আজ সর্বজনবিদিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্ববাসী অত্যন্ত সল্ফ্ভ্রম ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশের উদ্ভব এবং বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে উৎকীর্ণ হওয়াটা বিংশ শতাব্দীর একটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা হিসেবে আজ সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং আয়তনের দিক দিয়ে ছোট একটি দেশ সমগ্র বিশ্বের বিস্ময় হয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ছেড়ে বিলেতি শাসকরা চলে যাওয়ার পূর্বে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে আমাদেরকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ভারত উপমহাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে। আমরা হয়ে গেলাম পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা। আমাদের জীবনে নেমে এসেছিলে তখন ঘোর অনামিশা। যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের মতো জীবন্ত বর্ষীয়ানরা।

এই দাসত্ব শৃঙ্খল আফ্রিকার কালো মানুষদের ওপর নেমে আসা ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের শৃঙ্খলের চেয়েও কঠিন ছিল। আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। ভাষার অধিকার থেকে শুরু জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার হারালাম। এককথায়, আমরা পশ্চিম পাকিস্তানি প্রভুদের দাসে পরিণত হলাম; শিক্ষা ও পেশায় সকল ক্ষেত্রে আমরা বঞ্চিত হলাম। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ; দীর্ঘ ২৪ বছর আমাদের দেহ ও হৃদয়ের রক্তক্ষরণের পরেও আমরা আশা ছাড়িনি। আমরা আমাদের বাঙালিত্ব অর্জনের সংগ্রাম চালিয়ে গেছি। আমাদের জীবন সংগ্রামের অগ্রভাগে এসে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের অনেক ত্যাগী পুরুষেরা এবং তাদের অগ্রভাগে এসে বিজয় পতাকা হাতে তুলে নিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্পূর্ণ বাংলার মাটি থেকে উৎসারিত, বাংলার মাটিতে শিকড় প্রোথিত মানুষটিই আমাদের ভয়ংকর কালো গুহার মধ্য দিয়ে আমাদের সবাইকে নিয়ে পথচলা শুরু করলেন। ১৯৫২ সালে আমরা রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষার অধিকার ছিনিয়ে আনলাম পাকিস্তানি শাসকদের বজ্র-নিষ্ঠুর মুঠো থেকে। সেই সংগ্রামেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অনন্য। তারপর একের পর এক আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের ভয়ংকর ও জটিল গ্রন্থি পার হয়ে, আমরা 'নব প্রভাতের শিখর চূড়ায়' এসে দাঁড়ালাম। ১৯৭১ সালের ২৬-মার্চ বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের বক্তৃতা মানব ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ভাষণের স্বীকৃতি পেল। এই বক্তৃতা ছিল দেশ পরিচালনার ব্যবস্থাপত্র এবং যুগপৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তি সংগ্রামের সর্বকালের এবং বিশ্বের সর্বজনগ্রাহ্য সেরা বক্তৃতা। গণনায়কদের কণ্ঠে উচ্চারিত বিশ্বের সকল মুক্তি সংগ্রামের নায়কদের মধ্যে আমাদের জাতির পিতার বক্তৃতাই বিশ্বের সেরা স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনের বক্তৃতা হিসেবে মানব ইতিহাসে উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে। পাশাপাশি আমি জাতীয় সব নেতার অবদানের কথা, মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষের জীবন উৎসর্গ এবং দুই লাখ মা- বোনের সল্ফ্ভ্রমহানির রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রতি অবনতচিত্তে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমার্থক। তিনিই আলোর বর্তিকা হাতে আমাদের তথা বাঙালিদের মুক্তিদাতা হিসেবে ইতিহাসে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।

২৬ মার্চ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে এক বিধ্বংসী সেনা অভিযান চালিয়ে দেশের অগণিত মানুষকে নিধন ও নির্যাতন করে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আবদ্ধ করে তার ওপর নানাভাবে মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কারাগারের পাশে তার কবরও খোঁড়া হয়। অকুতোভয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি মুসলমান, আমি বাঙালি এবং আমি মানুষ, আমি একবারই মরব।

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানি শাসককুল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তিনি মুক্ত হয়ে সংক্ষিপ্ত সফর শেষে বিলেত এবং ভারত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি পুরোনো তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে তার প্রিয় সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে মিলিত হন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মাথা তুলে তার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের 'দুই বিঘা জমি' কবিতা থেকে আবৃত্তি করলেন- 'নমো নমো মম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি। গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি'। বঙ্গবন্ধু বিলেত ও ভারত হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মাটিতে পা দেওয়ার আগেই রবীন্দ্রনাথের গান আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি-কে আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে চূড়ান্ত করেছিলেন। পুরোনো তেজগাঁও বিমানবন্দরে নেমেই তিনি নিজ গৃহে না গিয়ে দেশের মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সেদিনের রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ফিরে গেলেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে এবং প্রায় দুই লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রম বিসর্জনের বিনিময়ে আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। আমি আমাদের আলোর দিশারী বঙ্গবন্ধু, তার সহকর্মী ও তার স্বজন, জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং সব বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ আমাদের সাহায্যকারী দেশ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাকে স্মরণ করে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের অকল্পনীয় হিরণ্ময় ক্ষণকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

