মহামানবের ফিরে আসা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২১

মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। নিজ মাটিতে প্রত্যাবর্তন করবেন একজন মহান নেতা। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার শিরোনামে এসেছিল কবিতা আর কবিতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে সংবাদের শিরোনাম করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২৩ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ তাদের তৎকালীন আবাসভূমি পূর্ববাংলা পাকিস্তান থেকে চিরদিনের জন্য আলাদা করতে সক্ষম হয়েছিল। যে মহান নেতার একক নেতৃত্বে এ মহান কাজটি সুসম্পন্ন করা হয়েছিল, তিনি হচ্ছেন- বাংলার রাখাল রাজা, অবিসংবাদিত একক নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন নিশ্চিত বলা যায় যে, ১৯২০ সালে ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চল শাসন করেছিল, তখন এই বিপ্লবী নেতা ছোট্ট খোকা হিসেবে বেড়ে উঠছিলেন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া নামের নিভৃত এক পল্লিতে। সেই খোকা যে মহীরুহ আকার ধারণ করে তার পরাধীন জাতিসত্তাকে স্বাধীন করতে সক্ষম হবেন, তা কেউ স্বপ্নেও ভাবেননি।

বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল এ নেতা মহাবাঙালি ছিলেন, একজন আত্মপ্রত্যয়দীপ্ত বিশ্বাসী, স্বাধীন চেতনাসমৃদ্ধ একজন ব্যাঘ্র মানব। তার গলার স্বরের সঙ্গে অন্য কোনো বাঙালির স্বরের মিল ছিল না। কণ্ঠস্বর দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তির পরিচিতি ঘটাতে হয়, তাহলে শেখ মুজিব ছিলেন এর অদ্বিতীয়। তার কণ্ঠ থেকে মাঝে মাঝে অগ্নিবীণা নিঃসৃত হতো। সাধারণ মানুষ তাই তার কণ্ঠকে বজ্রকণ্ঠ বলে অভিহিত করেছে। ব্যাঘ্রের গর্জন যেমন ছোটখাটো বন্যজন্তুকে ভীতসন্ত্রস্ত করে ফেলে, তেমনি শেখ মুজিবের কণ্ঠও পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের একইভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলত। তার এক একটি শব্দ ও এক একটি বাক্যে পাকিস্তানি শাসকদের অন্তর কেঁপে উঠত। 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'- তার এই ঘোষণা রমনা রেসকোর্স মাঠে পাকিস্তানের অস্তিত্বকে প্রকম্পিত করেছিল। প্রতিপক্ষ বুঝতে পেরেছিল, শেখ মুজিব ও বাংলার জনগণ আর পাকিস্তানি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে রাজি নয়। পরিচয় পরিবর্তন করে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে বাঙালি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন। তিনি ছিলেন, ওইসব বিশ্বের মহান নেতাদের একজন, যারা জীবদ্দশায় তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে গেছেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, বাস্তবে স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। স্বাধীন বাংলা তো তারই কৃতিত্ব। তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

বঙ্গবন্ধু ভালো করে জানতেন, বিজয়কে সার্থক ও সুসংহত করতে হলে শত্রুদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে হবে। বিজয়ের পর অন্যান্য দেশে বিরোধীদের নিধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিজয়কে সুসংহত করার চেষ্টা করা হয়। মানবতাবাদী শেখ মুজিবুর রহমান ওই শত্রু নিধন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি অনেক শত্রুকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। চরম অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারায়। একটি সশস্ত্র বিপ্লবের পরেও তিনি দেশ পরিচালনা করতে চেষ্টা করেছিলেন। স্বাধীনতার শত্রু জামায়াত-শিবির চক্র ও উগ্র বামপন্থিরা তার এই মহান প্রচেষ্টাকে দুর্বলতা বলে মনে করেছিল। বঙ্গবন্ধুর কারণেই সেই অস্ত্র তারা হাতে পেয়ে, তা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা শুরু করল। দেশ সম্মুখীন হলো এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের। বিজয়কে সুসংহত করার প্রয়োজনেই সবকিছু কঠোর হস্তে দমন করে তিনি যখন আসল কাজটি শুরু করার জন্য পদক্ষেপ নিলেন, তখনই তাকে হত্যা করা হলো। পরিচালনা করা হলো দেশকে প্রতিক্রিয়ার ধারায়। স্বাধীনতার শত্রুরা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিপক্ষ বনে গেলেন। তার পর ২১ বছর যা হওয়ার তাই হয়েছে! উল্টোপথের যাত্রী সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপান্তর ঘটানোর অপচেষ্টা। প্রত্যেক দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ের পর স্বাধীনতাকে সুসংহত করার চেষ্টাই হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবীরা প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে। বাংলাদেশেও তাই ঘটেছে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ রেখে প্রতিবিপ্লবীদের আমরা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারিনি। হয়তো আমাদের অনেক সিদ্ধান্তে ভুল ছিল। স্বাধীনতার মর্মবাণীকে হৃদয় দিয়ে আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম বলে মনে হয় না। তাই তার অনেক সিদ্ধান্তকে সাধারণ জনগণ ভ্রান্ত বলে মনে করেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে সঠিকভাবে তারা তৎপর হয়ে ওঠেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি যেভাবে আত্মসচেতন হওয়ার কথা, তা হতে পারেনি। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, চেতনাই রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে তার দূরদর্শিতা তার অনুসারীরা অনেকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। তাই তিনি জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে যে ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, সে সম্পর্কে এখনও তার দলের সিনিয়র নেতারা বিরূপ মন্তব্য করে থাকেন। তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি সফল করে যেতে পারলে সমালোচকরা সমালোচনা করার সুযোগ পেত না। তার অকাল মৃত্যুর কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে এখন কালো অধ্যায় বলে অনেকে বিবেচনা করে থাকেন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করার প্রয়োজনেই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।

১০ জানুয়ারি বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একটি পাকিস্তানি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই বিমানে ড. কামাল হোসেন ও তার পরিবার ছিলেন। লন্ডনে সময় তখন সকাল সাড়ে ৮টা, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। পৃথিবীর কেউ জানে না এ খবরটি। টাইম ম্যাগাজিন ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে লিখেছে, লন্ডনে বঙ্গবন্ধু উঠেছেন ক্লারিজ হোটেলে। প্রেসিডেন্ট মর্যাদায় একটি সুইটে রাখা হয়েছে তাকে। সারাদিনটিই তিনি বিশ্রাম নিলেন। দেখা করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে। বিকেলে একটি প্রেস কনফারেন্স করলেন। বঙ্গবন্ধুকে নেওয়ার জন্য একটি ভারতীয় ৭০৭ বোয়িং বিমান প্রস্তুত ছিল হিথরো বিমানবন্দরে। দিল্লি এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারপর বীরবেশে ফেরেন দেশে।

দেশে ফিরে এসে তিনি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার লক্ষ্যে মূল ভিত রচনা করেন। তার অকাল মৃত্যুর কারণে আমাদের চরম ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ অসমাপ্ত থেকে গেছে। তার অসমাপ্ত কাজ তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সমাপ্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে তা ভিন্ন হওয়ায় তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে অগ্রসর হতে হচ্ছে। বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যার হাতে আজ সবচেয়ে নিরাপদ এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এগিয়েছে, আরও এগিয়ে যাবে।

শিক্ষাবিদ ; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল