রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে কত ইতিহাসই জানা যায়। কিন্তু সেসব শুধুই বীর রাজনীতিবিদদের ইতিহাস। সেখানে তাদের পেছনে নারীর অবদান এবং তাদের অশ্রুজলের কথা লেখা থাকে না। বঙ্গমাতা রেণুও আজ তাদের মধ্যেই হারিয়ে যেতেন যদি না নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল মহামহিম বঙ্গবন্ধু অনুগ্রহ করে ফজিলাতুন্নেছার কথা লিখে না যেতেন তার স্বহস্তে লিখিত আত্মজীবনীগুলোর ভেতরে। তারপরও কথা থাকে। পৃথিবীর বহু প্রতিভাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, যাদের সংবাদ আমরা জানি না, শুধু পরিবারের কারণে তারা রাজনীতি থেকে এককালে সরে গেছেন। কেউ কেউ জেলখানায় থেকে পরিবারের আগ্রহেই সারা জীবনের জন্য মুচলেকা লিখে জেল থেকে বেরিয়ে মহাকালের প্রবাহে মিশে গেছেন।

কারণ পরিবারের আছে এক অমোঘ আকর্ষণ, সে আকর্ষণের হাত এড়িয়ে রাজনীতির বিপদসংকুল পথে এগিয়ে যাওয়া কোনো সহজ কাজ নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তো সে রকমেরই হতে পারত। হলে আশ্চর্য কিছু হতো না। তার আত্মজীবনীতেই তো আছে একবার পরিবারের সঙ্গে মাত্র সাত দিন একনাগাড়ে কাটিয়ে আবার একাকী নদীপথে ঢাকায় ফেরার সময় মনে হয়েছিল, তার যেন এবার নিজের পরিবারের প্রতি একটু বেশি মায়া হয়েছিল! তাহলে আরও কিছুদিন তিনি যদি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন, যে পরিবারে রেণু ছিল, বাচ্চারা ছিল, স্নেহশীল বাবা-মা ছিলেন, ছিলেন ভাইবোন, তখন সেই মায়ার বশে তিনি কি রাজনীতির অনিশ্চিত ডামাডোল থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। কারণ তার আগে ও পরে বহু রাজনৈতিক নেতা এ রকম কাজ করেছেন। পরিবারের মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে তারা বেরিয়ে আসতে পারেননি। বাবা-মায়ের সজল চোখ, স্ত্রীর কান্নারত মুখ, ছেলেমেয়েদের গলা জড়িয়ে মুখগুঁজে বাবার বুকে পড়ে থাকা, এসব মায়ার বন্ধন ত্যাগ করে জেলখানায় ফিরে আসা কোনো স্বামী, পিতা কিংবা পুত্রের পক্ষে কি সম্ভব ছিল?

