বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২১

ইনাম আহমদ চৌধুরী

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে পাকিস্তান থেকে লন্ডন পিআইয়ের বিশেষ বিমানে এবং লন্ডন থেকে ব্রিটিশ সরকারের প্লেনে দিল্লি হয়ে ঢাকা এলেন। এর আগে ৩ জানুয়ারি করাচির এক বিরাট জনসভায় ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সম্পর্কে সর্বসম্মত ইতিবাচক মতামত যাচাই করে ৭ তারিখ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানালেন। দু'দিন লন্ডন থেকে ১০ তারিখ দিল্লি এলেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারি প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে দিল্লিতে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক আগমন ও অভ্যর্থনা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। দিল্লিতে সেই স্বল্পকালীন বিরতির সময়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ এবং দেশপ্রেমের প্রত্যক্ষদর্শীর নজির দিচ্ছি। ব্রিটিশ প্লেনে দিল্লি পৌঁছার পর তিনি খবর পেলেন তার ও সহসঙ্গীদের ব্যাগেজ ওই প্লেন থেকে নামিয়ে একটি ভারতীয় প্লেনে ওঠানো হচ্ছে এবং সে প্লেনেই তিনি ঢাকা যাবেন। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, তা কেন? ব্রিটিশরা তো আমাকে ঢাকাতেই যাওয়ার জন্য প্লেনের ব্যবস্থা করেছে। মাঝপথে তা পাল্টাব কেন? ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানালেন, ঢাকার বিমানবন্দর ওই ব্রিটিশ প্লেনের অবতরণের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। বঙ্গবন্ধু তখন উপস্থিত বাংলাদেশের চিফ অব প্রটোকল ফারুক চৌধুরীকে বললেন, ওসব না জেনেশুনে কি তারা আমাকে পাঠাবে? খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা করো। দেখা গেল, ব্রিটিশ প্লেন অবশ্যই ঢাকা অবতরণ করতে পারবে। ব্যাগেজগুলো ব্রিটিশ প্লেনেই স্থানান্তরিত হলো। আয়োজন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু দিল্লির পরে কলকাতায় একটি জনসভায় ভাষণ দিয়ে যাবেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, 'তা নয়। আমি প্রথমেই ঢাকা যেতে চাই। কলকাতা শিগগিরই আসব, পরে।' তিনি সোজা ঢাকাই চলে এসেছিলেন তারই প্রতিষ্ঠিত নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রে। অপেক্ষমাণ কোটি কোটি মানুষের কাছে। দিল্লিতে স্বল্পকালীন বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য দীর্ঘ সময় ছিল না। কিন্তু এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন, তিনি আশা করছেন অদূর ভবিষ্যতেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করবে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সম্মতি জানিয়ে বললেন, 'যখনই বলা হবে, ভারতীয় বাহিনী তখনই ফেরত যাবে।' তা ঘটেও ছিল ইন্দিরা গান্ধীর ১৭ মার্চ ঢাকা সফরের আগেই।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই তদানীন্তন ঢাকার একমাত্র পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। হোটেলের মালিকানা ছিল পাকিস্তান সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএসএল)- তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে আমি ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য ছিলাম। স্বাধীনতার পর সব পাকিস্তানি শেয়ার বাংলাদেশ সরকারের হয়ে যায় এবং মালিকানায় বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল) প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি পদ-কল্যাণে আমি নিযুক্ত হই চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ডিরেক্টরস, বিএসএল। আমরা স্থির করলাম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার আহ্বান করে কোন কোম্পানিকে ম্যানেজিং এজেন্সি দেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করা হবে। সরকারের অনুমতি নিয়ে (প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে) আমরা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দিলাম। হিল্টন, শেরাটন, প্যান- প্যাসিফিক, ভারতের ওবেরয় গ্রুপ এবং আরও কয়েকটি খ্যাতনামা হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ) অংশ নিলো। রায় বাহাদুর ওবেরয় স্বয়ং ঢাকা এলেন। বাজারে জোর গুজব ছিল, মৌখিকভাবে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের পরিচালনা ভার ওবেরয় গ্র্যান্ড হোটেল, কলকাতাকেই দেওয়া হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরাসরি বললেন, 'তোমরা সব দরপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে দেখে বাণিজ্যিকভাবে আমাদের স্বার্থে যারা সর্বোৎকৃষ্ট, তাদেরই বিবেচনা করো।'

