আমাদের গেছে যে দিন, তা যে একেবারেই গেছে- এ দাবি বোধ হয় জোর দিয়ে বলার সময় আসেনি। আপাতত এটুকু বলা যেতেই পারে, ট্রাফিক সার্জেন্টের মতো করোনা যে হাত দিয়ে সভ্যতাকে 'থামুন' দেখিয়েছিল, সেই হাতটা কিছুদিনের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে! এই আনন্দে দিশেহারা উদ্দাম হওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং আমাদের যাপনে এক ধরনের যে 'মিউটেশন' ঘটেছে, সেটা সঙ্গে নিয়েই সারাক্ষণ থাকতে হবে, পৃথিবীকে ফের আগের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে। এই শর্ত আর উপলব্ধি মেনেই ফুটবল ফিরেছে ইউরো-কোপায়, অলিম্পিক ফিরেছে সৌহার্দতায়, আর এবার ক্রিকেটের পালা। ক্রিকেট ফিরছে মরুতে টি২০-এর বিশ্বমেলায়। এমনিতে জুম আর ভার্চুয়ালের নবযুগে ক্রিকেট ফিরেছে অনেক আগেই, বাজারে আইপিএলের মতো বেশ নামিদামি ব্র্যান্ডের টুর্নামেন্টও তার স্বাদ-দর্শন দিয়ে ক্রিকেটপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন ওই আবেগটা মিসিং! অমুক জিতেছে, তুমুক হেরেছেতেই সীমাবদ্ধ বাঙালির ক্রিকেটপ্রেমকে ফের 'পুরোনো সেই দিনের কথা...' মনে করিয়ে দিতে শুরু হচ্ছে ১৬ দলের মহারণ। প্রায় এক মাসের এই ক্রিকেট উৎসবে আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে বরাবরই সরব উপস্থিতি থাকে ষোলো কোটির, এবারও তার ব্যত্যয় হওয়ার কোনো কারণ ঘটেনি। মাসকট থেকে ময়মনসিংহ, দুবাই থেকে দাউদকান্দি- বাংলাদেশের হৃদয় থেকে প্রতি রাতেই 'আরব্য রজনীর' গল্প শোনার জন্য অপেক্ষা করবে।

কিন্তু সেই গল্প শোনাতে পারবেন কি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা। ক্রিকেটের মিনিপ্যাক 'টি২০' আজ নয়-নয় করেও প্রায় দেড় যুগ পার করে ফেলল, ইংল্যান্ড থেকে ছড়িয়ে এখন গোটা ক্রিকেটবিশ্বেই বাগান করে ফেলেছে এই টি২০। কিন্তু সেই কুড়ির বাগানে যে বাংলাদেশ এখনও 'কুঁড়ি'ই আছে! কবে ফুটবে সেই কুঁড়ি, কবেই বা ছড়াবে নিজস্ব মৌতাত। জানে না কেউ। অথচ যখন এ ফরম্যাটটি মাত্র উঁকি দিয়েছিল তখন অনেকেই বলত- যত ছোট সংস্করণ হবে, তত ছোট দলগুলোর (বাংলাদেশ দলকে তখন ছোট দলের তালিকাতেই ফেলতেন বিশ্ব ক্রিকেটের বিশেষজ্ঞরা, যেটা বাংলাদেশিরাও বিশ্বাস করত) সম্ভাবনা বেশি থাকবে। শুরুটা নেহাত মন্দ ছিল না বাংলাদেশের। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৭ প্রথম টি২০ বিশ্বকাপেই গেইল-স্যামুয়েলসদের উইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়েছিল টাইগাররা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টি২০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটিতেই (১৩ সেপ্টেম্বর, জোহানেসবার্গ) জয় পেয়েছিল আশরাফুলের দল এবং আজ অবধি ছয়টি টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আর কোনো টেস্টখেলুড়ে দলকে হারাতে পারেনি! সত্য এটাই যে, বিশ্বকাপের ২৫ ম্যাচের মধ্যে যে ছয়টিতে জয় বাংলাদেশের, তার পাঁচটিই হয় নেপাল, না হয় ওমান, হংকং, তখনকার আফগানিস্তান আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। এমনকি গত তিনটি আসর থেকে আমরা প্রথম পর্বে আইসিসির সহযোগী দলগুলোর সঙ্গে খেলে পরের রাউন্ডের টিকিট নিচ্ছি। অথচ আমাদের পেছন থেকে দৌড়ে এসে আফগানিস্তান এখন মূল পর্বে খেলছে।

