'বাংলার লক্ষ গ্রাম নিরাশায় আলোকহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেজ/সূর্যঅস্তে চলে গেলে কেমন সুকেশী অন্ধকার/খোঁপা বেঁধে নিতে আসে- কিন্তু কার জাতে?/আলুলায়িত হয়ে চেয়ে থাকে- কিন্তু কার তরে?/জাত নেই- কোথাও মানুষ নেই; বাংলার লক্ষগ্রাম রাত্রি একদিন/আলপনার; পটের ছবির মতো সুহাস্যা, পটলচেরা চোখের মানুষী-/হতে পেরেছিল প্রায়; নিভে গেছে সব।'

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৬ সালে বাংলার বহুমাত্রিক আলোকহীনতার কথা লিখতে গিয়ে বুঝিবা নিজেরই ঈপ্সিত চিরায়ত বাংলার আসন্ন প্রায় সর্বনাশের ইঙ্গিত পেয়ে নিরুপায় আর্তিতে মুহ্যমান হয়েছিলেন। লিখেছিলেন নিরাশার আলোকহীনতায় ডুবে যাওয়ার যন্ত্রণা-কথা অমোঘ হয়ে উঠেছিল এই উচ্চারণে : 'নিভে গেছে সব'। কবি জীবনানন্দ যখন এই পঙক্তিগুলো লিখছিলেন, সে সময় বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বেষপ্রবণ রাজনৈতিক আধিপত্যবাজ-বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের চিরায়ত সহাবস্থানের সত্যকে বলি দিচ্ছিল সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে। শরৎচন্দ্র বসু-আবুল হাশিম-ফজলুল হকদের বিকল্প ভাবনা-ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তুমুল মিথ্যার সন্ত্রাসে।

১৯৪৭ সালে বাঙালি জাতির প্যারাডাইজ লস্ট-এর মর্মান্তিক আখ্যান আত্মঘাতী আঁধিতে হারিয়ে গেল। আমাদের স্মৃতি এতই ক্ষীণজীবী যে পরবর্তী-প্রজন্মগুলোর কাছে ইতিহাসের অন্ধবিন্দুগুলো কোনো দিনই উন্মোচিত হলো না। দু'রকমভাবে অলীক দেশের অভিজ্ঞান বিচার বুদ্ধিকে দশকের পর দশক ধরে আচ্ছন্ন করে রাখল। তাই দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনে দেশভাগের মতো বাঙালি জাতির আদি পাপ আড়ালে চলে গেল। পুঁজিপতিবর্গের বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির সোপানকে বিঘ্নহীন করাকেই অনেকে ভেবে নিলেন মুক্তি ও ক্ষমতা অর্জনের প্রাক্‌-শর্ত। বাঙালি আর বাঙালি রইল না। সেদিনকার চরম বিকার ও বিভ্রান্তির প্রায়শ্চিত্ত খণ্ডিত ভারতের প্রতিটি বাঙালি-বসতিতে ইদানীং শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মূল উৎস যে আত্মপ্রতারণার কালো ইতিহাসে প্রচ্ছন্ন রয়েছে, সেকথা এখনও প্রায় কেউই বিবেচনা করছেন না।

অথচ এই বিশ্বে বাঙালি জাতির অবস্থান সংখ্যার নিরিখে পঞ্চম। এদের মধ্যে অধিকাংশই রয়েছেন বাংলাদেশে। আজ একুশ শতকের তৃতীয় দশকের সূচনাপর্বে দাঁড়িয়ে, নির্মোহভাবে বাঙালি জাতির সংকট ও উত্তরণের সম্ভাবনা নতুনভাবে বিশ্নেষণ শুরু হোক। সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কারণে প্রব্রজিত বাঙালি খণ্ডিত ভারতবর্ষে যে অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইদানীং, তা কার্যত মহাকাব্যিক বিস্তার ও ট্র্যাজেডির তীক্ষষ্টতাসম্পন্ন। বিশ শতকের অন্তিম পর্ব থেকে যেভাবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তথ্য ও সত্য অহরহ পুনরুৎপাদিত ও পুনরুত্থাপিত হয়ে চলেছে, তাতে আক্রান্ত বাঙালি স্বত্বনত্ব ভুলে নিজের পরম্পরা ও বৈশিষ্ট্য প্রভুশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে। একুশ শতকে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর, বিশ্বময় প্রব্রজিত বাঙালি কার্যত ছিন্নমূল ও সামূহিক স্মৃতিলোপের শিকার। ইংল্যান্ডে-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে-অস্ট্রেলিয়ায়-ইউরোপের নানা দেশে যেসব বাঙালি নিজেদের বসতি তৈরি করেছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থে বাঙালিয়ানা বা স্মৃতির গ্রন্থনাকে মান্যতা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