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের কলকাতা যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। আলোচনাকালে ১৯৬৫ সালের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ভেস্টেড প্রোপারটিস প্রত্যর্পণের জটিল প্রশ্নটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক উত্তর ছিল, 'ওই সময়কার আইন ও রুলস রেগুলেশন দিয়ে যা করা হয়েছিল তা বর্তমান বাংলাদেশ সরকাররের জন্যে পুনর্বিবেচনা বাস্তবসম্মত নয়।' মিসেস গান্ধী এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করেননি। ওই সভা চলাকালেই তখনকার একজন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশেষ উপদেষ্টা ডিপি ধর বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বিধ্বস্ত রেলওয়ের পুনর্বাসনের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তা দেখিয়ে তার অনুমোদন নেওয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী কক্ষে তারা অবস্থান করছেন। মি. ধর বঙ্গবন্ধুকে ওই কক্ষে যেতে আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু তখনই বললেন, আমার অর্থ সচিব মতিউল ইসলাম আমার পক্ষ থেকে ওই পরিকল্পনা পরীক্ষা করে আমাকে বলবেন। মি. ধর বঙ্গবন্ধুকে যেতে আবারও অনুরোধ জানাতে বঙ্গবন্ধু বললেন, অর্থ সচিবই আমাকে রিপোর্ট করবেন। কী কারণে বঙ্গবন্ধু তখন যাননি তা পরিস্কার নয়, তবে এটা ঠিক যে, বিষয়টি সম্পর্কে অবশ্যই পূর্বে জ্ঞাত করার প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং পার্শ্ববর্তী কক্ষে যাওয়ার আমন্ত্রণ মি. ধরের কাছ থেকে না এসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই আসা সংগত ও রীতিসম্মত হতো। এতে তাৎক্ষণিক এবং যথাযথ ছিল বঙ্গবন্ধুর বিচারবুদ্ধি ও আত্মসম্মানবোধ।

এত ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু চিরকাল খেলাধুলায় তুমুল উৎসাহী ছিলেন এবং ক্রীড়া জগতের যথাসাধ্য পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তারই উৎসাহ ও নির্দেশে ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণভিত্তিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর এসব পদক্ষেপে সত্যিকারের ক্রীড়ামোদীরা উৎসাহিত বোধ করেন। শহীদ শেখ কামাল ও শহীদ শেখ জামাল যে গুণাবলি উত্তরাধিকার সূত্রেই যেন পেয়েছিলেন এবং তার যোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আচরণেও যার যথার্থ প্রতিফলন দেখি। আমার বাবা মরহুম গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার হওয়া ছাড়াও তিনি দীর্ঘকাল ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট, টোকিও অলিম্পিকে (১৯৬৪) পাকিস্তানের চিফ অব মিশন ছিলেন। তার সম্পর্কে বিখ্যাত সাংবাদিক এবং ক্রীড়া প্রতিবেদক এবিএম মূসা 'একজন নেপথ্য ক্রীড়াপ্রেমী, স্মৃতিপটে গিয়াস উদ্দিন' (পৃ-১৩-১৪)-এ বলেন, 'ষাটের উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গনের ঢেউ খেলার জগতেও বিস্তারিত হয়েছিল গিয়াসুদ্দিন চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদদের স্বাধিকার, সমান মর্যাদা আদায়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলেই।'

