৩ আগস্ট পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া 'শেখ মুজিবকে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা'র অভিযোগে গ্রেপ্তার ও দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের কথা জানান। ইয়াহিয়ার বক্তব্যের পরই তার সদর দপ্তর থেকে ১১ আগস্ট সামরিক ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিবের বিচারের ঘোষণা সংক্রান্ত বিবৃতি প্রদান করা হয়। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ ১২টি অভিযোগ আনা হয়।  

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ, জনমত তৈরি এবং পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে ভারত প্রথম থেকেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল লক্ষণীয়। ১৭ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের কারাগারে আটক শেখ মুজিবের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালাবে। পরবর্তী সময়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিবের বিচারের ঘোষণা দেওয়ার পর নয়াদিল্লিতে শরণ সিং কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শেখ মুজিবের কোর্ট মার্শাল করা হলে পাকিস্তানকে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। ১০ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে লেখা পত্রে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার বন্ধ করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। ১৬ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সানডে টাইমসকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, 'শেখ মুজিবকে অবশ্যই মুক্ত করা হবে।' মার্কিন ১১ জন সিনেট সদস্য, কংগ্রেসম্যান, স্টেট ডিপোর্টমেন্টের মুখপাত্র. মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার, বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং প্রবাসী সংগঠনগুলোও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসম্যান কর্নেলিয়াস, ১৩০ জন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করেন। অনেকটা অবাক করে দিয়ে ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপত্র জংকিং মানবিক কারণে শেখ মুজিবের বিচারে পাকিস্তানের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মাঝেই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি সেনা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আর ভুট্টো তাকে আটকে রাখা এবং মুক্তি নিয়ে হিসাব কষতে থাকেন। ঠিক এমন একটি সময়ে ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া না হলে পাকিস্তানি সেনাদের প্রত্যর্পণের ব্যাপারে কোনো আলোচনা নয়। পাকিস্তানে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক কারণ এবং আন্তর্জাতিক চাপেই শেষ পর্যন্ত ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি না হওয়ায় স্বাধীনতা অপূর্ণ থেকে যায়। প্রতিটি বাঙালি আগ্রহভরে অপেক্ষায় থাকে স্বাধীনতার মহানায়ক কবে দেশের মাটিতে ফিরে আসবেন। তাদের এই অপেক্ষার প্রহর গোনার পাশাপাশি বাড়তে থাকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শঙ্কা। যে পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে গণহত্যা চালাতে পারে, তারা যে কোনো সময়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে। শেষ পর্যন্ত সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং উদ্বেগের অবসান ঘটে ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর পাওয়ার পর। এরপর তিনি লন্ডন যান এবং সেখান থেকে দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

সিনিয়র সাংবাদিক; বাসসের সাবেক সিটি এডিটর