১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিলাম, তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সম্পূর্ণরূপে একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক শোষণমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাবে, মানুষ তার সামগ্রিক অধিকার পাবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে তার শেষ বাক্যটি ছিল- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন মুক্তির কথা। সেই 'মুক্তি' আসলে কি?

পাকিস্তানের ২৩ বছর আমরা কী দেখেছি? ওই সময়ে কিন্তু বাংলার মানুষ ঔপনিবেশিক শোষণে নিষ্পেষিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। তিনি চেয়েছিলেন বাঙালিদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে সবাই বৈষম্যমুক্ত জীবন যাপন করতে পারবেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে মানুষের 'মুক্তি' ছিল সুদূরপরাহত।

আমরা জানি যে ব্রিটিশরা আসার পরে তারা এ দেশকে শোষণ করেছে। তারা আসার আগে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি ধনী দেশ ছিল। যদিও বাংলাদেশ শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশে পরিণত হচ্ছিল। ব্রিটিশদের কারণে আমরা সেসব কুসংস্কার থেকে মুক্তি পেয়েছি। আবারও বলছি ব্রিটিশরা যদিও আমাদের শোষণ করেছে, তারপরও তাদের সংস্পর্শে এসে আমরা একটা আধুনিক জগতের সন্ধান পেয়েছিলাম। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতক থেকে, বলা যায় যে গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিক থেকে আমাদের এই উপমহাদেশ পিছিয়ে পড়েছে-এই নিয়ে অনেক গবেষণা আছে, অধ্যাপক নাজমুল করিম করেছেন, আমরা করেছি। এসব গবেষণায় আমরা দেখি যে, কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছে, ব্রিটিশরা আসার অনেক আগেই হিন্দু সমাজে বর্ণপ্রথার প্রচলন হয়েছে, মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ শ্রেণিবিভাগ হয়েছে। আমরা দেখি যে মুসলিম নারীদের পর্দাপ্রথার নামে কীভাবে পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, হিন্দু নারীদের কীভাবে সতীদাহ প্রথার নামে আগুনে বলি দেওয়া হয়েছে। এই সতীদাহ থেকে ব্রিটিশরা হিন্দু নারীদের মুক্তি দিয়েছে, বেগম রোকেয়ার সংগ্রামের কারণে মুসলমান নারীরা অন্ধকার থেকে আলোয় আসার পথ খুঁজে পেয়েছে। বেগম রোকেয়ার 'অবরোধবাসিনী' গ্রন্থের কথা আমরা সবাই জানি। কুসংস্কার থেকে মুক্তির জন্য বিদ্যাসাগর আন্দোলন করেছেন, রাজা রামমোহন রায় আন্দোলন করেছেন। বেগম রোকেয়া, বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের যে আন্দোলন এগুলো কিন্তু মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার আন্দোলন ছিল। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনও ছিল মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার আন্দোলন।

দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে যখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে এলেন, তিনি কিন্তু ঢাকায় নতুন এসেছেন, কারণ বঙ্গবন্ধু তো রাজনীতি করেছেন কলকতায়। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় এসেই উপলব্ধি করলেন- 'আমরা তো প্রকৃত স্বাধীনতা পাইনি।' প্রথমেই আসে ভাষার প্রশ্ন। ভাষার অধিকারই যদি না পেলাম তাহলে কিসের স্বাধীনতা? সে জন্য তিনি ভাষা সংগ্রামে জড়িত হয়েছেন, ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি জেল খেটেছেন। এই যে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জেলে গেলেন, এরপর থেকে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, বাঙালির মুক্তির জন্য পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে ১৩ বছরই তাকে জেলে কাটাতে হয়েছে।

'৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একসাগর রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু প্রথমেই যেটা করেছিলেন সেটা হলো তিনি একটা রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করেছিলেন। পাকিস্তান আমলের ৯ বছরেও শাসকরা একটা সংবিধান দিতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই একটি অসাধারণ সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যে সংবিধান তিনি বাঙালি জাতিকে দিয়েছিলেন সেখানে বঙ্গবন্ধু কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, চারটি স্তম্ভের ওপরে আমাদের সংবিধান প্রতিষ্ঠিত করা হলো। এবং তিনি এও বলেছিলেন, এই সংবিধান বাঙালির ইতিহাসের প্রথম সংবিধান। বাঙালি জাতিসত্তার যে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশই সেই ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন দেশ। এর আগে যেসব রাষ্ট্র ছিল সেগুলো বিভিন্ন রাজা-বাদশা-নবাবের রাজত্বের রাষ্ট্র্র ছিল, জনগণের রাষ্ট্র ছিল না। 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' (এই রাষ্ট্র প্রতিটি বাঙালির নিজের রাষ্ট্র) আমাদের প্রথম রাষ্ট্র যা সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্যই তিনি জাতির পিতা। এই রাষ্ট্রের, বাঙালির প্রথম সংবিধানে জনগণকে তিনি সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে ঘোষণা করেন। সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি করা হয়েছিল সেগুলো ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

দেখুন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা কী করেছিলেন? তিনি কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইউরোপের সেক্যুলারিজমের মতো করে ব্যাখ্যা করেননি। ইউরোপের সেক্যুলারিজম ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, অনেকটা ধর্মকে বাদ দেওয়া। ইউরোপের সেক্যুলারিজমের যথার্থ বাংলা হলো ইহজাগতিকতা। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তা বলেননি। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রে প্রত্যেকে যার যার ধর্ম পালন করবে, কিন্তু ধর্মকে কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। এখন আমরা কী দেখছি? এখন যে সাম্প্রদায়িক উগ্রতা আমরা দেখছি, সেটা কিন্তু অনিবার্য ছিল। কারণ যখন একটি রাষ্ট্রকে তকমা দিয়ে দেওয়া হয়, তখন কিন্তু সাম্প্রদায়িক উগ্রতা চরমভাবে প্রকাশিত হবেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর প্রথমে খন্দকার মোশতাক ও পরে জিয়াউর রহমান নানা ফরমান জারি করে সংবিধানের মৌল চেতনাকে ধ্বংস করেছেন। সংবিধানের চার মৌল নীতিকে কাটাছেঁড়া করা হলো, সমাজতন্ত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হলো, ধর্মনিরপেক্ষতাকে তো তুলেই দেওয়া হলো। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, সংবিধানে একটি কুখ্যাত আইন সংযোজন করা হলো, সেটা হলো ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশ। এই আইনের মাধ্যমে মানুষের বিচারের যে অধিকার সেটাকে হরণ করা হলো। জাতির পিতার পরিবারের ২০ জন মানুষকে হত্যা করা হলো, যেখানে ছিল নারী-শিশু, দুই নবপরিণীতা বধূ, শিশু শেখ রাসেল, তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, মোশতাক-জিয়া সংবিধানে আইন করলেন, এই নৃশংস হত্যার বিচার করা যাবে না, কী ভয়ংকর বিষয়! কোনো সভ্য দেশে কি এটা সম্ভব? যে দেশের সংবিধানে হত্যার বিচার করা যাবে না-এমন আইন সংযোজিত হয়, সেখানে তো ন্যায়বিচারের চরম অবমাননা।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়, জাতির পিতা হত্যার বিচার হলো, বিচারহীনতারও অবসান হলো।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য একটি পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেটা হতে দেননি। যেমন ভাসানী সাহেব কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, মানবিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার পত্রিকা 'হক কথা'য় ধর্মান্ধতার ব্যাপক প্রচার হতো, বঙ্গবন্ধু সরকারকে হিন্দু ও ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে দেখা হতো। অথচ বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন মাসের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীকে বলে ভারতীয় সৈন্যকে প্রত্যাহার করান, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। উল্লেখ্য, এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী আমেরিকার সৈন্য জাপানে রয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানপন্থিদের অপপ্রচার জনমানসকে বিপুলভাবে বিভ্রান্ত করে, এখনও করছে। বলা চলে প্রায় এরই ফলস্বরূপ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমূলে উৎপাটিত করার জন্য সব প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে, নেমে আসে সংবিধানের ওপর আঘাত। সংবিধানের চার মূল স্তম্ভের মধ্যে দুটি স্তম্ভ, সমাজতন্ত্রকে রূপান্তরিত করা হলো, ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে ফেলা হলো। এরশাদ এসে ১৯৮৮ সালে আরেক ধাপ এগিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন, যা আজও চলছে। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হয়, এতে স্বাভাবিকভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীরা এক ধরনের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হন। তাদের ধর্মীয় অধিকার থাকলেও তা আচ্ছন্নভাবেই থাকে। আমরা এরশাদের এসব স্বৈরচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা মার্শাল ল ভেঙে গণতন্ত্রের জন্যও আন্দোলন করেছিলাম। এই আন্দোলন হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে। তখন অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম ছিলেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আমি ছিলাম সভাপতি।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের রায়ের মাধ্যমে '৭২-এর সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যা কিছু সংযোজিত হয়েছিল তার অনেক কিছু পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আমি মনে করি, ধর্মভিত্তিক কোনো রাষ্ট্র আধুনিক রাষ্ট্র হতে পারে না। হ্যাঁ, এটা সত্য, ইংল্যান্ডে এখনও এংলিগান্ট চার্চের প্রধান রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয়, কিন্তু সেটা নিয়ে সেখানে কেউ মাথা ঘামায় না, জানেও না।

১৭৮৯ সালে আমেরিকার সংবিধান (যা আধুনিককালের প্রথম সংবিধান) রচিত হয়। এই সংবিধানে পরিস্কারভাবে বলা হয় যে, রাষ্ট্র কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত দেখাবে না, চর্চায়ও বাধা দেবে না। এভাবেই আমেরিকা আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার প্রথম পদক্ষেপ নেয়।

ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি ছিল দুটো, তার মধ্যে একটা হলো- সামন্ততান্ত্রিক বৈষম্য দূর করা। ফরাসি বিপ্লব একই সঙ্গে সামন্ততন্ত্র ও রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়ে ঘোষণা করেছিল যে, আজ থেকে এই রাষ্ট্রের সবাই সমান অধিকার পাবে। ফরাসি বিপ্লবের আগে সেখানে চার্চকে বলা হতো ফার্স্ট এস্টেট, সামন্ততন্ত্রকে বলা হতো সেকেন্ড এস্টেট। সাধারণ জনগণ ছিল থার্ড এস্টেট। বিপ্লব এসবকে উচ্ছেদ করে, ফার্স্ট ও সেকেন্ড এস্টেটের অধিকার খর্ব করে, জনগণকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান করে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্ততন্ত্রের শেষ-অবশেষও বিলোপ করে ইউরোপের সব জনগণকে সমান অধিকার দেওয়া হলো (রাশিয়ায় অবশ্য তখনও সামন্ততন্ত্র বজায় ছিল)। ইউরোপে একসময় ধর্ম নিয়ে বিশাল হানাহানি হয়েছে। মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানদের যে দ্বন্দ্ব সে কথা বাদই দিলাম, জেরুজালেমকে মুসলমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য একে একে চারটি ক্রুসেড সংঘটিত হলো, আবার ইউরোপীয়রা ধর্মীয় উন্মাদনায় নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টানরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মযুদ্ধ করেছে। এমনকি একে অন্যের অনুসারীদের পুড়িয়ে মেরেছে, নির্মমভাবে হত্যা করেছে। প্রচলিত ধর্মচিন্তার বিরুদ্ধে গেছে বলে বিজ্ঞানী ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, গ্যালিলিওর বিচার করেছে চার্চ, বলেছে তার বক্তব্য বাইবেলের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ইউরোপে মধ্যযুগে ধর্মীয় উন্মাদনায় বহু নারীকেও ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অসংখ্য সংঘাতের মধ্যে গিয়ে তারা উপলব্ধি করেছে ধর্মীয় উন্মাদনা সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনকে বিপন্ন করে, জীবনের সব ধরনের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেয়। তাই আজ পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানচিন্তা এগিয়ে গিয়ে ওই অঞ্চলের প্রায় সব রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

সব ধর্মই মানুষকে শান্তির দীক্ষা দেয়, শান্তির কথা বলে। কিন্তু মানুষ ধীরে ধীরে ধর্মের এসব বাণীর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতাকে জীবনে আঁকড়ে ধরে। বিশেষভাবে যারা কেবল ধর্মশিক্ষা করে, তারা আধুনিক, মানবিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার স্পর্শ পায় না।

একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করার পরও বাংলাদেশে জামায়াত ও পাকিস্তানপন্থি অনেকেই তাদের প্রচারিত ধর্মীয় উন্মাদনা-উগ্রতা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এর কারণ হলো স্বাধীনতার পর জাতির পিতা আমাদের সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি দিয়েছিলেন সেটা আমরা রক্ষা করতে পারিনি, '৭৫-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার যে আদর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন সেই আদর্শকে পরে রাষ্ট্র আর লালন করেনি। বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ছিল, মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই যার যার ধর্ম পালন করবে, কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না, ধর্মকে কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশ পরিচালিত করতে পারতাম, তাহলে আজকের এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দেখতে হতো না।

