আইপিএলের প্রস্তুতি দেখতে গত সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলেন বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলী। শারজাহ স্টেডিয়ামে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েন ভারতের কিংবদন্তি এই ওপেনার। এই মাঠে জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলেছেন। স্মৃতির অলিগলি ঘুরে ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু ছবিও পোস্ট করেন তিনি। অবশ্য শুধু সৌরভ নন, গত শতকের আশি ও নব্বই দশকের ক্রিকেটপ্রেমীদেরও ভীষণ পরিচিত ও প্রিয় এই শারজাহ। এই শারজাহর জনপ্রিয়তার কারণেই দুবাই ও আবুধাবিতে ক্রিকেট বিস্তারে সহায়ক হয়েছে। ক'দিন পর এই স্টেডিয়ামগুলোতে বসবে টি২০ বিশ্বকাপের আসর।

মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ক্রিকেট আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন আব্দুর রহমান বুখাতির নামের এক ধনকুবের। তার পৃষ্ঠপোষকতাতেই ১৯৮৪ সালের ৬ এপ্রিল পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করে শারজাহ স্টেডিয়াম। এর পর থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম জনপ্রিয় ভেন্যুতে পরিণত হয় এই মাঠ। ক্রিকেটপাগল প্রবাসী উপমহাদেশিরা গ্যালারি মাতিয়ে রাখতেন, সে সঙ্গে স্পন্সরের সহজলভ্যতায় এখানে তিন-চার দলকে নিয়ে একের পর এক ওয়ানডে টুর্নামেন্ট আয়োজিত হতে থাকে। সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, ইমরান খান, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ওয়াসিম আকরামের মতো ভারত-পাকিস্তানের কিংবদন্তিদের কাছে ঘরের মাঠে পরিণত হয় এই স্টেডিয়াম। অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ব্রায়ান লারা, সনাথ জয়সুরিয়া, শেন ওয়ার্ন, স্টিভ ওয়াহসহ তৎকালীন বিশ্বের প্রায় সব নামি ক্রিকেটারের দেখা মেলে এই মাঠে। ১৯৮৪ থেকে ২০০৩- এই সময়ের মধ্যে এই মাঠে ১৯৮টি ওয়ানডে আয়োজিত হয়। আর তিন ফরম্যাটে এখন পর্যন্ত ২৬৩টি ম্যাচ আয়োজন হয়েছে এই শারজাহ স্টেডিয়ামে। কেবল শতবর্ষী সিডনি (২৭৭) ও মেলবোর্ন (২৭৫) তাদের চেয়ে ম্যাচ আয়োজনে এগিয়ে আছে। তবে ওয়ানডে আয়োজনে (২৩১) শীর্ষে শারজাহ। শুধু ম্যাচ আয়োজনেই নয়, শারজাহ স্টেডিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রিকেটের নানা ইতিহাসও। ১৯৮৬ সালে এই মাঠেই ভারতের বিপক্ষে শেষ বলে ছক্কা মেরে পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছিলেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। ১৯৯৮ সালে এখানেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইতিহাস গড়া টানা দুই সেঞ্চুরি করেছিলেন শচীন টেন্ডুলকার।

তবে তুমুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে এই স্টেডিয়ামের সঙ্গে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের স্ক্যান্ডালও জুড়ে যায়। দাউদ ইব্রাহিমের মতো মাফিয়া ডনরা এই মাঠকে কেন্দ্র করেই ক্রিকেট জুয়ায় মেতে ওঠেন। কথিত আছে, এই মাফিয়াদের আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের এই শহর ক্রিকেটের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গ্যালারিতে তো তাদের দেখা মিলতই, ১৯৮৭ সালে চার জাতি অস্ট্রেলিয়া-এশিয়া কাপে একটি ম্যাচের সময় ভারতের ড্রেসিংরুমে সাঙ্গোপাঙ্গসহ নাকি ঢুকে পড়েছিলেন দাউদ ইব্রাহিম। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এই ফিক্সিং চরম আকার ধারণ করলে ২০০১ সালে এই মাঠে ভারতীয় জাতীয় দলের খেলা নিষিদ্ধ করে ভারত সরকার। এর পর থেকেই এই মাঠের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ২০০৩ থেকে ২০১০- এই সাত বছর এই মাঠে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজিত হয়নি। তবে নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন দেশ পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে আবার প্রাণ ফিরে পায় শারজাহ স্টেডিয়াম। দুবাই ও আবুধাবির সঙ্গে শারজাহকে হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার শুরু করে পাকিস্তান।

দুবাই ও আবুধাবিতে ক্রিকেট আয়োজন অবশ্য খুব বেশি দিনের নয়। দুবাই স্টেডিয়ামের যাত্রা শুরু ২০০৯ সালে। আর ২০০৪ সালে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করা ২২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত আবুধাবির শেখ আবু জায়েদ স্টেডিয়াম তো বিশ্বের সর্বাধুনিক স্টেডিয়ামের একটি। নতুন নির্মিত দুই স্টেডিয়ামের সঙ্গে আধুনিকতায় শারজাহ পিছিয়ে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটির ক্রিকেট ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সবটুকুই এই শারজাহকেন্দ্রিক। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই স্টেডিয়ামে একটি সমৃদ্ধ ক্রিকেট জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে।

দুবাই এখন ক্রিকেটের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক টি২০ আয়োজনের রেকর্ডটা (৬২ ম্যাচ) দুবাই স্টেডিয়ামের দখলে। এই শহরে আইসিসির সদর দপ্তরও। ক্রিকেট নিয়ন্ত্রিত হয় মধ্যপ্রাচ্যের এই শহর থেকে। করোনার কারণে বিশ্বকাপ ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ায় ক্রিকেটের পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন ফিরে এসেছে।

মন্তব্য করুন