বস্তুত, হৃদয়ই হচ্ছে মায়ের স্থান। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষায়, হৃদয় তাঁর 'ডঙ্কামারা' ভূমি। তাই তো হৃদয়কে বলা হয় হৃদয়মন্দির। আমরা যে মায়ের মূর্তি গড়ি, মূর্তিকে মন্দিরে স্থাপন করে পূজা করি, সে মূর্তি কিন্তু আমাদের হৃদয়েই আছেন। বাইরের মন্দিরে মায়ের পূজা আসলে হৃদয়মন্দিরে মায়ের পূজার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বিজয়া দশমীর দিন যে প্রথমে দর্পণ-বিসর্জন করা হয় তার মধ্যেও এই তত্ত্বটি নিহিত। যে দর্পণের মধ্যে মায়ের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হচ্ছিল, সেই দর্পণটি হলো হৃদয়ের প্রতীক। মা সেখান থেকেই এসেছিলেন। জলপূর্ণ আধারে দর্পণ-বিসর্জনের দ্বারা মা যেন আবার সেই হৃদয়েই প্রত্যাবর্তন করলেন। বৃহন্নন্দিকেশ্বর, দেবী এবং কালিকা পুরাণে যে দুর্গাপূজার পদ্ধতি আছে তাদের প্রতিটিতে বিজয়া দশমীর পূজার দর্পণ-বিসর্জন মন্ত্রে বলা হচ্ছে- ''গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং স্বস্থানং দেবী চণ্ডিকে' অর্থাৎ হে দেবী চণ্ডিকে, তুমি তোমার পরম আবাসস্থলে, তোমার স্বস্থানে গমন কর। সুতরাং দর্পণ-বিসর্জনের দ্বারা বোঝানো হলো মা যেখান থেকে এসেছিলেন সেখানেই ফিরে গেলেন। দর্পণ-বিসর্জনের পর সন্ধ্যায় নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা-বিসর্জন ওই এক তত্ত্বেরই অধিকতর স্থূল রূপ।

এর পরেও কথা থেকে যায়। মা যদি আমার হৃদয়ে সতত অধিষ্ঠান করেন তা হলে আমি কি এমন কিছু করতে পারি অন্যায়, অশুভ, যা অকল্যাণপ্রদ? না, তা তো পারি না। মা সর্বশক্তির মূল, তিনি স্বয়ং শক্তিস্বরূপিণী। আমার অন্তরেই যখন সেই মায়ের নিত্য উপস্থিতি তখন আমি কী করে শক্তিহীন হতে পারি, কী করে দুর্বল হতে পারি? না, তা পারি না। যা আমাকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যায়, অশুভের পথে নিয়ে যায়, অকল্যাণের পথে নিয়ে যায় সেই বৃত্তির সঙ্গে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে এবং তাকে সমূলে নাশ করতে হবে। এই সংগ্রামের শক্তি এবং পরিশেষে বিজয়ের শক্তি আমরা আমাদের ভেতর থেকেই পাব। আমাদের অন্তরনিবাসিনী মায়ের কাছ থেকেই আমরা সেই শক্তি পাব। মায়ের পূজা আসলে আমাদের সেই অন্তর্নিহিত শক্তির উদ্বোধনের প্রতীকি প্রক্রিয়া। আমাদের অন্তরে যিনি চৈতন্যরূপে অধিষ্ঠান করছেন, যাঁকে বেদান্ত ব্রহ্ম বলে আখ্যাত করেন, তাঁরই আর এক নাম 'মা'। শাস্ত্রের পরিভাষায় তিনি হলেন আদ্যাশক্তি। শুধু নাম-ভেদ, বস্তু একই। বেদান্ত যে মানুষের মধ্যে ব্রহ্মের জাগরণের কথা বলেন তা এই আদ্যাশক্তিরও জাগরণ। কর্ণের কবচকুণ্ডলের মতো এই শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই আমরা জন্মগ্রহণ করি। তাই তাকে আহরণ বা অর্জন করার কোনো ব্যাপার নেই, যা আছে তা শুধু বিকাশের ব্যাপার, অভিব্যক্তির ব্যাপার।

দেবীর পূজায় সেই প্রতীকি তাৎপর্যটিই নিহিত। মানুষের অন্তরস্থ শুভশক্তিই দেবী এবং অশুভশক্তিই মহিষাসুর। শুভশক্তির জাগরণের মাধ্যমে অশুভশক্তির বিনাশ। কথিত আছে, পুরাকালে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য দেবীর আরাধনা করেছিলেন এবং দেবীর বরে রাবণকে বধ করেছিলেন। রাবণকে বধ করার জন্য রামের প্রয়োজন হয়েছিল দেবীর আরাধনার অর্থাৎ দেবীর প্রসন্নতার। অর্থাৎ, অন্তরে দেবীর জাগরণের। সেই জাগরণেই সর্বসিদ্ধি। রাম ও রাবণ প্রতীক। প্রতীক শুভচেতনা-সমন্বিত মানুষের এবং অশুভচেতনাচ্ছন্ন মানুষের। শুভচেতনা-সমন্বিত মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও দেশের সমৃদ্ধি। অশুভচেতনাচ্ছন্ন মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে পরিবার, সমাজ ও দেশ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। দেবীর পূজায় সেই বার্তাই উন্মেষিত। কালিকাপুরাণে দেখি- 'নিহতে রাবণে বীরে নবম্যাং সকলৈঃ সুরৈঃ।/বিশেষপূজাং দুর্গায়াশ্চক্রে লোকপিতামহঃ।।/ততঃ সম্প্রেষিতা দেবী দশম্যাং শার্বরোৎসবৈঃ।।.../ইতি বৃত্তং পুরাকল্পে মনোঃ স্বায়ম্ভুবেহন্তরে।/প্রাদুর্ভূতা দশভুজা দেবী দেবহিতায় বৈ।।/নৃণাং ত্রেতাযুগস্যাদৌ জগতাং হিতকাম্যয়া।/পুরাকল্পে যথা বৃত্তং প্রতিকল্পং তথা তথা।।/প্রবর্ততে স্বয়ং দেবী দৈত্যানাং নাশনায় বৈ।/প্রতিকল্পং ভবেদ্রামো রাবণশ্চাপি রাক্ষসঃ।।/তথৈব জায়তে যুদ্ধং তথা ত্রিদশসঙ্গমঃ।।/এবং রামসহস্রাণি রাবণানাং সহস্রশঃ।/ভবিভব্যানি ভূতানি তথা দেবী প্রবর্ততে।।' (৬০। ৩১-৩৩, ৩৯-৪৩)