দেশভাগের আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করতেন। তখন ছিল মুসলিম লীগ, তিনি সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। বিভাগ-পূর্ব কলকাতা ছিল তার কর্মক্ষেত্র। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের অপরাজনীতি দেখে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন। তখন পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার তাকে জেলে পাঠাল। সেই থেকে জেলখানা হলো বঙ্গবন্ধুর ঘরবাড়ি। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি তখনকার পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে লাগলেন। মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বয়স্ক নেতাদের সঙ্গে সহযোগিতা করে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন। যে ঢাকা ছিল বিভাগ-পূর্বকালে বঙ্গবন্ধুর অচেনা ও বন্ধুহীন একটি শহর, সেই ঢাকাই হয়ে উঠল তার রাজনীতির কর্মক্ষেত্র। আর সবুজ শ্যামলিমায় ভরা শান্ত নিরুপদ্রব টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সহজ-সরল গৃহবধূ ফজিলাতুন্নেছা রেণু কী করলেন? যা করলেন তা প্রায় অবিশ্বাস্য।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'রেণু তুুমি দেশে ফিরে যাও, আমি কবে জেল থেকে মুক্তি পাব, জানি না, এই অচেনা, অজানা শহরে তুমি তিন তিনটে নাবালক ছেলেমেয়ে নিয়ে কীভাবে বসবাস করবে?' বঙ্গমাতা মন দিয়ে তার কথা শুনেছিলেন, কিন্তু কোনো উত্তর দেননি। কারণ ততদিনে তিনি আর গ্রাম্য বালিকা নন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত একজন রমণী। তিনি তখনই বুঝেছিলেন যে এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে বঙ্গবন্ধুর অর্থ দরকার, নিবেদিত প্রাণ কর্মী দরকার, সেসব কর্মীকেও দেখভাল করা দরকার, কারণ তারাও কোনো না কোনো পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, তাদেরও স্ত্রী ছেলেমেয়ে আছে, বাবা-মা, বোন আছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে তারা রাজনীতি করতে নেমেছেন বলে তো পরিবারের দায়িত্ব একেবারে ভুলে যাননি। তো এসব দায়িত্ব পালন কে করবে? বঙ্গবন্ধু তো নিজের পরিবারেরই কোনো তোয়াক্কা করেন না, তো এদের কী হবে? বঙ্গবন্ধুর অজান্তেই ফজিলাতুন্নেছা রেণু হয়ে উঠলেন আওয়ামী লীগের একজন বিশেষ কর্মকর্তা এবং ট্রেজারার। আর এই রেণুকেই কিছু বছর আগে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, রেণু বাড়ি ফিরে যাও। এখানে, তোমার জন্য এই অচেনা শহরে, আত্মীয়-পরিজনহীন শহরে তিন তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে একাকী বসবাস করা কঠিন হবে। তুমি বাড়ি ফিরে যাও, তোমার সেই নিজের গৃহে, নিজের ছেলেবেলার পরিবেশে। আমাকে এখানে রাজনীতি করতে দাও। জেলখানায় বসবাস করতে দাও।

বঙ্গমাতা রেণু ছিলেন বাস্তবের কশাঘাত সহ্য করা একজন অভিজ্ঞ মানুষ। এই অভিজ্ঞতা তাকে ঢাকায় এসে রাতারাতি অর্জন করতে হয়েছিল। বঙ্গমাতা যখন জীবিত ছিলেন তখন তার নাম কি আমরা খুব বেশি উচ্চারিত হতে শুনেছি? মোটেও নয়। প্রথম তার নাম আমরা জানতে পারি যখন তিনি আগরতলা মামলায় ঘাঘু রাজনীতিবিদদের অনুরোধ না মেনে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি নিতে নিষেধ করেন। সেই প্রথম আমরা বঙ্গমাতার রাজনীতির অঙ্গনে কোনো অ্যাকটিভ ভূমিকার কথা জানতে পেরেছিলাম। তার আগেও নয়, পরেও নয়।

এই বাংলা যেমন মীরজাফরের দেশ, এই বাংলা যেমন ঘাতক মোশতাকের দেশ, তেমনি এই বাংলা আমাদের বঙ্গবন্ধুর দেশ, এই বাংলা আমাদের বঙ্গমাতার দেশ। বঙ্গমাতা নিজে তার আত্মজীবনী লিখে রেখে যাননি। কারণ তা করার তার সময় ছিল না। সংসার এবং রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্রেই তার সব সময় ব্যয় করতে হয়েছিল। যতবার তার সংসারে তাণ্ডব হতো, শুধু শেষবার ছাড়া- তাণ্ডব শেষ হলে আবার তিনি তার সংসার গুছিয়ে ফেলতেন। জীবনের এ রকম এক কর্কশ যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি হিমালয় পর্বত পার হয়েছিলেন, নীরবে নিভৃতে তিনি বাংলা ও বাঙালির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই কথা মনে পড়ে এখন আমাদের চোখ ভিজে যায়, অশ্রুতে ভেসে যায় চোখ। আরও দুঃখ লাগে যখন ভাবি যে ৮ আগস্টে এই মহীয়সী নারীর জন্মদিন তার ঠিক সাত দিন বাদেই হলো তার মৃত্যুদিন। আজ তোমার জন্মদিনে তোমাকে আমরা স্মরণ করি মাতা। যতদিন এই বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তোমার কীর্তির

কথা দেশের মানুষ ভুলবে না। তুমি চিরজীবী হও, বঙ্গমাতা।

-মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন