দৈনিক সমকাল পত্রিকাটির ষোলোতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এই আধিপত্যের সময়েও দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার কারণে সকালবেলা সেদিনের খবরের কাগজ হাতে না পেলে নিজেকে মনে হয় এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী। অনেক কাগজের ভিড়ে যে কয়েকটি পত্রিকা পড়ে দেশ-বিদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা করতে পেরেছি বলে মনে হয়, নিঃসন্দেহে সমকাল তার মধ্যে অন্যতম। পত্রিকাটির ষোলোতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আশা করি ভবিষ্যতেও এ রকম জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখেই পত্রিকাটি দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে সক্ষম হবে।

কোনো সংবাদপত্র যখন সংবাদমোদীদের মনে আগ্রহের জন্ম দেয় এবং সেটা ধরে রাখতে সক্ষম হয়, স্বীকার করতেই হবে সংবাদ পরিবেশনায় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তার মূল কারণ। এবং সেটা অর্জন করতে সেই সংবাদপত্রটিকে অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ, সত্যবাদী এবং সাহসী হতে হয়। সেটা না হলে তা কিছু ব্যক্তির সন্তুষ্টি ও মনোরঞ্জনের দায়িত্বটি পালন করতে পারলেও জনগণের পছন্দের ও আস্থার জায়গায় পৌঁছতে পারে না। তার চেয়েও বড় কথা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য গণমাধ্যমের যে প্রত্যাশিত ভূমিকা- সে কারণে গণমাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। তার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য সংবাদপত্রগুলোকে সেই কঠিন ব্রতে সদা নিয়োজিত ও সতর্ক থাকতে হয়। একজন গ্রাহক যখন অনেক প্রকাশনার মাঝখান থেকে একটিকে বেছে নিয়ে তার পকেটের পয়সা খরচ করে সেটিকে হাতে তুলে নেন, মানতেই হবে সেটা গ্রাহকের আস্থার পরিচয় রাখে। আবার যখন গ্রাহকরা বিশেষ কোনো পত্রিকাকে প্রত্যাখ্যান করেন বা সন্দেহের চোখে দেখেন বুঝতে হবে সেই পত্রিকা গণমাধ্যমের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। একটি সংস্কৃতিমান ও দায়িত্বশীল অধিকারবোধ সম্পন্ন সমাজ গঠনে সচেতন নাগরিক এবং সংবাদক্ষেত্রের মধ্যের লেনদেনের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সংবিধান রচনা করেছিলেন তারা তাদের চিন্তা-চেতনায় বিষয়টা কতটা মর্যাদার জায়গায় রেখেছিলেন তার প্রমাণ পাই আমরা আমাদের সংবিধানের উনচল্লিশ নম্বর অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার এবং বাক-স্বাধীনতার সুরক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে একই ধারার দুই নম্ব্বর উপধারায় বলা হয়েছে, সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

এই চিন্তার সূত্র ধরেই মুক্তিযুদ্ধ, দেশ, রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি, সমাজ, আইনের শাসন, নাগরিকের মৌলিক ও মানবাধিকার- এসব বিষয়ে নানান চিন্তা নতুন করে সামনে এসে দাঁড়াল।

একটা দেশে সংবাদক্ষেত্র কতখানি স্বাধীন সেটার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে সে দেশের মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার, তার মতপ্রকাশ করার অধিকার, চিন্তা ও সর্বোপরি বিবেকের স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে যা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। এসব অধিকার সংবিধানের একই অনুচ্ছেদে সমন্বিত করা যে হয়েছে সেটা কিন্তু কার্যকারণ সম্ব্বন্ধবিহীন নয়। কারণ মানুষের বিবেকের স্বাধীনতার সঙ্গে তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যে সমাজে মানুষ নিজের মনের কথা নিঃশঙ্কচিত্তে উচ্চারণ করতে পারে না, সে সমাজে বিবেকের দিশাও হারিয়ে যায়। সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয়।

আজকের বাংলাদেশে তাই অনেক ধরনের সূচকে উন্নয়নের স্বাক্ষর রাখতে পারা সত্ত্বেও সংবিধানের আটাশ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে প্রত্যেক নাগরিকের বৈষম্যহীন জীবন নিশ্চিত করা, অথবা মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার সূচকে বারবার পিছিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাটুকুও মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেনি।

এ কথা সত্য যে, স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়ই বাংলাদেশ নামক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে তার ইতিহাসের চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা, দেশের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সপরিবার এবং তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সহকর্মী ও জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়। প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ নামে ভূখণ্ডটিকে বাংলাদেশের সব আদর্শের বিপরীতে পরিচালনা করা হয়। এই দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক-আধাসামরিক কিংবা গণতন্ত্রের লেবাসে অগণতান্ত্রিক শাসনের প্রান্তে এসে যখন আমরা গণতন্ত্রের অভিযাত্রার সূচনা করলাম তখন দেশটির চেহারায় শুধু নয়, শিক্ষা-সমাজ-সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চিন্তা-চেতনা গভীরভাবে প্রোথিত করা হয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়া সব মানুষের একটি দেশ হবে বলে যাদের প্রত্যয় ছিল তারা ছিয়ানব্বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের প্রত্যাবর্তনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। বিশ বছরের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান ঘটেছে বলে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। তাদের সামনে থেকে যেন একটা লৌহ যবনিকা সরে গিয়েছিল। আবার মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ফিরে পাওয়ার আশায় তারা বুক বেঁধেছিল।

ছিয়ানব্বই থেকে অন্তত তিন বছর, আমাদের অভিজ্ঞতায়, সেই পথে আমরা দৃপ্ত পদে চলেছিলাম। তাই আজকে আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে পাই, মুক্তিযুদ্ধের গান গাইতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলোচনা করতে পারি, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারি, খণ্ডিতভাবে হলেও বাহাত্তরের সংবিধান ফেরত আনতে পেরেছি, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হতে পেরেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে- অনেকে তাদের প্রাপ্য শাস্তিও পেয়েছেন। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, নারী নির্যাতনবিরোধী নীতি ও আইন তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে। এ রকম আরও অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে বাংলাদেশ।

