সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশে বহু উচ্চারিত, বহু আলোচিত বিষয় এবং ইতিহাসে, জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অনেকবার বিড়ম্বনা ও বড় বড় সংকটের উৎস। তবু এই প্রপঞ্চটির স্বরূপ বোঝা ও সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন বলে মনে হচ্ছে। কারণ আমরা স্বস্তি পেতে চাই, বাহবাও পেতে চাই এই কথা ভেবে ও বলে যে, বাংলাদেশ হাজার বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা নেই। অপশক্তি হিসেবে অল্পকিছু লোক চক্রান্তমূলকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করে যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে সরকারের পুলিশ-প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে আমাদের এই দাবি ও ধারণা মেলে না।

সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে প্রায় ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জেলায় হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মস্থান ও সম্পত্তির ওপরে আক্রমণ চালানো হয়েছে। কয়েক জায়গায় প্রাণহানি ঘটেছে। সদ্যসমাপ্ত শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডপে হনুমানমূর্তির পায়ের কাছে কেউ কোরআন রেখে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করেছে মর্মে প্রচার চালিয়ে দেশের নানা জায়গায় মন্দির-মণ্ডপ ভাঙচুর ও একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়াসহ হিন্দু-মুসলিম আটজনের মৃত্যুর যে ঘটনাগুলো ঘটল তা দেশবাসীকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। ভাবনার সবচেয়ে বড় কারণ কোনো রাজনৈতিক বা অন্যবিধ কারণে উত্তেজনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ সময়ে, আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মধ্যে, গুজব ছড়িয়ে এই তাণ্ডব ঘটানো হলো কিন্তু স্থানীয় জনগণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলো দ্রুত ও উপযুক্তভাবে এগিয়ে এলো না আক্রান্ত মানুষের পাশে ও প্রতিরোধে। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেরই অতীতের তুলনায় প্রতিক্রিয়া ধীর ও অপর্যাপ্ত। এই উদাসীনতা ভাবাচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের গাফিলতি তথা দ্রুত সাড়া না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে হিন্দুদের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ বেড়েছে। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিরোধের গতিপ্রকৃতি তাই সঠিকভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

হাজার বছর ধরে সম্প্রীতি থাকার কথাটিতে আমরা বোঝাতে চাই যে বরাবরই আমাদের দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। মুসলিম সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা উড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূলনীতি রেখে আমরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের সাম্প্রদায়িকতাকে এ দেশে কবর দিয়েছি বলেও মনে করেছি। এ কথা কতখানি ঠিক?

১৯৪০-৫০-এর মতো বেশি না হলেও স্বাধীনতার পরে সাম্প্রদায়িক চরিত্রের যে হিংসাত্মক ঘটনা মাঝে-মধ্যে ঘটেছে তা একাধিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ নয়, বরং একতরফা সংখ্যাগুরুর হাতে সংখ্যালঘুর পীড়ন ও অত্যাচার। খুন-ডাকাতি-রাহাজানি প্রভৃতি অন্য অপরাধমূলক হিংসার তুলনায় সাম্প্রদায়িক হিংসার প্রতিক্রিয়া অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। যখন অপরাধ ঘটে না বা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয় না, তখনও সাম্প্রদায়িকতা থাকে, বিদ্বেষ ও ঘৃণার আগুন মন, সল্ফ্ভ্রম ও স্বভাবিক জীবনকে দহন করতে থাকে।

এখানে সাম্প্রদায়িকতা কী এবং বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা কোন ক্ষেত্রে কীভাবে প্রাসঙ্গিক তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায়। মানুষ নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত, আঞ্চলিক প্রভৃতি নানা পরিচয়ে ভিন্ন হয় এবং সেভাবে সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী গড়ে তোলে। এই পার্থক্য স্বাভাবিক কিন্তু ঘৃণা ও হিংসা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ মনোভাব ও চিন্তার ধরন যা অন্য সম্প্রদায়কে হীন মনে করে, ঘৃণা করে, বঞ্চিত ও দমন করতে চায় তাই সাম্প্রদায়িকতা। অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে এবং তার চেয়েও বড় হলো, সুপ্ত ও প্রকাশ্য কোনো না কোনো সংকীর্ণ স্বার্থের কারণে এই মনোভাব তৈরি হয়। বাংলাদেশে অন্যান্য বিভক্তির প্রায় অনুপস্থিতির মধ্যে ধর্মীয় বিশেষত হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে ওই মনোভাবের অবকাশ রয়েছে।