আমি পূর্ব পাকিস্তান সরকারে যুগ্ম শিল্প ও বাণিজ্য সচিব ছিলাম। ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই (ডিসেম্বর ১৯৭১) আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নিযুক্ত হই। যথেষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তার অভাবে আমাকে বেশ কিছুদিন অতিরিক্তভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়েরও কাজ করতে হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। পশ্চিম পাকিস্তানি মালিকানার পরিত্যক্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোতে একটি ঘোষিত নীতি অনুযায়ী ওই সংস্থার সর্বোচ্চ পদাধিকারী বাঙালি কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিযুক্ত করার অর্পিত দায়িত্ব ছিল আমার। মার্চ মাসের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও খুলনা যান। মন্ত্রণালয় থেকে আমি সেখানে প্রেরিত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্দেশ্যে তা প্রত্যক্ষভাবে অবহিত হতে চান। ২৯ মার্চ (১৯৭২) চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে এক সুবিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক মানোন্নয়নই তার সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। তবে তিনি সাবধান করে দেন, সরকারের জাতীয়করণ কর্মসূচি যেন কেউ বানচাল করার অপচেষ্টা না করে। ৩১ মার্চের (১৯৭২) খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানের প্রদত্ত ভাষণে তিনি বিশেষ করে উত্তেজিত শ্রমিকদের সব ধরনের ধর্মঘট ও ঘেরাও পরিহার করার কঠোর নির্দেশ দেন। 'শৃঙ্খলা বজায় রেখে সব ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে হবে'- এই ছিল তার আহ্বান এবং তা তারা মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মতো শুনে তাতে সোৎসাহে সম্মতি জানান (মার্চ ৩০ ও ৩১, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজার্ভার, দৈনিক বাংলা)। সরকারের প্রথম দিনগুলোতে অনেক অভাবিত ও ব্যতিক্রমী সমস্যা ছিল। বঙ্গবন্ধুর ছিল সমস্যা অনুধাবন ও যথাযথ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনন্য-সাধারণ ক্ষমতা। আমাদের ছিল বৈদেশিক মুদ্রার অতীব প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে তিনি নির্দেশ দিলেন। প্রথমেই পাট মন্ত্রণালয় নামীয় একটি নতুন মন্ত্রণালয় স্থাপিত হলো। বাণিজ্য সচিব এমএল রহমান (সিভিল সার্ভিসের) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত, পাট বিষয়ে অভিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত একজন দক্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি হলেন পাট সচিব। ১৯৭১ সালে রপ্তানি না হওয়ায় আমাদের অনেক পাট ও পাটজাত দ্রব্য অবিক্রীতভাবে জমা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন, সব জমে থাকা পাট ও পাটজাত দ্রব্য অবিলম্বে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে। এমএল রহমানের পরামর্শে 'দ্য স্পট সেল' একটি টিম গঠন করা হলো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, নিজের খরচে বেসরকারি সেক্টরের দু'জন প্রতিনিধি এবং পাট ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে আমি দলনেতা। সচিব এমএল রহমানই মুখ্যত সর্বত্র যোগাযোগ করে বঙ্গবন্ধুর অনুমতিক্রমে গন্তব্যস্থল স্থির করে দিলেন। যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু সহাস্যে, তবে দৃঢ়তার সঙ্গে নির্দেশ দিলেন- 'বার্টার নয়, যথাযথভাবে সব ক্যাশ পেমেন্টে বিক্রি করে দেশে ফিরবি, নইলে নয়।' আমরা তার আশা পূর্ণ করতে পেরেছিলাম। পারতপক্ষে সবকিছুতেই বঙ্গবন্ধু আশ্চর্য-সুন্দরভাবে একটি ব্যক্তিগত স্পর্শ দিয়ে দিতেন, যা আত্মবিশ্বাস, আস্থা, আনুগত্য ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করত।

সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ; অবসরপ্রাপ্ত সচিব