কিন্তু এ কথা সত্য যে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মূল যে অঙ্গীকার ছিল একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ নির্মাণ করার, সেখানে আমাদের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই এবং দুই হাজার এক থেকে দুই হাজার আট পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ক্ষমতার বাইরে থাকা অবশ্যই সমাজ নির্মাণের সেই প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। তবে এ কথাও তো সত্য যে আজকে তারা টানা তেরো বছর সংসদে, রাজপথে কোনো কার্যকর বিরোধিতা ছাড়াই আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তারপরও ব্যক্তি মানসে, সামাজিক আচরণে, শিক্ষায়, সাংস্কৃতিক চর্চায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতিফলনের অভাব বোধ করি কেন? প্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব পালনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির পরিচয় মেলে কেন? মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, মৌলবাদী, সহিংস জঙ্গি রাজনীতি যারা করেন, অথবা তাদের সঙ্গে জোট বেঁধে যারা ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকার কৌশল মেনে চলেন, সে রাজনীতিকদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বলে দাবিদার, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী বলে নিজেদের চিহ্নিত করেন, এমনকি তার নিজের প্রতিষ্ঠিত দলটির নেতাকর্মীরাও কি তাদের নিজেদের কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখেন? খুব স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত যে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন তারা যে কোনো কিছুর বিনিময়ে এ দেশটি তাদেরই ঘোষণা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়ে তুলবেন এবং সাধারণ জনগণকে সেইমতে উদ্বুদ্ধ করে দেশ গড়ার কাজে অংশী করে নেবেন। বাস্তবে আমরা সেটা দেখতে পাই কি? ক্ষমতাসীন এই দল নিজেদের ঘোষিত নীতিরই অনেকগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে পিছপা হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আজকের দেশ পরিচালনা করার ধরন বিশ্নেষণ করলে মনে হয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্রুততম গতিতে ধনী হওয়ার দৌড়ে কত ভালো করা যায় সেটাই উন্নয়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের চেয়ে তাদের জীবন ভাতানির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মেগা প্রকল্প, অধুনা জনপ্রিয় ই-কমার্স থেকে দরিদ্র মানুষের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে প্রাপ্য বসতবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির প্রকোপ থেকে মুক্তি নেই। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে অল্প আয়ের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। সরকারপক্ষের বক্তব্যে দুর্নীতি দমনে বা বাজার নিয়ন্ত্রণে অপারগতার সমর্থনে যুক্তি যে রকম জোরালভাবে উপস্থাপন করা হয় তা দুঃখজনক। কখনও কখনও এসব অভিযোগকে অস্বীকার করা বা অন্য খাতে বাহিত করার যে প্রবণতা প্রদর্শিত হয় তাও রীতিমতো বেদনাদায়ক। এর বিপরীতে যে কোনো ধরনের সমালোচনার প্রতি তীব্র অসহিষুষ্ণতা প্রকাশ করা, সমালোচনাকারীদের আইনি-বেআইনি নানা ধরনের প্রতিফলের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বিরল নয়। পরমত অথবা ভিন্ন মত ও মতালম্ব্বীদের সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আদর্শ যে একটি সমাজের সভ্যতার স্তর নির্দেশ করে সে শিক্ষা আমাদের সমাজে চরমভাবে উপেক্ষিত। সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্ব্বীদের দুর্গোৎসব পালনকে ঘিরে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটানো হলো তা ক্ষমার অযোগ্য। এই ঘটনা প্রতিহত করতে না পারা, এর প্রতিকারের বিষয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এমনকি সাধারণ নাগরিকদের ভূমিকা মানুষকে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। বিভিন্ন দলের একে অপরকে এমনকি ক্ষতিগ্রস্তকে পর্যন্ত দোষারোপ করা, কত কারণে এই হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি সেই অজুহাত দেওয়া, গণগ্রেপ্তার, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে নানা অস্বচ্ছ তথ্য প্রদান, অনুপযুক্ত ধারায় মামলা নথিবদ্ধ করা, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলার পরও আজ পর্যন্ত একটি মামলারও রায় না হওয়া, জনমনে সব মানুষের নিরাপদ, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ এবং সমতার জীবনযাপন ও সুরক্ষা প্রাপ্তির অধিকার সম্পন্ন সমাজ ও দেশ গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কোনো তাৎক্ষণিক উস্কানিতে ঘটেনি। দিনের পর দিন বাধাহীনভাবে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি, নারী অধিকার ও মানবাধিকার কর্মী, প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ ও অমুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে বিষোদ্গার করার সুযোগ পেয়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী কিছু ধর্মব্যবসায়ী, তাদের নিবৃত্ত করার কোনো কার্যকর কৌশলের পরিবর্তে বরং তাদের সঙ্গে আপসের নীতি গ্রহণ করেছে সব রাজনৈতিক দল। এর ভেতর দিয়ে এ দলগুলোর আচরণে সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব যে রকম প্রকটভাবে দৃশ্যমান, তাতে দেশের রাজনীতির সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে পারা যায় না। এই সংকট রাজনীতিকদের নিজের দায় এড়ানোর সংকট। যে কোনো কৌশলে ক্ষমতায় আরোহণ এবং অধিষ্ঠিত থাকার নীতি মেনে চলার সংস্কৃতিকে ধারণ করার সংকট- যার ফলে তাদের কাছে সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করা এবং সুরক্ষা দেওয়ার দায় নিয়ে রাজনীতি করার নীতি অগ্রাধিকার পায় না। সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালনে তারা যখন ব্যর্থ হন, স্বভাবতই ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হয় না। এর সুদূরপ্রসারী ক্ষত ও ক্ষতি হলে সমাজ থেকে পরিচয় নির্বিশেষে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করা যে দৈনন্দিন জীবনাচরণের অপরিহার্য চর্চার বিষয় তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা থেকে মানুষ ক্রমাগত দূরে চলে যায়। আজকে বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন এটাই। তবে এই সংকটের দায় সবার। নয়তো দায়িত্ব এড়িয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা দিনের পর দিন পার পেয়ে যান কী করে? তারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্যতা বোধ করেন না কেন?

এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নিজের দিকে স্বচ্ছ দৃষ্টি মেলে তাকানোর। ব্যক্তিজীবনে, সামাজিকতায়, নাগরিক ভাবনায়, মননে, রাষ্ট্রের সঙ্গে অধিকার ও দায়িত্বের বোঝাপড়ায় আমরা কোন নীতি অনুসরণ করছি? মুখে যা বলছি বিশ্বাস নিয়ে বলছি কি? যা বলছি তা বাস্তবায়নে নিজের ভূমিকাটি সৎভাবে পালন করছি কি? এ প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে ভয় না পেয়ে দেশের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলে আমরা নিজে এবং দেশ ও সমাজ এই সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাবে। সৎ ও সাহসী গণমাধ্যম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সমকালকে আবারও তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আন্তরিক অভিনন্দন।

লেখক
নারী অধিকার কর্মী
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

মন্তব্য করুন