ফলে উত্তর-প্রজন্মের বাঙালিরা জাতিসত্তার নিরিখে নামেমাত্র বাঙালি থাকছে, বাস্তবে নয়। এই সংকটের মোকাবিলা করার কথা কেউ ভাবছেন কি কোথাও? ব্যবহারিক স্বার্থের দোহাই দিয়ে শিকড়চ্যুত এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অদূর ভবিষ্যতে কি অ্যালেক্স হাইলির 'ঞযব জড়ড়ঃং' লিখিত হবে? সম্ভবত হবে না। কারণ শিকড়ের জন্যে কোনো শোক বা আগ্রহ প্রব্রজিত বাঙালির বেশিদিন অবশিষ্ট থাকে না। এ কেবল বহির্বিশ্বে প্রব্রজিত ও আত্মবিস্মৃত বাঙালির অভিজ্ঞানজনিত সংকট নয়, খণ্ডিত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের ক্ষেত্রেও তা মর্মান্তিক সত্য। নইলে বাঙালি-সত্তা ও তার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য যখন ধর্মান্ধ অপশক্তির সর্বাত্মক আক্রমণের লক্ষ্য, বাংলাভাষীরা এত সহজে বিভাজিত হতো না। আমরা ভুলে গেছি ভাষাচার্য শহীদুল্লাহর সেই পথপ্রদর্শক বক্তব্য যে বাঙালিত্ব টিকিতে- দাড়িতে, লুঙ্গিতে-ধুতিতে নির্ভর করে না। মহান চিন্তাবিদ আহমদ শরীফ বাঙালি জাতির অভিজ্ঞান কীভাবে নির্দেশ করেছিলেন তাও মনে রাখিনি কেউ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি কত সুচতুরভাবে দীর্ঘদিন ধরে ফন্দি-ফিকির করে বাঙালির কোমর ভেঙে দিতে পেরেছিল, এক প্রণালিবদ্ধ অধ্যয়ন হয়তো আমাদের চেতনা ফিরিয়ে দিতে পারত। শুধু তা-ই নয়, উপনিবেশোত্তর পর্যায়ে নানা বর্গের ভাষিক আধিপত্যবাদ যে বাঙালিকেই তাদের সাধারণ শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের আগ্রাসনে বাঙালির অস্তিত্ব এবং নাগরিক অধিকারই নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে- সেই পর্যালোচনাও জরুরি। পূর্ব পাকিস্তানের পাঁজর থেকে বাংলাদেশের মহিমময় জন্ম হয়েছে উর্দু আধিপত্যবাদকে প্রতিরোধ করে। তবে ইতিহাস তো একই ছন্দে-লয়ে গড়ে ওঠে না। তাই নিপীড়িত বাঙালি সর্বত্র অভিন্ন ধরনে কালের মন্দিরা শুনতে পায়নি। বরং আত্মঘাতী সত্তা-বিস্মরণের আঁধিতে ডুবে গেছে। ফলে জাতিসত্তার প্রতি দায়ােধ অটুট না থাকায় নিজেদের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান নির্দি্বধায় বিসর্জন দিয়েছে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে। এই সংকট কত সর্বগ্রাসী এই উপলব্ধিও নেই। ব্যাধি তাই কার্যত চিকিৎসার অতীত।