অতীত কাল : এই মনোভাব কি বাংলাদেশের সমাজে যুগ যুগ ধরে আছে? সৌভাগ্যবশত না। এ কথা বিলক্ষণ সত্য যে, হাজার বছর এখানে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পাশাপাশি বসবাস ও সম্প্রীতি বিরাজ করেছে। প্রাচীনকালে বৈদিক সনাতন ধর্মে যে বর্ণাশ্রম প্রথা ছিল তা একই ধর্মের মধ্যে পেশাগত ও সামাজিক বিভক্তি এবং মূলত শ্রেণিগত রূপ। সেকালের সনাতন ধর্মের অনেক সংস্কার ও পরিবর্তনের পরে এখনকার আধুনিক হিন্দু ধর্ম। হিন্দু ও বৌদ্ধদের অনেক সংঘাত হয়েছে। মুসলমানরা তো তখন আসেইনি।

মুসলিম আগমন : ভারতবর্ষে সপ্তম শতাব্দীতে আরবীয় মুসলিম বণিকদের আগমনের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম আসে। জয় ও রাজ্যবিস্তারের মাধ্যমে আফগান ও মুঘল শাসকরা মধ্যযুগে কয়েকশ বছর বাদশাহী করলেও কয়েকজন অভিযানকারী যোদ্ধা শাসকের দ্বারা মন্দির লুষ্ঠন হলেও সাধারণ প্রজাদের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে তো সুলতানি আমলে বিদেশাগত মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় অসাম্প্রদায়িক শিল্প-সাহিত্য সংগীত কারুকলা স্থাপত্যের বিকাশ ঘটেছে।

বাংলাদেশে ইসলাম বিস্তার হয় সুফি ভাবধারার আউলিয়া দরবেশদের দাওয়াতি প্রচারের মাধ্যমে। নিম্নবর্ণের নিপীড়িত হিন্দুরা দলে দলে আকৃষ্ট হয় দরবেশদের প্রেমপূর্ণ দয়াসিক্ত ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র এবং সুফি মতবাদী ইসলামের উদার রূপ দেখে। তারপর শত শত বছর হিন্দু-মুসলমান ভিন্ন আচার, ভিন্ন হালাল-হারাম খাদ্য নিয়েই শান্তিতে পাশাপাশি বাস করেছে। কিন্তু কালক্রমে নানা রাজনৈতিক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশে সুফি ভাবধারার ইসলাম পিছু হটে গিয়ে বিশেষ করে গত ৩০-৪০ বছরে ওয়াহাবি ভাবধারার কট্টর ইসলাম এখানে প্রাধান্য পেয়ে গেছে। এখানে প্রেমের চেয়ে ঘৃণার চাষ বেশি। আন্তর্জাতিক জলসিঞ্চনও ঘটে এই ঘৃণার শিকড়ে। সমাজেও আন্তঃধর্ম সম্প্রীতির বাঁধন অনেক আলগা হয়ে গেছে। এখন প্রায় সব প্রৌঢ় বয়সী মানুষ তাদের বাল্যকালে প্রতিবেশী হিন্দু-মুসলমানের মেলামেশা, পূজামণ্ডপে মুসলমানদের আনন্দ করা, হাত পেতে প্রসাদ নেওয়া ও মুসলিম বাড়িতে হিন্দুদের পোলাও-শিরনি খাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। বর্তমান প্রজন্মে তা কমে এসেছে। এখন আমাদের আলেমদের বড় সোচ্চার অংশ ওয়াজ মাহফিলের নামে মাঠে ও ইউটিউবে প্রতিনিয়ত এই সম্প্রীতির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান।

ব্রিটিশ আমল : সাম্প্রদায়িকতা ও দাঙ্গাহাঙ্গামা বলতে যা বোঝায় তা শুরু হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে। তার আগে ছিল না। স্পষ্টতই ইতিহাসে পাই যে, ব্রিটিশরা আমাদের স্বাধীনতা আন্দেলন দমন করার জন্য 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিতে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বাড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করেছে। ১৭৮০ সালে আলিয়া মাদ্রাসা, ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রভৃতি সম্প্রদায় ভিত্তিতে শিক্ষাধারা তারাই শুরু করে। আর ১৯০৫-১২ সালের বঙ্গভঙ্গ এই ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ। মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রায় একশ বছর দেরি করায় চাকরিবাকরি ও অর্থনীতিতে অনেক পিছিয়ে থাকায় এবং ব্রিটিশদেরই সৃষ্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে হিন্দু জমিদারদের একচেটিয়া প্রাধান্য তৈরি হওয়ায় হিন্দু-মুসলিম বিরোধ সৃষ্টি করা ব্রিটিশদের পক্ষে সহজ হয়েছিল। এই ধারাতেই স্বাধীন হওয়ার সময় দাঙ্গা, রক্তপাত ও হিন্দুস্তান-পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র। এই মানবিক-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য মুসলিম লীগ একা নয়, কংগ্রেসের সংকীর্ণতা ও ব্যর্থতাও দায়ী।

পাকিস্তানি দুর্দৈব : সাম্প্রদায়িকতার প্রয়োগযন্ত্রটা ব্রিটিশদের হাত থেকে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে আসে। পাকিস্তানি ধনিক শ্রেণি ও পাঞ্জাবের প্রাধান্যপূর্ণ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সরকার অন্যান্য জাতিসত্তা, বিশেষত এক হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পূর্ব বাংলার বাঙালিদের শাসন-শোষণে দমিয়ে রাখতে সাম্প্রদায়িকতাকে বারবার ব্যবহার করে। আমাদের ভাষার দাবি, গণতন্ত্র, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার অধিকার প্রভৃতি ন্যায্য দাবির আন্দোলন দমন করতে তারা সাম্প্রদায়িক বিরোধ উস্কে দিত। আমরাও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি ও তার ঊর্ধ্বে ওঠার চর্চা করি। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য দৃঢ় হয়, মুক্তিযুদ্ধে যার চূড়ান্ত প্রকাশ। সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিধনযজ্ঞে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্বাধীনতার বিভ্রম : ১৯৭১ সালের শেষে স্বাধীনতা অর্জন করে পরের বছরই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র চার মূলনীতি গ্রহণ করে আমরা ভাবি সাম্প্রদায়িকতার অবসান হয়েছে। উপরিতলে এমন পরিবেশ থাকলেও এই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সংস্কৃতি-সচেতন বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্টসহ বাম রাজনীতিকরা সতর্ক করেছিলেন যে সমাজ মানসের নিচের স্তরে চলে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও দক্ষিণপন্থিরা জাগিয়ে তুলতে পারে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজে উদার গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। কিন্তু তুমুল জনপ্রিয় শাসকদল আওয়ামী লীগ এদিকে গুরুত্ব না দিয়ে হিন্দুদের 'নিশ্চিত ভোটবাক্স' হিসেবে গণ্য করতে থাকে এবং অপর দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ভোট ঠিক রাখার জন্য ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে থাকে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে। পাকি বাহিনীর ভেঙে দেওয়া সুউচ্চ কালিমন্দির পুনর্নির্মাণ করতে না দেওয়া, রাষ্ট্রীয় তরফে ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন এগুলোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। পরে তা এখন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে চলেছে। ধর্ম বিষয়ে গবেষণায় সরকারি সহায়তা অবশ্যই ভালো দৃষ্টান্ত কিন্তু একটি ধর্মের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নীতিগতভাবে সঠিক নয়।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজজীবনে সাম্প্রদায়িকতার উচ্চকিত না হলেও অন্তঃসলিল একটি ধারা প্রমাণিত হয় হিন্দু জনসংখ্যার ক্রমাগত ক্ষয়ে। এটা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ চিহ্নিত করায় প্রধান গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের পর গত পঞ্চাশ বছর ধরেই তা অব্যাহত। এই অর্ধশতাব্দীতে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। প্রতি দশকের জাতীয় লোকগণনা বা আদমশুমারির হিসাব নিলে, নির্ধারিত ১৯৭১ সালে হতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য, ১৯৭৪ সালে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটির সামান্য বেশি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে সোয়া ১৪ কোটির সামান্য বেশি। আর সর্বশেষ গত ১৮ জুন পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য হলো, বর্তমান লোকসংখ্যা ১৭ কোটির সামান্য কম। ১৯৭৪ সালে হিন্দু ছিল জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০১১ সালে হয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এই অস্বাভাবিক কমে যাওয়া আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় হিন্দুদের অবিরাম নীরবে দেশত্যাগ ছাড়া। সনাতন ধর্মের এত বিপুল সংখ্যক মানুষ উন্নত জীবনের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় যায়নি। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি জমিজিরাত ছেড়ে ভারতে গেছে নতুন করে জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকতে। কত বড় বেদনায় মানুষ এভাবে জন্মভূমি ত্যাগ করে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের আত্মজিজ্ঞাসা হওয়া উচিত।

অর্পিত সম্পত্তি : ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পটভূমিতে পাকিস্তান সরকার যে 'শত্রু সম্পত্তি আইন' চালু করে তাতে বাংলাদেশের কোনো হিন্দু পরিবারের কেউ ভারতে গেলে তার অংশের স্থাবর সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করে পরে বিক্রি করতে পারত। ওই যুদ্ধ অবসানের সাড়ে পাঁচ দশক পরও তা 'অর্পিত সম্পত্তি আইন' নামে টিকে থাকায় হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এই আইনের প্রয়োগ দুর্নীতিযুক্ত হয়ে পীড়নের যন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় এবং বহু পরিবারের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়। বিশ বছর আগে 'অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন' করেও সরকার খুব অল্প জমিই উদ্ধার করতে পেরেছে। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা দেখিয়েছে যে, ওই আইনের দ্বারা সম্পত্তি অর্জনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগের লোকজন। এই স্বার্থ ও লালসা বাংলাদেশে এক বিশেষ ধরনের সাম্প্রদায়িকতা টিকিয়ে রেখেছে।

রাষ্ট্রধর্ম : দুশ্চরিত্রের খেতাব পাওয়া গণআন্দেলনে উৎখাত হওয়া প্রয়াত স্বৈরশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ (অব.) সামরিক আইনের ফরমান দিয়ে সংবিধানে 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' বিধান সংযোজন করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত এরশাদের জারি করা সামরিক শাসন ও ফরমানগুলো বহুলাংশে অবৈধ বলে বাতিল করলে এই বিধানটিও বাতিলযোগ্য হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সরকার নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বিধানটি রেখে দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম থাকায় এই সাংবিধানিক গোঁজামিলকে ঢাল হিসেবে নিয়ে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রচারের সুযোগ নিচ্ছে।

জঙ্গি ইসলাম : ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও বিশ্ব পরিসরে আল কায়দা, ইসলামিক স্টেট ধরনের কট্টর জঙ্গিবাদী ইসলামের নামে কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা ছিল না। এখন এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতারোহণ আমাদের ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করছে। র‌্যাডিক্যালাইজেশন বা উগ্রতায় দীক্ষা ছড়াচ্ছে। এসব আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলেও এই আবহে 'শরিয়া শাসনের' পক্ষে প্রচারকারী দেশের আলেমরা সাম্প্রদায়িকতাকেই বাতাস দিয়ে চলেছেন।

শিক্ষা ব্যবস্থা : সংবিধানে 'একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা'র কথা থাকলেও শিশু বয়স থেকেই ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার শিক্ষা চালু আছে। এর মধ্যে সরকারের কোনো রকম বিধিনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির সম্পূর্ণ বাইরে দেশি-বিদেশি বেসরকারি অর্থায়নপুষ্ট কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতকে পর্যন্ত অবজ্ঞা করে সাম্প্রদায়িক ধারায় শিশু-কিশোরদের মনকে পুষ্ট করা হচ্ছে। এই ধারার শিক্ষার নেতৃত্বকারী 'হেফাজতে ইমলাম' সংগঠনের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটের রাজনীতিতে আপসমূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা গেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় শৈথিল্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, আন্দোলন ও চর্চায় অতীতের মতো মনোযোগ রাষ্ট্র ও সমাজের নেই। এটাও পশ্চাৎপদ কূপমণ্ডুক মানসিকতা বিস্তারের সহায়ক। ইন্টারনেট প্রযুক্তির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ধর্মান্ধতা প্রচারে পুরোমাত্রায় ব্যবহূত হতে দেখা যাচ্ছে।

ধনবৈষম্য : শোষণ-বৈষম্যমুক্ত সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি রাষ্ট্র ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন। ক্রমে সম্পূর্ণ বিপরীত রাষ্ট্রের পথে আমরা হেঁটেছি। প্রবৃদ্ধির হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভালো হলেও সমাজে লুণ্ঠন ও দুর্নীতির প্রাধান্য এবং ধনবৈষম্য বেড়েছে। বঞ্চিত অংশের বেকার তরুণরাও ক্রোধবসত বিচার-বিবেচনাহীন সামাজিক হিংসায় জড়িত হয়। এ অবস্থাও বিভিন্ন রকম সাম্প্রদায়িকতার অনুকূল।

এমন নানাভাবে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা লালিত হয়ে চলেছে, আমরা অশান্তি না ঘটলে দেখতে পাই না। পেলেও প্রবোধ খুঁজি। বাংলাদেশ 'হিন্দুশূন্য হবে কিনা' এমন প্রশ্নও শোনা যায়। ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এক ধর্মাবলম্বীর দেশ এখানে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক সম্পূর্ণ ধ্বংসের নামান্তর। 'ইহুদি রাষ্ট্র' ইসরায়েলকে টিকিয়ে রেখেছে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটিয়েও। এক ধর্মাশ্রয়ী বাংলাদেশ না বাস্তব, না টিকে থাকার উপযুক্ত।

রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ, নাগরিক অসাম্প্রদায়িক : সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে যতগুলো বিষয় আলোচিত হলো তার সব ক্ষেত্রে সংশোধন-সংস্কারের নিরলস চেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করা। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারে আমাদের হাঁটতে হবে। ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরতে হবে। নাগরিক বা মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে না। সে ধার্মিক হতে পারে। ধর্ম পালন করতে পারে। নিজ ধর্মকে ভালোবাসবে, অন্য ধর্মকে ঘৃণা করবে না। সব ধর্মের মানুষ এবং কেউ ধর্মে অবিশ্বাসী হলে সেও রাষ্ট্রীয় সমানাধিকার নিয়ে সবাই সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করবে। এই আমাদের কাঙ্খিত বাংলাদেশ।

লেখক

সাংবাদিক

প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন