১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিনা বিচারে অন্তরীণ থাকাকালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম (উপ-রাষ্ট্রপতি), তাজউদ্দীন আহমদ (প্রথম প্রধানমন্ত্রী), মনসুর আলী (প্রধানমন্ত্রী) এবং কামারুজ্জামান (শিল্পমন্ত্রী এবং দলের প্রাক্তন সভাপতি)- এই চার জাতীয় নেতা হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিচারের প্রক্রিয়াকে যেসব অবস্থা বাধাগ্রস্ত করছে, সেগুলোর তদন্ত করার জন্য ১৯৮৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ষাপ্রাপ্ত দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং প্রধানমন্ত্রীর পুত্র মোহাম্মদ সেলিম ও উপ-রাষ্ট্রপতির পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আবেদনক্রমে স্যার থমাস উইলিয়ামস, কিউসিএমপির নেতৃত্বে এই কমিশন গঠনের উদ্যোগ গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ও বিদেশে অনুষ্ঠিত জনসভাগুলোয় এ আবেদনটি ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্যার থমাস উইলিয়ামস, কিউসিএমপির সভাপতিত্বে হাউস অব কমন্সের একটি কমিটি কক্ষে এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। জিফ্রি থমাস, কিউসিএমপি এবং সলিসিটর এব্রো রোজ এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে কমিশন গঠন ও তার কার্যপদ্ধতি ঘোষণা করে ওই দিনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

কমিশন নিল্ফেম্নাক্ত বিষয়ের ওপর কমিশনের প্রত্যেক সদস্যের কাছে সরবরাহকৃত প্রমাণসংবলিত দলিলপত্র পরীক্ষা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে- ক. ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের হত্যা এবং ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর চার জাতীয় নেতার হত্যা; খ. জনসমক্ষে যেসব ব্যক্তি হত্যার দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং গ. এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো। কাগজপত্র পরীক্ষা থেকে নিল্ফেম্নাক্ত ঘটনা পরিস্ম্ফুট হয়।

ক. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের নিল্ফেম্নাক্ত সদস্যবৃন্দকে নিজ বাসভবনে হত্যা করা হয়-

১) শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা;

২) শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল;

৩) শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় ছেলে শেখ জামাল;

৪) শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেল (৯ বৎসর);

৫) শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা আহমেদ;

৬) শেখ জামালের স্ত্রী পারভীন জামাল (রোজী) এবং

৭) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই শেখ নাসের।

খ. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে একই সময়ে নিল্ফেম্নাক্ত ব্যক্তিদেরও হত্যা করা হয়-

১) শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত (বিদ্যুৎ, সেচ এবং পানিসম্পদবিষয়ক মন্ত্রী);

২) সেরনিয়াবাতের মেয়ে মিস বেবী (১৩ বছর বয়স);

৩) ছেলে আরিফ;

৪) নাতি বাবু (৪ বছর বয়স);

৫) একজন অভ্যাগত ভাগ্নে;

৬) তিনজন অতিথি;

৭) চারজন গৃহভৃত্য;

৮) বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ক্ষমতাসীন দলের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য শেখ ফজলুল হক মনি এবং

৯) মিসেস শেখ ফজলুল হক মনি (শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনি এবং সে সময় অন্তঃসত্ত্বা)।

গ. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তারিখে নিল্ফেম্নাক্ত জাতীয় নেতাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়-

১) সৈয়দ নজরুল ইসলাম (প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি);

২) তাজউদ্দীন আহমদ (প্রথম প্রধানমন্ত্রী);

৩) মনসুর আলী (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) এবং

৪) এ এইচ এম কামারুজ্জামান (প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী এবং প্রাক্তন সভাপতি)।

ঘ. এই হত্যাকাণ্ডগুলো অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কতিপয় সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হয়।

ঙ. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকক ত্যাগ করার জন্য যেসব সামরিক বাহিনীর ব্যক্তি আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলেন, তাদের তালিকা থেকে জড়িত অফিসারদের শনাক্ত করা যেতে পারে। তাদের দেশত্যাগের পর যে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ব্যাংককে পলায়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল-

১) লে. কর্নেল ফারুক;

২) লে. কর্নেল আবদুর রশিদ এবং

৩) মেজর শরিফুল হক (ডালিম)।

চ. আপাতদৃষ্টিতে নিল্ফেম্নাক্তরা অভ্যুত্থানের নেতা ছিল-

১) লে. কর্নেল ফারুক;

২) লে. কর্নেল রশিদ এবং

৩) মেজর শরিফুল হক (ডালিম)।

ছ. শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানের হত্যার দায়-দায়িত্ব লে. কর্নেল ফারুক ব্যাংককে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে স্বীকার করেছে। এ দায়-দায়িত্ব ১৯৭৬ সালের ৩০ মে 'লন্ডন সানডে টাইমস' পত্রিকায় প্রকাশিত সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে এবং ১৯৭৬ সালের ২ আগস্টে লন্ডনে টিভি সাক্ষাৎকারে পুনরায় ওই ব্যক্তি দাবি করেছে।

জ. ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ভোরে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এবং সামরিক শাসন জারির জন্য যে কোন কাজ বা এ সম্পর্কে কৃতকর্ম বা এর পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা বা অন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর শাস্তি হতে অব্যাহিত অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ নামে অধ্যাদেশ জারি করে।

ঝ. অধ্যাদেশের অনুকূলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এই মর্মে প্রত্যয়ন প্রয়োজন যে, 'যে কোন কার্য বা কৃতকর্ম বা এ সম্পর্কে প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখিত যে কোন ব্যক্তির দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপ বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তন এবং ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের ভোরে সামরিক শাসন জারির উদ্দেশ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন বা উহার বাস্তবায়ন বা সেই নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, উক্ত সরকার পরিবর্তন সংক্রান্ত যে কোন কার্যবিষয় বা কৃতকর্ম বা এ সম্পর্কে পদক্ষেপ গ্রহণ বা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে।' এ জাতীয় প্রত্যয়নপত্র এতে উল্লিখিত ঘটনার চূড়ান্ত সাক্ষ্য বলে বিবেচিত হবে। এ জাতীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছিল কিনা, তা জানা যায়নি।

ঞ. ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ৭৮৬ নম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার নিল্ফেম্নাক্ত শর্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে।

'৭৮৬ নং আইন সাম্প্রতিককালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে কী অবস্থায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তার তাৎক্ষণিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্য এতদসঙ্গে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হলো। তদন্ত কমিশনের প্রধান হবেন সর্বোচ্চ আদালতের (আপিল বিভাগীয় বিচারপতি জনাব আহসান উদ্দিন চৌধুরী এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জনাব কে এম সোবহান ও বিচারপতি জনাব সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন সদস্য হিসেবে থাকবেন।'

ট. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা সম্পর্কে ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার লালবাগ থানায় একটি মামলা রেজিস্ট্রি করা হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, অল্পবিস্তর তদন্তের পর বিষয়টি সিআইডিতে পাঠানো হয়।

ঠ. ছয় বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো বিধিগত ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।

ড. তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য সন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিশন বাংলাদেশ পরিদর্শন করে এবং রাষ্ট্রপতিসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় জেল হত্যা সম্পর্কে আলোচনা করে এবং বলা হয়েছিল যে, আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হবে।

ঢ. পরবর্তী সময়ে লক্ষ্য করা যায় যে, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ থেকে ব্যাংককে পলায়নকারী হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের কূটনৈতিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন-

১) লে. কর্নেল শরিফুল হক (ডালিম) (প্রাক্তন মেজর);

২) মেজর কর্নেল আজিজ পাশা;

৩) মেজর মহিউদ্দিন;

৪) মেজর শাহরিয়ার;

৫) মেজর বজলুল হুদা;

৬) মেজর রশিদ চৌধুরী;

৭) মেজর নূর;

৮) মেজর শফিকুল হোসেন;

৯) ক্যাপ্টেন কিসমত হোসেন;

১০) লে. খায়রুজ্জামান এবং

১১) লে. আবদুল মজিদ।

ণ. প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে লক্ষ্য করা যায় যে, ওইসব ব্যক্তিকে কূটনৈতিক মিশনের পদগুলোতে স্থায়ী করা হয়েছে।

ত. উপরোক্ত ঘটনা ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রাগুক্ত হত্যা সম্পর্কে আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলার পথে কী অন্তরায় রয়েছে, সে সম্বন্ধে সরেজমিনে তদন্তের উদ্দেশ্যে কমিশনারের একজন সদস্যের ঢাকার সফর করা আবশ্যক।

থ, এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত যে, কমিশনের সদস্য জেফ্রি থমাস, কিউসি একজন সাহায্যকারীসহ সরেজমিনে তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৮১ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকা গমন করলেন। জেফ্রি থমাস ও তার একজন সহযোগী ঢাকা গমনের ভিসা লাভের জন্য তদন্ত কমিশনের সচিব ও সলিসিটর এব্রো রোজ দরখাস্ত পেশ করেন।

দ. সদস্যদের বাংলাদেশ গমনের উদ্দেশ্যে সময়মতো ভিসা দেওয়া হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি স্থগিত রাখে।

ধ. ১৯৮১ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওই দিন সন্ধ্যার ফ্লাইটের সুযোগ গ্রহণ করতে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি জরুরি অনুরোধ জানালে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন জানায় যে, পাসপোর্ট ও ভিসা ওই দিন অপরাহেপ্ত ফেরত দেওয়া হবে। এগুলো চাওয়া হলে কনস্যুলার বিভাগ বন্ধ বলে জানানো হয়।

ন. পরবর্তীকালে বাংলাদেশ হাইকমিশন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় যে, তারা জেফ্রি থমাসের ঢাকা ভ্রমণের জন্য ভিসা দিতে রাজি নয়। তদন্ত কমিশনের সচিব কর্তৃক বহু চিঠি লেখা, টেলিফোন করা ও ব্যক্তিগতভাবে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ হাইকমিশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভিসা দেওয়া হবে না বলে কোনো প্রত্যাখ্যানপত্র বা এ জাতীয় কোনো কিছু হাইকমিশন থেকে তিনি পাননি বলে উল্লেখ করেন।

উপরে বিবৃত ঘটনাগুলো থেকে আমরা যে প্রাথমিক উপসংহারে উপনীত হয়েছি তা হলো-

ক) আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলতে দেওয়া হয়নি।

খ) এটাও প্রতীয়মান হয় যে, এ প্রক্রিয়ার বাধা সৃষ্টিতে সরকারই দায়ী।

গ) এসব বাধা উপড়ে ফেলা কর্তব্য এবং আইন, বিচারকে তাদের স্বীয় গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।

২০ মার্চ ১৯৮২

তদন্ত কমিশনের ভাষণ :১৪-২৮-হাই হলবর্ণ

লন্ডন ডব্লিউ সি-১

সূত্র- 'বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড :ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস' গ্রন্থ

মন্তব্য করুন