আর বিশ্বের নানা প্রান্তে যেসব বাংলাভাষী রয়েছেন, তাদের প্রত্যাহ্বান পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের। সমস্ত দিক দিয়ে তারা রয়েছেন একেবারে আলাদা সামাজিক, সাংস্কৃতিক-বৌদ্ধিক আর্থ-রাজনৈতিক পরিসরে। বৈষয়িক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার তাগিদে তাদের অনেকেই স্বেচ্ছায় নিজস্ব উৎস ভূমিতে নিহিত শিখর উপড়ে নিয়েছেন এবং উত্তর প্রজন্মকে সচেতনভাবে বিশ্ব-নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এদের মাথার উপরে আকাশ আর পায়ের নিচে জমি খুঁজে নেওয়ার কোনো তাগিদও নেই। তা হলে আমরা যে বাঙালিসত্তার সার্বিক উদ্ভাসন চাই, এর শরিক কি সবাই হতে পারবে না, কিংবা হতে চাইবে না? এই জিজ্ঞাসার কোনো সহজিয়া মীমাংসা নেই, বরং ভাবা যাক, সংকট যত তীব্র উত্তরণের সম্ভাবনাও তত বেশি অবাধ অগাধ। নইলে অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর প্রতীতি মিথ্যা হয়ে যাবে। বাঙালি জাতির ইতিহাস পুনঃপাঠের আগ্রহ ইদানীং ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে যদিও বিশ্বায়নের স্বর্ণমৃগয়ায় লুব্ধ উত্তর-প্রজন্মের মধ্যে আপন বর্ণমালার প্রতি আত্মঘাতী অনীহাও দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। আমাদের জাতিসত্তার প্রাক্‌-ইতিহাস ও প্রাচীন যুগ সম্পর্কে কালজয়ী রচনার অভাব নেই। মধ্যযুগের বিভিন্ন প্রবণতা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনাও পেয়েছি। তুলনামূলকভাবে দ্বন্দ্ববিক্ষত আধুনিক পর্বের বস্তুনিষ্ঠ সামগ্রিক বিশ্নেষণ আজও উপেক্ষিত। ঔপনিবেশিক পর্ব থেকে উপনিবেশোত্তর পর্যায়ে বিবর্তিত জাতিসত্তার জটিল ধুপছায়া সম্পর্কে সতর্ক পর্যালোচনা ছাড়া শিকড়-সংলগ্ন ও শিকড় বিচ্যুত বাঙালির সার্বিক সংকট অনুধাবন করা অসম্ভব।

রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বাত্মক মদতে ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-পুঁজির নিজস্ব পাটিগণিতে বন্দি বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন ধরনের প্রভুত্ববাদের মোকাবিলা করে যেতে হচ্ছে আজও। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান এখনও নানাভাবে অনিকেত। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাভাষীদের বেশ বড় অংশ ইদানীং ইতিহাস সম্পর্কে নিস্পৃহ এবং আত্মপ্রতারক বৈষয়িক প্রতিষ্ঠার মোহে ছিন্নমূল। উর্দু আধিপত্যের অবসান হয়েছে বাংলাদেশে কিন্তু বিশ্বায়নের মরীচিকা বিপুলভাবে প্রসারিত হওয়ায় অনিবার্যভাবে ইংরেজি ভাষার দাপট চিন্তায়-মননে-জীবনযাপনের প্রতিটি অনুপুঙ্খে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে আসামে ত্রিপুরায় এবং ভারতজুড়ে প্রব্রজিত বাঙালির বসতিগুলোতে হিন্দি ও ইংরেজির যুগ্ম নাগপাশে স্বেচ্ছাবন্দি বাঙালি জাতি আত্মক্ষয় ও আত্মনিরাকরণের ট্রাজিক বয়ান রচনা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। একচক্ষু হরিণের ভূমিকা গ্রহণের ফলে বিষবৃক্ষ ইদানীং মহিরুহে রূপান্তরিত। খোদ পশ্চিম বাংলায়, এমনকি শতচ্ছিন্ন বাঙালির হূৎপিণ্ড কলকাতা মহানগরীতে দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে। সম্প্রতি 'সারা ভারত বাংলা ভাষামঞ্চ' নামে নিবেদিতপ্রাণ একটি সংগঠন এইজন্য যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-নজরুল-ওয়ালীউল্লাহ-শামসুর রাহমানের মাতৃভাষা বাংলাকে কেন ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর কৌতুকের মুখোমুখি হতে হচ্ছে?