রাবণ নিহত হলে নবমীতে পিতামহ ব্রহ্মা সকল দেবতার সঙ্গে দেবীর বিশেষ পূজা করলেন। তারপর দশমীতে সেই দেবী ভগবতী শার্বরোৎসবসহ বিসর্জিত হলেন। পূর্ব কল্পে স্বয়ম্ভু মনুর সময়ে দেবী ভগবতী দেবগণের কল্যাণের জন্য দশভুজারূপে প্রাদুর্ভূতা হয়েছিলেন এমন কাহিনি প্রচলিত আছে। সেই আবির্ভাব ত্রেতাযুগের আদিতে জগতের হিতের জন্য ঘটেছিল। প্রতি কল্পেই দৈত্যদের বিনাশের জন্য দেবী স্বয়ং প্রবৃত্ত হন এবং রাক্ষস রাবণ এবং রামও প্রতি কল্পে জন্মগ্রহণ করেন। প্রতি কল্পে ওই উভয়ের পূর্বের মতো যুদ্ধ হয় এবং দেবতাদের সঙ্গে রামের মিলন হয়। এমন হাজার হাজার রাম ও হাজার হাজার রাবণ পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ভবিষ্যতেও করবেন। দেবীও সেইভাবে প্রবৃত্ত হয়ে থাকেন। দেবীর এই প্রবৃত্তিতে রামের বিজয় এবং রাবণের পরাজয় ও বিনাশ। রাবণের ওপর রামের সেই বিজয়সাধন থেকেই নাকি 'বিজয়া' উৎসবের প্রচলন, কারও কারও মতে।

'বিজয়া' শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে 'বি' পূর্বক 'জি' ধাতু থেকে। 'জি' ধাতুর অর্থ জয় করা। 'বি' অর্থাৎ বিশেষভাবে জয় করা। এই 'বিশেষভাবে' জয়ের অর্থ হচ্ছে আমাদের মালিন্যের ওপর জয়, আমাদের সংকীর্ণতার ওপর জয়, আমাদের ক্ষুদ্রতার ওপর জয়, আমাদের দুর্বলতার ওপর জয়, আমাদের কাপুরুষতার ওপর জয়। যদি সেই 'বিশেষ জয়' আমরা লাভ করতে না পারি তা হলে কিসের পূজা, কিসের মাতৃভক্তি? মানুষের ইতিহাস হচ্ছে মানুষের বিকাশের ইতিহাস, আবার মানুষের সংকোচনেরও ইতিহাস। কিন্তু কালের নিরিখে সেই মানুষই মানুষ, যে আতত্মশক্তিতে বিশ্বাসী হয়ে সেই আত্মশক্তিকে জীবনে প্রকাশমান করেছে, স্বয়ং সেই শক্তিস্বরূপ হয়ে জগতের সামনে দাঁড়িয়েছে। যখন জগৎ এমন মানুষের সাক্ষাৎলাভ করে তখনই জগতে নতুন সভ্যতার সূচনা হয়। বুদ্ধ তেমন একজন, খ্রিষ্ট তেমন একজন, মহম্মদ তেমন একজন, চৈতন্য তেমন একজন, রামকৃষ্ণ তেমন একজন। তাই তাঁরা এক-একটি যুগে এক-একটি সভ্যতার জনক। মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য আকারে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য প্রকারে। আকারে তো মানুষ আমরা সকলেই, কিন্তু প্রকারে মানুষ আমরা কজন?

বিজয়ার অর্থ বিজয়োৎসবও। আজ আমরা আমাদের অন্তরস্থিত শক্তিকে জাগরণের জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা করছি, যাতে আমরা আমাদের সকল দুর্বলতাকে জয় করে 'প্রকারে' মানুষ হতে পারি। যখন প্রকারে আমরা সবাই মানুষ হবো, তখনি সৃষ্টি হবে এক নতুন সভ্যতা। তখনি হবে সত্যিকারের বিজয়া-বিজয়োৎসব। শক্তিস্বরূপিণী মায়ের সন্তান আমরা। আসুন, আমাদের সকল দুর্বলতার জঞ্জালস্তূপে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেই বিজয়োৎসবের আজই সূচনা করে দিই।



অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, ঢাকা

মন্তব্য করুন