তাহলে কি ছোট ফরম্যাটেই ঝাঁজ সবচেয়ে বেশি, এতদিনে দর্শকরা অন্তত মেনে নিয়েছেন সেটা। কুড়ি কুড়ির মঞ্চটা অনেকটা রেসলিংয়ের ডব্লিউডব্লিউইর মতো। এখানে যেমন গায়ের জোর প্রয়োজন, তেমনি মস্তিস্কের বুদ্ধিও প্রয়োজন। শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে এখানে হিসাব-নিকাশ বদলে যেতে পারে। শেষ এখানে তখনই 'শেষ' হয়, যখন আম্পায়ার বেল ফেলে প্যাভিলিয়নে রওনা হন। উদাহরণ অবশ্যই ২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচটিকে আনা যেতে পারে। স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের মুহূর্তগুলো, ৩ বলে জয়ের জন্য মাত্র ২ রানের প্রয়োজন, ক্রিজে মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ- ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে জয়োল্লাসে মেতে উঠেছেন মাশরাফিরা। সেই ম্যাচ কিনা ১ রানে হার- টি২০ যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, সেদিনই বুঝেছিল বাংলাদেশিরা। মুশফিকরাও বুঝতে পেরেছিলেন, এই সংস্করণে ম্যাচ জিততে হলে গায়ের সঙ্গে মনের জোরটাও যথেষ্ট জরুরি। দুটো একসঙ্গে না হলে শুধু 'কপাল' দিয়ে কিছু হয় না। 'আমরা ওদের মতো বাউন্ডারি মারতে পারি না, এজন্য নিজস্ব স্টাইলে আমরা বাংলাদেশি ব্র্যান্ড নামের ক্রিকেট চালু করেছি'- শ্রীলঙ্কায় নিদাহাস ট্রফি কভার করতে গিয়ে এ কথা শুনিয়েছিলেন দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার। কিন্তু 'ব্র্যান্ড অব বাংলাদেশি' ক্রিকেট আসলেই কী, তা আজও বোঝা যায়নি। একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, 'আমাদের শারীরিক গঠন ওদের মতো নয়'- যদি সেটা সত্যই হয়, তাহলে এই অঞ্চলের প্রতিবেশীরা কীভাবে টি২০ বিশ্বকাপ জিতেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই শারীরিক গঠন নিয়েই ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা এরই মধ্যে একবার করে টি২০ বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে।

আসলে অন্য একটা সমস্যা আমরা বরাবরই এড়িয়ে এসেছি। আর সেটা হলো, আমাদের দলটি গত এক দশক থেকে নির্দিষ্ট একটি ছকে বাঁধা পড়েছে। দলের বেশ কয়েকজন তাদের পছন্দ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে গিয়ে খেলতে চাননি। শুরুর সময় (ধরা যাক ২০০৭ বিশ্বকাপ) মোহাম্মদ আশরাফুল আর আফতাব আহমেদের মধ্যে টি২০ ফরম্যাটের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। দুঃখের বিষয়, সেই আশরাফুল পথ হারিয়ে বসেন আর আফতাবও আইসিএলে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেন। এরপর সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ আর মাশরাফি- এই সিনিয়রদের নিয়েই সব বিশ্বকাপ খেলেছে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত মোট ৭২ জন ক্রিকেটার দেশের হয়ে এই ফরম্যাট খেলেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কখনোই সেরা কুড়ি জনও দু'বছরের বেশি স্থায়ী হননি। আশার কথা এখানেই যে, এবার যে দলটি টি২০ বিশ্বকাপে খেলতে গেছে, সে দলটি কিন্তু অনেকটাই ফ্লেক্সিবল। এই যেমন সাকিব তিন কিংবা চার যে কোনো জায়গাতেই ব্যাটিং করতে প্রস্তুত, মুশফিক তার কিপিং গ্লাভস ছাড়তে প্রস্তুত, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও নিচের দিকে ব্যাটিংয়ের জন্য তৈরি। আর দলের বাকিদেরও দলের প্রয়োজনে 'টুলস বক্স' থেকে যে কোনো জায়গায় যে কোনো প্রয়োজনে কাজে লাগানোর লাইসেন্স রয়েছে। সব মিলিয়ে তাই এবার আশা করা যেতেই পারে যে, কুঁড়ি থেকে এবার অন্তত পাপড়ি ছড়াতে পারবে প্রিয় বাংলাদেশ।

আর ওই যে করোনাই তো শিখিয়েছে, সারাক্ষণ ব্যক্তিচিন্তায় মগ্ন আমরা অনেক কিছুই বাহুল্যে পরিণত করেছিলাম, আদায় করে ফেলেছিলাম প্রয়োজনের বেশি, যার অনেকটাই অতিরিক্ত। হয়তো অধিকাংশই।

মন্তব্য করুন