আমি মনে করি আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের রাষ্ট্রকে ধর্মনিরেপক্ষ হতে হবে। কারণ রাষ্ট্র যদি ধর্মনিরপেক্ষ না হয় তাহলে সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র যদি বলে তার একটি ধর্ম রয়েছে তাহলে সেই রাষ্ট্রে অন্য ধর্মের নাগরিক যারা রয়েছে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশে একসময় ব্লাসফেমি আইন ছিল। এমনকি ভারতের হিন্দু সমাজেও ছিল। মনুসংহিতায় ব্রাহ্মণ আর শূদ্রের অপরাধের বিচার আলাদাভাবে হতো। যেমন একটি অপরাধে শূদ্রের যে শাস্তি হবে, একই অপরাধে ব্রাহ্মণের শাস্তি কিন্তু অনেক কম হতো। এই যে বৈষম্য, সেটাই যদি রাষ্ট্রের ভিত্তি হয় তাহলে সেই রাষ্ট্রে তো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থাকবেই।

সাধারণত একটা বড় বিপ্লবের পরে নানা কারণে জনগণের অনেক অধিকার খর্ব করতে হয়। যেমন ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব ও চীনা বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে সরকার অনেক বেশি কঠোর ছিল। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তা করেননি, তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করেননি। তারপরও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে, তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এই দেশকে একটি সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলতে, তিনি চেয়েছিলেন এই দেশের মানুষ তাদের সব অধিকার পাবে, তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। সে জন্য তিনি বিশ্বের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান রচনা করেছিলেন, যেখানে সবাইকে সমান ধর্মীয় অধিকার দিয়েছিলেন। আজকে কিন্তু অপ্রত্যাশিত অনেক সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটছে। এবারের দুর্গাপূজায় কুমিল্লায় যে ঘটনাটা ঘটল, সেটা দেখে মনে হয়েছে, যে কেউ এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটিয়ে দেশে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করতে চেয়েছে, সক্ষমও হয়েছে।

আজ দেশে যে সাম্প্রদায়িতকতার বিষবাষ্প চলছে সেটা আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যে কুঠারাঘাত করেছে। আমি তো প্রায় দুই যুগ ধরে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। আমি দেখেছি প্রধানমন্ত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনা চান বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে। কিন্তু আওয়ামী লীগে যারা রয়েছেন তাদের অনেকের মধ্যে সেই আন্তরিকতা নেই। এই বিশাল দলে অনেক পাকিস্তানপন্থি ছদ্মবেশী ঢুকে পড়েছে, যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য, নিজের আখের গোছানো এবং দেশকে আবার ধর্মান্ধতার পথে নিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশকে আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আইনের সংস্কার করতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষাকে আধুনিক ও মানবিক করতে হবে। কওমী মাদ্রাসাগুলোকে ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তাদের শিক্ষাকে আধুনিক, কর্মমুখী ও সৃজনশীল করতে হবে। শাপলা চত্বরে কিন্তু আমরা দেখেছি হেফাজতে ইসলাম নিজেও ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়েছে। অথচ তাদের চাপে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা অভাবনীয় ব্যাপার।

আমি মনে করি কুমিল্লায় যে ঘটনা হয়েছে সেটা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। তবে ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। আজ ইউপি নির্বাচন নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ অনেক বেশি ব্যস্ত। স্থানীয় সরকারের ইউপি নির্বাচন তো সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা দরকার ছিল। সেখানে কেন দলীয়ভাবে মনোনায়ন দেওয়া হবে? এতে তো আওয়ামী লীগের তৃণমূলে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। দলীয় ব্যানারে এসব স্থানীয় নির্বাচন সংঘাত-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। দলকে কিন্তু আদর্শের পথে নিয়ে যেতে হবে, সংঘাতমুক্ত করতে হবে, দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ অবশ্যই একদিন আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে সেসব বিচ্ছিন্ন। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একটি মহল পরিকল্পিত পথে এসব করছে। এই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দলীয় ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়। সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিরোধের জন্য প্রশাসনকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের শুভবুদ্ধি আছে। সেই শুভবুদ্ধির পথে দেশকে পরিচালিত করতে হবে।

একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক, সাম্যভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি মানুষ তার মৌলিক অধিকার ও সংস্কৃতিহূদ্ধ জীবন পাবে সেই রাষ্ট্র গড়তে হলে অবশ্যই সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে '৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি। সংবিধানকে মূল্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করে যাচ্ছেন, কিন্তু আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় তিনি বড় একা। দেশবাসীর উচিত শেখ হাসিনার পাশে থাকা, তার হাতকে শক্তিশালী করা।

লেখক

সমাজবিজ্ঞানী ও উপাচার্য, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম

মন্তব্য করুন