কেননা ঔপনিবেশিক বিদেশি শক্তির ধারাবাহিক চক্রান্ত যেমন আমরা অনুভব করিনি, তেমনিই অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের বিভাজনপন্থা এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কুহেলিও অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই ক্রমাগত বেশি হিন্দু ও বেশি মুসলমান হতে গিয়ে একবারও ভাবিনি :হিন্দু-বৌদ্ধ-ইসলামিক লোকায়ত উপাদানের সার্থক সংশ্নেষণে উদ্ৃব্দত হয়েছে বাঙালি সত্তা। ভাবিনি, ভিন্ন ভাষাভাষী উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুঁজিপতি দ্বন্দ্বে বাঙালি হয়েছে দাবার বোড়ে। নইলে কি আমরা গঙ্গারিডি-বঙ্গ গঠনের পর্ব থেকে চর্যাপদ হয়ে আবহমান বাঙালির অবিভাজ্য সংস্কৃতিকে আত্মহননের নেশায় ছিন্নভিন্ন করে দিই? বিদেশি ও দেশি আধিপত্যবাদের ফাঁদ ও চক্রান্তের কাছে আমরা ধারাবাহিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছি। আমাদের মধ্যে স্বরাজ তাই জাগেনি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন-নেতাজি সুভাষচন্দ্র-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাগরণী বার্তা আমরা সত্যিই কি অনুভব করেছি কখনও? আর সবার ওপর রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি সাম্প্রতিক বিশ্বে বহুবিধ সংকটতাড়িত বাঙালির কাছে এখনও উত্তরণের, সম্ভাবনার, উদ্ভাসনের বিশল্যকরণী হিসেবে গণ্য হতে পারেন। বঙ্গভঙ্গের অভূতপূর্ব উদ্দীপনার দিনগুলোতেও তিনি বাঙালি হিন্দুর আত্মসমালোচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে লিখেছিলেন, 'একথা বলিয়া নিজেকে ভোলাইলে চলিবে না যে হিন্দু ও মুসলমানের সম্বন্ধের মধ্য কোনো পাপই ছিল না, ইংরেজই মুসলমানকে আমাদের বিরুদ্ধ করিয়াছে... শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না, অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে।' (বঙ্গভঙ্গ) কিন্তু ওই ছিদ্র মেরামত করার বদলে বাঙালি হিন্দুরা আগাগোড়া এর অস্তিত্ব সম্পর্কেই অনবহিত রয়ে গেছেন। এমন কি হিন্দুয়ানির নামে আচার ও ছোঁয়াছুঁয়ির বাতিক নিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের মৌলিক মানুষ পরিচয়কে স্থূলভাবে অপমান করেছেন। 'দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে/অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে'- সর্বজনবিদিত কবির এই বাচন কত বহুমাত্রিক তা দেশভাগ হওয়ার আগে এবং পরে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

এবং এখনও একুশ শতকের প্রারম্ভিক দুটি দশক পেরিয়ে এগিয়েও আশপাশে দেখতে পাচ্ছি ঘৃণা ও বিদ্বেষের বর্বরোচিত অভিব্যক্তি। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশ্রয়ে তারই সর্দার-মোড়লেরা প্রকাশ্যে বর্বরোচিতভাবে আদিম যুগের হিংস্র অসহিষ্ণুতাকে মারীবীজের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাঙালি মৃগয়ার নতুন নতুন প্রকল্প আবিস্কৃত হচ্ছে। কিন্তু আত্মহননের বিমূঢ়তায় বাঙালিরাই সর্বত্র হিন্দু-মুসলমান ঘটিত সংঘাত বাড়লে বর্ণ হিন্দুতে-তপশিলিতে বিভাজিত হয়ে জাতীয় শত্রুদের পদলেহন করে চলেছে অভাবিতপূর্ব নির্লজ্জতায়।

সাম্প্রতিককালের তিক্ত-কথার অভিজ্ঞতা থেকে বাঙালি যদি কোনো পাঠ নিয়ে থাকে, সংকটকে অন্তত যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারবে এবং উত্তরণের সম্ভাবনাও খুঁজে নিতে সমর্থ হবে। তবে সেই জন্যে অতীতের গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিও পুনর্বিবেচনা করা আবশ্যিক। নইলে রবীন্দ্রনাথ-নেতাজি সুভাষচন্দ্র-কাজী আব্দুল ওদুদ-নীহার রঞ্জন রায়-বিনয় ঘোষ-শহীদুল্লা-আমহদ শরীফদের চেতনায় কীভাবে পুনঃসঞ্জীবিত করব নিজেদের?

এই নিরিখে মনে পড়ে বাঙালি জাতির আহত আত্মমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যখন বিদেশি দ্রব্য বয়কট করার মধ্যে ব্যক্ত হচ্ছিল, তার সূচনা পর্বে 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার সম্পাদকীয়তে কৃষ্ণকুমার মিত্র আবেগস্পন্দিত ভাষায় লিখেছিলন- 'বঙ্গেও অঙ্গচ্ছেদ হইলে বাঙালির চিরাশৌচ হইবে। যতদিন ছিন্ন অঙ্গ পুনরায় একত্র না হয়, ততদিন বাঙালি নানা চিহ্ন ধারণ করিবে। বাঙালির আমোদ-প্রমোদ বন্ধ হইবে। বাঙালি আমোদ-প্রমোদ পায়ে ঠেলিয়া সমস্ত বঙ্গ এক করিবার মহাসাধনায় প্রবৃত্ত হইবে। যতদিন সাধনায় সিদ্ধ না হইবে তপশ্চর্যা করিবে'। কিন্তু পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে সেই মহাসাধনায় প্রবৃত্ত হওয়ার বদলে এবং তপশ্চর্যার পরিবর্তে বাঙালি শুধুই ছিন্নভিন্ন হয়েছে এবং নিজেদের চারদিকে জতুগৃহ তৈরি করেছে। আজ যখন বিশ্বময় ছড়িয়ে যাওয়া বাঙালির বিপুল আত্মবিস্মরণ দেখতে পাই এই সিদ্ধান্ত কি অনিবার্য হয়ে ওঠে না যে 'দেশের বিছিন্ন শক্তিকে একস্থানে সংহত' করার জন্য রবীন্দ্রনাথের ব্যাকুল আহ্বানের তাৎপর্য আমাদের পূর্বাজরা অনুধাবন করতে চাননি। তেমনি ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ফেডারেশন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সমবেত হাজার হাজার মানুষের সামনে দেশনায়ক আনন্দ মোহন বসুর যে লিখিত ভাষণ পাঠ করা হয়েছিল তার অন্তর্নিহিত বার্তাও কি অনুভব করেছিলেন? আনন্দ মোহন বলেছিলেন:'হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান-উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম আমরা সবাই এক অবিভাজ্য দেশের অধিবাসী। যার তলদেশে গর্জমান সমুদ্র। বন্ধুগণ আরেকবার অন্তর থেকে সবাই উচ্চারণ করুন বাংলা অবিভাজ্য, এই চিরপ্রিয় মাতৃভূমি আমাদের সকলের, ধর্মমত বিষয়ে আমাদের মধ্যে যতই প্রভেদ-বিভেদ থাকুক মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য পালনের ধর্মই ক্রমশ হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের মিলনে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে।'

আজ আমাদের সামনে রয়েছে ১৮৭৪-এর নিঃশব্দ বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ পর্যন্ত ব্যাপ্ত তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ ইতিহাস। রয়েছে ১৯৪৭-পরবর্তী আংশিক উদ্ভাসনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন তিমির-প্রয়াণের ইতিকথাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে ভ্রান্তি-সংশোধনের ইশারা করেছেলিন। বাঙালি অস্তিত্ব-সংকট নিরসনের উজ্জ্বল পথ খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু আরও বহুসংখ্যক প্রান্তিক বাঙালি তার চোখ থেকে ধূলি সরাতে চায়নি। এর বিষময় পরিণাম এখন নানাভাবে স্পষ্ট। আর দেশে দেশে প্রব্রজিত বাঙালিরা নিজেদের উন্মূল দশা সম্পর্কে উদাসীন থাকার ফলে জাগরণের অনৈকান্তিক বিচ্ছুরণ থেকে পাঠ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু সংকটকে তো অস্বীকার করা যায় না। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ভাবুকদের তাই পুনর্জাগনের উপায় খুঁজে নিতে হবে ইতিহাসের ট্র্যাজিক উল্লাস থেকেই। শঙ্খ ঘোষের কিছু পঙ্‌ক্তি অবচেতন থেকে কেন উঠে আসছে জানি না। সমাপ্তিবিহীন এই প্রতিবেদনের ভরতবাক্য বরং রচিত হোক তা-ই দিয়ে-

'ভয় দেয় উদাসীন জল/মানুষের স্মৃতিও তরল/ঘোর রাতে আমাদেরই শুধু/বারে বারে করো ভিৎহারা?/সকলেই আছে বুকজলে/কেউ জানে কেউ বা জানে না/আমাকে যে সহজে বোঝালে/প্রণাম? তোমাকে বৃষ্টিধারা'

সংকট যত তীক্ষষ্টতর ও তীব্রতর হোক, বাঙালি সত্তার স্মৃতি তরল হোক, ভিৎহারা হওয়ার বেদনা অনুভব করুক-তবু জেগে থাকতে হবে এবং জাগিয়ে রাখতে হবে নিজেদের। রূপসী বাংলার মায়াবি দর্পণ যেন স্বপ্ন দেখিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। যাতে রচিত হতে পারে জাতিসত্তার নতুন বাস্তব।



লেখক

শিক্ষাবিদ

প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন