ব্যুৎপত্তিগতভাবে 'দুর্যোগ' শব্দটা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহূত। সভ্যতার শুরুতে দুর্যোগগুলোকে গ্রহ-নক্ষত্রের অনুকূল বা অশুভ বিন্যাসের সঙ্গে তুলনা করা হতো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগকে দেখা হতো সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বা মানুষের পাপের ফসল হিসেবে শাস্তিস্বরূপ। ক্ষেত্রবিশেষে এই ধারণা যুগ-যুগান্তরে রয়েই গেছে। যা বেশি করে আলোচনায় এনেছে কভিড-১৯ অতিমারি। তবে তত্ত্ব তালাশে দেখা যায়, দুর্যোগকে 'অ্যাক্ট অব গড' হিসেবে মেনে নেওয়ার অনেক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যার অন্যতম হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা বলে আমরা নিস্পৃহ থেকেছি। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ বা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এর বড় প্রমাণ রয়েছে এই ভূখণ্ডে। যখন ভৌগোলিক অবস্থানজনিত দুর্যোগপূর্ণ বাংলাদেশকে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) পাক-শাসকেরা অবহেলাই করে গেছে। যার সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে উপর্যুপরি দুটি বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র থেকে। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৭০ সালের নভেম্বরে উপকূলীয় অঞ্চলে শতাব্দীর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, যা 'ভোলা সাইক্লোন' হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

তদানীন্তন পাক-সরকার বাংলার দুর্যোগ আক্রান্ত জনগণের সহায়তায় এগিয়ে না এসে দুর্যোগগুলোকে 'অবশ্যম্ভাবী প্রাকৃতিক দুর্যোগ' হিসেবে মেনে নিতে বলেছে। তত্ত্বীয়ভাবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে দুর্যোগগুলোকে 'প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ' হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের পঞ্চাশের মাঝামাঝি সময়ের সেই দুটি বড় বন্যার কারণে নয়, ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া বাঙালি জাতি তখন বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত নাম। জানা যায়, আন্তর্জাতিক চাপেই পাক-সরকার পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা সমস্যার সমাধান দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জে. এ. ক্রুগের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের বন্যা সমস্যা সমাধানের জন্য 'বন্যা নিয়ন্ত্রণ' বাঁধ নির্মাণের সুপারিশ করে। প্রকৌশলগত সমাধানমতো যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়- তার বেশির ভাগই পরে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে ধরা পড়ে। অবহেলাজনিত কারণে দেশীয় বিশেষজ্ঞ বা জনমতের প্রতিফলন অনুযায়ী কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা না নেওয়াতে এই পদক্ষেপ 'বন্যা নিয়ন্ত্রণ' কৌশল হিসেবে সমালোচিত হয়। ১৯৭৪ সালের বন্যায় যেটি প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রকাশ পায়। ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের উপর্যুপরি দুটি বন্যা এই সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। 'ফ্লাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ড্রেইনেজ (এফসিডি)' নামক সেই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত সেই বাঁধগুলোর প্রায় সবক'টিই অকার্যকর প্রতীয়মান হয়। অধিকাংশই ভেঙে বা ধসে পড়ে- মানুষ, গবাদিপশু, ফসল, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন প্রজাতি ও প্রকৃতির জন্য নিয়ে আসে চরম দুর্ভোগ। 'বর্ষা' যেমন কৃষকের জন্য, দেশের জন্য আশীর্বাদ; বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে নির্মিত সেই বাঁধগুলো বর্ষার পানিকে জমিতে প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে ধীরে ধীরে 'কৃষিভিত্তিক' বাংলাদেশের প্রকৃতি-প্রদত্ত সেচকাজ ও কৃষিকাজকে বিপর্যস্ত করেছে। আর ভয়াবহ বন্যা করেছিল বিধ্বস্ত। আজ যে বন্যা হলেই আমরা সমালোচনামুখর হই, সেই সমস্যা কিন্তু সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকেই। আমরা যা গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকেই পাই। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর দুর্যোগ ও গৃহীত পদক্ষেপগুলো বা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব- সব মিলেই বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে এর সমাধান চেয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিত্যসঙ্গী। বঙ্গোপসাগরে সৌন্দর্য বা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত অথবা সুন্দরবনের মাহাত্ম্য ছাপিয়ে এই ঘূর্ণিঝড়ই বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে বেশি পরিচয় করিয়ে দেয়- যেটা আমাদের বরাবরের দুঃখ। অঞ্চলভিত্তিক হলেও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ফেলে বিরূপ প্রভাব। উপকূলে ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় শতাব্দীর ভয়াবহতম দুর্যোগ হিসেবে পরিচিত। ১০ লক্ষাধিক প্রাণহানি হয়েছিল মানব প্রজাতির আর গবাদি পশুসহ অন্যান্য প্রজাতির ধ্বংসের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। পাকিস্তান সামারিক সরকারের বৈরী আচরণ ও ত্রাণকার্যে বিলম্বের কারণে খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে ঝরে পড়ে আরও বহু প্রাণ। পাক-সরকার তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বিশ্ববাসীর কাছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো পদক্ষেপ তারা কোনোকালেই যে সঠিকভাবে নেয়নি, তা স্পষ্ট হয়। তাদের নির্লিপ্ততা বাংলার মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

দুর্যোগের সংজ্ঞায় তখন এই সত্যটিও যোগ হয়েছে যে, বাঙালির দুর্যোগকালীন, দুর্যোগ-পূর্ব ও দুর্যোগ-পরবর্তী নাজুকতা শুধু প্রাকৃতিক নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এর সঙ্গে রয়েছে নিবিড় যোগসূত্র। 'ভোলা সাইক্লোন' এটাই প্রমাণ করেছে যে, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সরকারি সাড়া বা সহায়তার অভাব স্পষ্টতই 'সামাজিক অবিচার'-তত্ত্বের সমার্থক। যে কারণে আমি বলি যে, বাংলাদেশের দুর্যোগের ইতিহাস যত দীর্ঘ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস ততটা নয়। এই ইতিহাসের শুরুও হয়েছে বাংলাদেশের জন্ম হতে- সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতার হৃদয় হতে। বিশ্ববাসীর কাছে শেখ মুজিবুর রহমান তখন পরিচিত একটি নেতৃত্বের চিত্র।

১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে পাক-সরকারের নির্লিপ্ততা অবলোকন করে তিনি নির্বাচনী প্রচার বন্ধ রেখে দুর্গত এলাকায় ছুটে যান। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ-তৎপরতা শুরু করেন। ২৬ নভেম্বর ১৯৭০ সালে গণ্যমাধ্যমে তার নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তুলে আনা দুর্যোগ আক্রান্ত অসহায় মানুষের ও এলাকার দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। তার এই ভাষণটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যে কাঠামো অনুযায়ী গত এক যুগ ধরে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার 'রোল মডেল' হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি দিচ্ছে। কী ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণে- ফিরে দেখা যাক। তৎকালীন সরকারের চরম ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, 'ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানার দু'দিন আগে সুপারকো ও আবহাওয়ায় উপগ্রহের মাধ্যমে খবর পাওয়া সত্ত্বেও উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহের অধিবাসীদের যথাযথভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়নি। হতভাগ্যদের কিছু লোককে অন্তত অন্য স্থানে সরানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি।'

'এক দশক আগে ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধী আশ্রয়স্থল নির্মাণ, সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্রামসমূহের পুনর্বিন্যাস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। পূর্ণ এক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও এসব পরিকল্পনা একগাদা প্রকল্পের মধ্যে আটকা পড়ে আছে এবং তা এখনও কার্যকর করা হয়নি।' তিনি স্পষ্টত বলেছিলেন, দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচতে হলে এ দেশ স্বাধীন করতে হবে। আর তখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ঘূর্ণিঝড়-দুর্গতদের পুনর্বাসন, গ্রাম পুনর্গঠন- যে কোনো জরুরি সমস্যার সমাধান করতে পারব। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ৯ ডিসেম্বর দেশ-বিদেশের সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে দেওয়া ভাষণেও বঙ্গবন্ধু ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে উপকূলজুড়ে যে বেড়িবাঁধগুলো নির্মিত হয়েছিল, সেগুলোও সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু ত্রাণ তৎপরতা, বাঁধ নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের কাজ অব্যাহত রাখেন। প্রতিষ্ঠিত করেন ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি বা সিপিপি- যেটি এ বছর তার ৫০ বছর পূর্তি পালন করল। সারাদেশে সিপিপির স্বেচ্ছাসেবীরা শুধু ঘূর্ণিঝড়ই নয়, যে কোনো দুর্যোগে সহায়তায় সর্বাগ্রে।

পরবর্তী সময়ে দুর্যোগের এসব সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যা ও ১৯৭১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা সেটি প্রমাণ করে। এই তিনটি দুর্যোগ আবারও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে ও সরকার সমালোচিত হয় দুর্যোগকে ব্যবস্থাপনার আওতায় না রেখে একে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় ও প্রস্তুতির অভাবের কারণে। ১৯৮৭-৮৮ সালের উপর্যুপরি বন্যার পর আবারও বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (ফ্যাপ) স্থানীয় কৃষক ও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের নদীগুলোর গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় না রেখে প্রকৌশলগত সমাধান নিয়ে আসে। কিছু কিছু স্থানে বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন ছিল, তবে তিনটি প্রধান নদীর তীরে দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ সঠিক পদক্ষেপ নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন। তখন পর্যন্ত 'দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা' প্রত্যয়ের আবির্ভাব হয়নি বা স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তখন দুর্যোগে মানুষ-নারী-পুরুষ কীভাবে টিকে থাকে- এ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি তথ্য ও তত্ত্ব তালাশে আমাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা গেছে, দুর্যোগের সাড়াদানে দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষের নিজস্ব গৃহভিত্তিক কৌশলগুলোই তাদের দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সহায়তা করেছে, যেখানে নারীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র যেখানে 'দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্থায়ী আদেশাবলী' বা এসওডি (স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার) তৈরি করা হয়। যেখানে প্রথমবারের মতো দুর্যোগে সরকারিভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার- কার কী ভূমিকা, সেটি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। পরে এভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আদিকল্প পরিবর্তিত হয়ে 'নিয়ন্ত্রণ' শব্দটা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশে দুর্যোগ 'ঝুঁকি হ্রাসের' ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার রূপরেখা তৈরি হয় সরকার ও দাতা সংস্থার সহায়তায়। প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো তৈরি হয়, যোগসূত্র স্থাপিত হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়টি শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে। ২০১০-এ একবার ও ২০১৯ সালে আরও একবার এসওডি হালনাগাদ করা হয় মাঠপর্যায়ে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে দুর্যোগের সময় ঘনত্ব ও সংখ্যা বেড়েছে, যা বাংলাদেশ উপলব্ধি করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। যার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে তার নেতৃত্ব প্রশংসিতই শুধু হয়নি, তাকে বিভিন্ন সম্মানেও ভূষিত করা হয়েছে।

মুজিববর্ষে বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের মর্যাদা। প্রধানমন্ত্রী অর্জন করেছেন জাতিসংঘের 'টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রা' পুরস্কার। কভিড-১৯ মোকাবিলা করে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার 'রোল মডেল' খেতাব ও উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা গতিশীল রাখাটাই এখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রাখা, প্রতিশ্রুত কর্মকাণ্ডগুলো বাস্তবায়ন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগের কথা যদি আলোচনায় আনি তো প্রথমেই আসে বন্যার কথা। বন্যা সমস্যা সমাধানে ইতোপূর্বে নেওয়া যেসব পদেক্ষপ সফল হয়েছে, সেগুলো প্রকল্পভিত্তিক হলেও তার স্থায়ী রূপ দেওয়া, যেমন- বঙ্গবন্ধুর 'মুজিব কিল্লা' পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তৈরি করা হয়েছে নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে। দুর্যোগ সহনশীল ঘর নির্মাণ ও বিতরণ সম্পন্ন হচ্ছে। কভিড অতিমারির সময়ে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও সংশ্নিষ্ট সাড়াদানকারী সংস্থা, দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষ বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি নতুনভাবে কিছু প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপও নিতে শিখেছে। যেগুলো মূল ধারায় নেওয়া প্রয়োজন, যাতে করে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সাড়াদান কর্মসূচি মহামারি বা অতিমারির সময়েও অব্যাহত থাকে। কভিডের সময়ে পুরুষ ও নারীদের আয়মূলক কার্যক্রম অনেকাংশেই সংকুচিত হয়েছে, বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিয়ের হার। অতীতের গবেষণায় আমরা প্রমাণ পেয়েছি, দুর্যোগের সময়ে এ তিনটি ঘটনার মধ্যে বাল্যবিয়ের হার বেড়ে যায়।

তা ছাড়া ভালনারেবল বা নাজুক জনগোষ্ঠী, যেমন- প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রবীণদের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে বা নিরবচ্ছিন্ন হওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানাবিধ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা অবশ্যম্ভাবী। সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে বন্ধে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। গণমাধ্যমে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিগুলো সম্পর্কে বহুল প্রচার আবশ্যক। অতীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পঠন-পাঠন ছিল না, আর তাই ভোগান্তি বেশি ছিল। কিন্তু গত এক যুগ ধরে এ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস এখন সময়ের দাবি। সরকারও এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে জেনেছি। মনে রাখতে হবে, কারা 'দুর্যোগ' বিষয়টির ওপরে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছেন, তারা এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক বহুমাত্রিক জ্ঞানার্জন করছেন। এখানে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য সব বিষয়কেই তারা দুর্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখছেন। তাই এ বিষয়ে তাদের সামগ্রিক জ্ঞান ভবিষ্যতে বিশেষায়িত হিসেবে বাংলাদেশে সমাদৃত হবে। এরই মধ্যে আমাদের শিক্ষার্থীরাও বিশেষজ্ঞদের মতোই বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেসরকারি সংস্থায় কর্মক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে নীতিমালা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। জনগণের দুর্যোগের অভিজ্ঞতালব্ধ লোকায়ত জ্ঞানগুলো ধরে রাখতে হলে গবেষণার বিকল্প নেই। তাই দুর্যোগ গবেষণাকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে বর্তমান সরকার- যেটি অব্যাহত রাখা জরুরি। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি চলমান রাখা; রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন ও উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথ মসৃণ করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার 'রোল মডেল' খেতাবটি বাংলাদেশেরই থাকবে- এই প্রত্যাশা।

লেখক

উপ-উপাচার্য

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ


মন্তব্য করুন