দেশে ফিরে এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পার্লামেন্টারি প্রথায় স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তার নির্দেশে নতুন করে স্বাধীন বাংলাদেশের গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করা হলো যার প্রধান স্তম্ভগুলো ছিল জাতীয়তাবাদ, অসম্প্রদায়িকতা, গঠনতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র। তিনি পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত একটি শ্মশানভূমিকে দেহ-প্রাণ ঢেলে দিয়ে দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়লেন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভঙ্গুর দেশকে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে খুব কম সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেন। কিন্তু বাঙালির ভাগ্যে সুখ চিরজীবী হলো না। আবার শকুন পড়ল এই বাংলায়। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে তথাকথিত কতিপয় বিপথগামী মিলিটারি অফিসারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হতে হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান যেমন ছিল যুগান্তকারী ঘটনা তেমনি একইভাবে পরিবারের ১৭ জনকে নৃশংসভাবে নিধন করার ইতিহাস বিশ্বে নজীরবিহীন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা এর আগেও আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন কিন্তু তা ছিল ব্যক্তির হাতে ব্যক্তির নিধন কিন্তু সপরিবারে নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে কখনও সংঘটিত হয়নি। বিদেশে অবস্থান করার কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই আদরের কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক দুঃখকষ্ট-সাধনার মধ্য দিয়ে পিতার হাতের আলোকবর্তিকাটি তুলে নিয়ে বর্তমানে আমাদেরকে উন্নতির মহাসড়কে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কথায়- 'অজস্র মৃত্যুজয়ে পার হয়ে আজ নব প্রভাতের চূড়ায়' দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে দেশের সব ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নতি ও সাফল্য ঈর্ষণীয়। আমরা উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হবো আজ থেকে বিশ বছর সময়কালের মধ্যে। আজ অতিমারির দুঃসময়েও আমাদের দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে।





তারপরেও কথা থেকে যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল নায়করা কে বা কোন চক্র, আমরা আজও তা সঠিকভাবে জানি না। দেশি ও বিদেশি সেই চক্রটি কি নিশ্চিহ্ন হয়েছে? আমরা জানি না। তারা কি সুযোগ পেলেই আমাদের বাঙালিত্বকে নিধন করবে না? আমরা কি সম্পূর্ণ নিস্কণ্টক হতে পেরেছি? এ প্রশ্ন আজও আমাদের তাড়িত করে। অসাম্প্রদায়িক ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সাধারণ কর্মজীবী মানুষদের বাংলাদেশ আজ কি পাকাপোক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? আমরা যারা সাধারণ নাগরিক, তাদের জাগরণে ও নিদ্রায় আজও এই প্রশ্ন তাড়িত করে।

বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত জাতীয় চার নীতিমালা কি সুস্থ ও অবিকল আছে? মৌলবাদ কি এদেশ থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়েছে? আমরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষরা চাই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ থাকবে না, মৌলবাদ চিরতরে দূরীভূত হবে। বঙ্গবন্ধুর অনেক কষ্টে অর্জিত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে নব্য রাজাকার ও আলবদরদের উত্থান দেখতে চাই না। দেশি ও বিদেশি শত্রু যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজও মানতে পারেনি, তারা কি সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত? আমি জানি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা এসব ব্যাপারে সজাগ আছেন। বঙ্গবন্ধুর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরে যে নিষ্ফম্ফলা ও নিষ্ঠুর শাসকরা দেশ পরিচালনা করেছিলেন, তাদের লৌহ আলিঙ্গনে আর আমরা আবদ্ধ হতে চাই না। সুস্থ গণতন্ত্র চর্চা আমাদের দেশে অব্যাহত থাক- এটাই আমাদের কামনা। আমার বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভ্যতার সংকটে বর্ণিত উচ্চারণ আমাদের জীবনে ধ্রুব হোক যে, একদিন সভ্যতা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মানবতার সূর্য পূর্ব দিগন্ত থেকেই উদিত হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশ বছরের প্রান্তে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ বাক্য আছে- টাকা নষ্ট হলে কিছুই নষ্ট হয় না, স্বাস্থ্য নষ্ট হলে কিছু নষ্ট হয় কিন্তু চরিত্র নষ্ট হলে সবই নষ্ট হয়। যে নীতিমালা, প্রত্যয়, সংগ্রাম ও ভালোবাসার জোরে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমগ্র দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে, তার যেন ব্যত্যয় না ঘটে। লখিন্দরের জতুগৃহ দিয়ে কখন আবার সাপ ঢুকে পড়বে; তার নিশ্চয়তা আছে কি? সেই সাপের বংশধর ও জাতকেরা দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে কি? সুতরাং, আমাদের গা-ছেড়ে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সম্প্রতি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সে চক্রান্ত আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। বাংলাদেশের মানুষদের সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়ে আমি আমার সামান্য মতামতের ইতি টানছি। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। দেশের জয় হোক, কল্যাণ হোক দেশের মানুষের। া



লেখক

নাট্যব্যক্তিত্ব

মঞ্চসারথি

মন্তব্য করুন